ঠিক কিভাবে শুরু করবো বুঝতে পারছিনা, লিখার জন্য এত বেশী কথা, মন্তব্য, প্রশ্ন মনের মধ্যে উঁকি দিচ্ছে যে, ঠিক কোনটা রেখে কোনটা দিয়ে শুরু করলে মনে হবে কিছু একটা লিখতে পেরেছি তাও মাথায় ঢুকছে না। ঢাকা শহরের নিউ মার্কেটের ট্রাফিক জ্যামের মতোই মাথার ভেতর অসংখ্য শব্দ ভিড় জমিয়েছে। হাজার চেষ্টা করেও যেন ট্রাফিক পুলিশ রূপি আমার মনটা এই জ্যাম ছাড়াতে পারছেনা। অবশেষে শ্রদ্ধেয় স্যারের-ই লিখা একটা কবিতার কয়েকটা লাইন পড়ে মনের অনেক শঙ্কা কাটতে শুরু করেছেঃ
"আমি জানি সব কিছু নষ্টদের অধিকারে যাবে
নষ্টদের দানবমুঠোতে ধরা পড়বে মানবিক
সব সংঘ পরিষদ;_ চ'লে যাবে অত্যন্ত উল্ল্লাসে
চ'লে যাবে এই সমাজ সভ্যতা_ সমস্ত দলিল_
নষ্টদের অধিকারে ধুয়েমুছে, যে-রকম রাষ্ট্র
আর রাষ্ট্রযন্ত্র দিকে দিকে চ'লে গেছে নষ্টদের অধিকারে।
28শে ফেব্রুয়ারী 2004, সকালের পত্রিকায় চোখ বুলাতেই সমস্ত শরীর হিম শীতল হয়ে যাওয়ার মতো অবস্থা আমার। প্রথম আলো পত্রিকার শিরোনাম ছিলো "অধ্যাপক হুমায়ুন আজাদকে কুপিয়ে গুরুতর জখম" আজও ভুলতে পারিনি এই কথাগুলো। স্বাধীন, সার্বভৌম একটি দেশের নাগরিক হিসেবে এ ধরনের একটা ঘটনা আপনার, আমার কাছে কতটুকু গ্রহণযোগ্য?
যে ভাষাআন্দোলন ছিলো আমাদের অস্তিত্বের শেঁকড়, সেই ভাষারই একজন বিজ্ঞানীকে হত্যা করার চেষ্টা করা হয়েছিলো। আর যারা এই কাজটি করেছিলেন, তারা আমাদেরই কেউ একজন, অন্তত অবাঙালী কেউ নন। এ যে আমাদের জন্যে কতটুকু লজ্জার, কতটুকু ঘৃণার সে কথা এ দেশের প্রতিটি দেশপ্রেমিক ব্যক্তি মাত্রই বুঝতে পারবেন বলে আমার বিশ্বাস। "আনর্্তজাতিক মাতৃভাষা দিবস" এর মাত্র সাত দিনের মাথায় এরকম একটা নারকীয় ঘটনা সবার মনকে নাড়া দিয়ে গেছে, যোগ করেছে জাতীয় জীবনে কালো একটি অধ্যায়। দেশপ্রেম, ভাষা, সংস্কৃতি, ভাষা শহীদ, মুক্তিযোদ্ধাদের প্রতি শ্রদ্ধা জানাতে না জানাতেই এই ঘটনা আমাদের বুঝিয়ে দিয়েছে, স্বাধীনতার এতদিন পরেও নিজেদের কাছে আমরা নিজেরাই কতটা পরাধীনতার শৃঙ্খলে আবদ্ধ হয়ে আছি অন্তত ব্যক্তি নিরাপত্তার ক্ষেত্রে।
এ কথা ঠিক যে, তার বেশ কিছু লিখা তাকে অনেক সময় সমালোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে নিয়ে এসেছিলো, বোধ করি এ কারণে তাকে অনেকে অপছন্দও করতে পারেন। কিন্তুু আমি দেখেছি তাকে চরমভাবে ঘৃনাকারী ব্যক্তিটিও এই নারকীয় ঘটনায় প্রতিবাদ জানিয়েছিলেন, দাবি তুলেছিলেন এর সুষ্ঠু বিচারের। তাকে একজন লেখক হিসেবে নয় বরং একজন সাধারণ মানুষ হিসেবে মূল্যায়ন করেই তারা এই প্রতিবাদ করেছিলেন। একজন লেখকের সব লিখাই যে সবার কাছে সমানভাবে গ্রহণযোগ্যতা পাবে সেটা ভাবাটা নিতান্তই বোকামি। কিন্তুু তাই বলে তাকে প্রানে মেরে ফেলা বা মেরে ফেলার চেষ্টা করাটা ঘৃণ্য অপরাধ। এই ঘটনার ওপর আমি অনেকের মতামত পড়েছিলাম পত্রিকার পাতায়, দেখেছি সবাই একবাক্যে ঘৃণা জানিয়েছেন, সবাই এই হামলার সুষ্ঠু বিচার এবং হামলাকারীদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবি জানিয়েছিলেন। কিন্তু সেই হামলার সুষ্ঠু বিচারতো দূরের কথা তদন্ত কাজটিও সঠিকভাবে সম্পাদিত হয়নি, শাস্তি দেয়াতো আকাশ-কুসুম চিন্তাই মাত্র। সবাই জানেন, বোঝেন কিন্তু মুখে ফুটে হামলাকারী ঐসব মৌলবাদীদের বিরুদ্ধে দু'কলম লিখতে আমাদের সবারই হাত কেঁপে উঠে, তবে ভুলে যাবেন না কিংবা অবাক হবেন না, মৌলবাদীদের হাতের চাপাতি যদি কখনো আপনার দিকেই তেঁড়ে আসে, তখন জানবেন, সে জন্যে আপনিই দায়ী।
ঠিক যখন আমি এই লিখাটা লিখছি, তখন আমার মা'ও আমাকে বললেন এইসব ব্যাপার নিয়ে না লিখতে, কেননা আমার মা'র দুঃশ্চিন্তা কবে যেন তার ছেলে এইসব ব্যাপার নিয়ে লিখালেখি করে এমনি অনাকাঙ্খিত ঘটনার মুখোমুখি হয়! এদেশের একজন নাগরিক হিসেবে, একজন মা হিসেবে এই দুঃশ্চিন্তা মোটেও অমূলক নয়। তবে অস্বীকার করতে দ্বিধা নেই যে, এই অবস্থা সৃষ্টির পেছনে আমাদেরও নিরব সম্মতি ছিলো। সত্যিকার অর্থে আমরা(স্বাধীনতার পরবর্তী প্রজন্ম) এ ধরনের অন্যায়ের প্রতিবাদ করতে শিখিনি, আমরা বড় হয়েছি একটা কলুষিত সমাজে যেখানে অন্যায়, অবিচার, খুন ছিলো নিত্যদিনের সঙ্গী। আমরা দেখতে পেয়েছি আমাদের দেশ বিশ্বের সবচেয়ে দুনর্ীতিগ্রস্থ দেশ হিসেবে, দেখতে পেয়েছি আইন-শৃঙ্খলার চরম অবনতি, দেখতে পেয়েছি ন্যায় বিচারের আশায় এদেশের সাধারণ মানুষগুলো কিভাবে আর্তনাদ করে।
আমরা কোন পথে চলছি? চোখের সামনেই দেখতে পাচ্ছি জাতীয় চেতনার ভীতগুলো ভেঙ্গে পড়ছে একে একে। আমাদের দেশের সংবাদপত্রগুলো তার স্বাধীন মতামত প্রকাশের স্বাধীনতা হারিয়েছে অনেক আগেই। সত্যের টুঁটি চেঁপে অনেক সাংবাদিককে হত্যা করা হয়েছে নির্বিচারে। এখন শুরু হয়েছে লেখকদের হত্যা করার পালা। কিন্তুু এভাবে আর কতদিন? এদেশের সাধারণ মানুষগুলো আর কতকাল মুখ বুঁেজ থাকবে গুটি কয়েক রাজনৈতিক দলের পোষ্য ঐসব সন্ত্রাসীদের হুমকিতে? সময় হয়েছে এখনই প্রতিবাদ করার, প্রতিরোধ গড়ে তোলার। আগামী প্রজন্মকে অন্তত একটি দুর্নীতি এবং সন্ত্রাসমুক্ত দেশ উপহার দিয়ে যাওয়ার জন্য কাজ করার এখনই সময়। নয়তো আগামী প্রজন্মও আমাদের দিকে আঙুল তুলে দেখিয়ে যাবে একটি ঘুনে ধরা সমাজের পরোক্ষ স্রষ্টা হিসেবে।
একজন হুমায়ুন আজাদ নয়, লক্ষ হুমায়ুনের রক্তে রাঙা হোক বাংলার মাঠ-ঘাট, নদী এ আমাদের কাম্য নয়, এমন বাংলাদেশ মুক্তিযোদ্ধোদের সোনার বাংলা নয়। মৌলবাদীদের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়ানোর, প্রতিবাদ করার এইতো সময়, তবেই না শান্তি পাবে শ্রদ্ধেয় হুমায়ুন আজাদের আত্মা। আজ তার দ্বিতীয় মৃতু্যবার্ষিকীতে তার বিদেহী আত্মার মাগফেরাত কামনা করছি, আর হামলাকারীদের দ্রুত, সুষ্ঠু আর সঠিক বিচারের দাবী জানাচ্ছি।
সর্বশেষ এডিট : ৩১ শে ডিসেম্বর, ১৯৬৯ সন্ধ্যা ৭:০০

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।



