জন্মদিনের শুভেচ্ছা জানাই আমাদের জাতীয় এবং বিলুপ্তপ্রায় কবি কাজী নজরুল ইসলামকে। নজরুলকে নিয়ে কাঁটাছেড়া করবো না আজকে। সবার সাথে একটু বিতর্কে জরাতে চাই। সাথে নজরুলকে চেনেন এমন মানুষের খোজও করা যাক কিছুটা।
বিদ্রোহী কবি কাজী নজরুল শব্দটা আমার একটুও পছন্দ না। যদিও শৈশবে “বিদ্রোহী” নামক কবিতাটি সম্পূর্ণই মুখস্ত করেছিলাম কোন এক আজব কারণে। নজরুলের সাথে ঘনিষ্ঠতার শুরু তার গান আর অল্প কিছু কবিতার মাধ্যমে। আমার বাবা ‘র নজরুলের গানের প্রতি একটু আলাদা আকর্ষণ আছে। সেটাই বোধকরি আমাকে পেয়ে বসেছে এই বেলায়। ছেলে বেলায় যখন বাচ্চারা কবিতা মুখস্ত করে আমার মনে পরা সময় গুলোর মাঝে আমার মুখস্ত ছিল গান। নজরুল, লালন এই দুটোই সবচেয়ে বেশি। সেখান থেকেই হয়তো কিছুটা ভাললাগার তৈরী।
স্কুলে যখন রচনা লিখতে হত তখনকার সময়ে কবির মহাত্ম প্রকাশ করতে আমরা বিদ্রোহী এবং সাম্যবাদীতা সহ ধর্ম নিরপেক্ষতাকেই বেশি প্রাধান্য দিয়েছি। আর স্কুলের রচনা লিখতেই হয়তো আড়াল করেছি কাজী নজরুল ইসলামের প্রেমময়তাকে। স্কুল বলে কথা। (এই জিনিষ স্কুলে লিখলে আমার মাইর একটাও মাটিতে পরতো না) সেই থেকেই আমাদের মাথায় বোধকরি একটা কথা ঢুকে গেছে বিদ্রোহী কবি কাজী নজরুল। কারো মুখে এই কথা শুনলে হাসি পায়। কারণ নজরুলের ছোট ভান্ডার কবি গুরুর তুলনায়। সেই ভান্ডারের ক্ষুদ্র কিছু অংশই আছে যেখানে দ্রোহ আর সাম্যবাদীতা প্রকাশ পেয়েছে। বাকী যে অংশটুকু বেচে যায় সে পুরোটাই তার প্রেমময়তা, প্রেয়সীকূলের প্রতি ভালবাসার প্রতিফলন। প্রেয়সীকূল কেন বললাম সেটা নাহয় উহ্যই থাক। আমরা আমাদের আসল আলাপ আলোচনা চালিয়ে যাই।
কোথায় যেন ছিলাম, হ্যা প্রেমিক পুরুষ নজরুলের কথায়। বাংলা সাহিত্যকে কত সুন্দর ভাবে শালীন ভাবে এবং মাধুর্য্যের সাথে উপস্থাপন করা যায় তার উদাহরণ নজরুলের রচনাবলীতে রয়েছে। এটা তো শুধুই কবিতা বা উপন্যাসের কথা বলছি। তার রচিত সাড়ে তিন হাজার গান এবং সে সবের সুর তার নিজেরই করা। মোহনীয় সুর আর মাধুর্য্য মন্ডিত কথার উদাহরণ দিতে গেলে নজরুলের আশে পাশে আর কাউকে খুজে পাওয়া কঠিন, অসম্ভব বলছিনা।
আপনি আমাকে নজরুলের ১ টা বদ্রোহী কবিতা দেখাবেন আমি আপনাকে ১০০ টা রোম্যান্টিক গান শোনাব। আপনি ১ টা সাম্যবাদী কবিতা বা গান শোনাবেন আমি হয়তো ২০০ রোম্যান্টিক কবিতা শোনাব। এরপরেও আমাদের মাথায় একটা কথাই আটকে আছে বিদ্রোহী নজরুল। নজরুলকে কখনোই বিদ্রোহী চোখে দেখি নি। আজও দেখছি না। বলছি প্রেমময় কবিদের মাঝে শ্রেষ্ঠত্বের দাবীদারদের মাঝে তিনিও একজন। একবার চিন্তা করে দেখুন, আপনার প্রেয়সীকে কি কি দিতে পারেন?? যোগ্যতা কতটুকু আপনার?? তৃতীয়া তিথির কানের দুল কিংবা রামধনুর লালরঙ ছেনে আলতা পড়াতে পারবেন কিনা ভেবে দেখেছেন কখনো?? নজরুল কিন্তু তা পেরেছিলেন।
একসময়ে তাকে বিধর্মীদের কবি বলে গালমন্দ করা হোত। কিন্তু হাস্যকর এই কথার উত্তর নজরুল নিজেই তার লেখায় দিয়েছেন। বাংলা ভাষায় সবচেয়ে বেশি হামদ্ ও নাত এর রচয়িতা নজরুল। এমনকি হিন্দু ধর্মের ধার্মিক বাংলা গানেও তার যেই পরিমাণ অবদান আছে তার কাছে অন্য সবাই তার নখেরও যোগ্য নয়।
সারাদিন কিছু লেখার সময় করে উঠতে পারিনি, শেষে যখন সময় হল তখন দেশের সময়ে রাত ১১ টা বাজে প্রায়। নজরুলের জন্মদিন নতুন কোন কিছু নয় আমার কাছে। নজরুলের প্রতিদিন নতুন করে জন্ম হয় আমার কাছে। প্রতিদিন পুরোনো গান গুলো নতুন করে শুনি। প্রতিদিন নতুন করে তার উপমা গুলোকে আবিষ্কার করি। হাসি পায় এবং করুণাও হয় তাদের জন্যে যাদের সামর্থ্য হয়নি নজরুলের লেখা বোঝার, কিংবা গান শোনার। তাদের জন্যে সমবেদনা ছাড়া আর কিছুই দেয়ার বাকী নেই আমার কাছে।
কিছুদিন আগে একবার বলেছিলাম আমাদের নতুন প্রজন্মের শিল্পীদের নজরুলের গানের প্রতি কোন একটা অনীহা কাজ করে সবসময়েই। এর কারণটা ঠিক খুজে পাইনি এখনো। কেউ ভিন্নধর্মী কিছু করবেন চিন্তা করলেই রবীন্দ্রনাথ আগে চলে আসেন। রবীন্দ্রনাথঠাকুর কে কোন অংশেই ছোট করতে চাই না। কিন্তু নজরুলকে অবহেলিত দেখতে ঠিক ভালও লাগে না। যেখানে নতুন করে গান না করলে কেও পুরোনো সব গান শুনতে অনীহায় পরবে সেখানে নতুন আঙ্গিকে গান গুলোকে উপস্থাপনের প্রয়োজনীয়তা অনেকাংশে বেড়েই চলেছে। সেই তুলনায় মানুষের আগ্রহ দিন দিন শুন্যের কোঠায় যাচ্ছে। চাতক পাখির ময়ন অপেক্ষা করি একটা নতুন নজরুলগীতির জন্যে। আশায় থাকি কেউ পুরো একটা এলবাম নিয়ে আসবে শীঘ্রই। পরিচিত বেশ কয়েকজন শিল্পীকে নিজেই এই কথা বলেছিও। দেখা যাক তাদের অগ্রগতি কতটুকু।
অগ্রগতি না দেখলে যদি কখনো নিজের টাকা পয়সা হয় তবে নিজেই কিছু গান রেকর্ড করে বাজারে ছাড়বো ইনশাল্লাহ। এই স্থানেও একজন অনন্ত জলিলের প্রয়োজন বৈকি। কারো সাথে কম্পিট করতে নয়। মানুষকে চোখে আঙ্গুল দিয়ে দেখানোর জন্যে।

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।



