somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

সুরা বাকারা -৩

২৪ শে আগস্ট, ২০০৮ সন্ধ্যা ৭:৫৪
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :

কোরআনের আলোর গত দুই পর্বে আমরা সূরা হামদের এক থেকে ৫ম আয়াত নিয়ে আলোচনা করেছি। তাতে আল্লাহপাক নিজেকে পরম করুণাময়, অসীম দয়ালু, প্রতিপালক ও সব কিছুর মালিক বলে পরিচয় দিয়েছেন এবং তিনি আমাদের ভালো ও মন্দ কাজের উপযুক্ত প্রতিদান দেবেন। আর আমরাও ঘোষণা দিয়েছি যে আমরা একমাত্র তাঁর কাছে মাথা নত করি, কেবল তাঁর উপর নির্ভর করি এবং তাঁরই উপর ভরসা করি।

এবারে আমরা এ সূরার ৬ষ্ঠ ও ৭ম আয়াত নিয়ে আলোচনা করবো। সূরা হামদের ছয় নম্বর আয়াতে বলা হয়েছে-অর্থাৎ "হে আল্লাহ্‌! আমাদেরকে সরল সঠিক পথে পরিচালিত কর।" মানুষের জীবন যাপনের জন্য বিভিন্ন পথ রয়েছে। ব্যক্তি তার নিজস্ব চাহিদা ও প্রয়োজন অনুযায়ী পথ বেছে নিতে পারে। সমাজ ও জনগণের চলার পথ, পূর্বপুরুষদের অনুসৃত পথ, জনগণের জন্য অত্যাচারী শাসক ও তাগুতী শক্তির পক্ষ থেকে নির্ধারিত পথ। একটি পথ হলো দুনিয়ার যাবতীয় রং, রুপ ও সৌন্দর্য উপভোগ করা। আবার অন্য একটি পথ হলো সমাজ জীবন থেকে বেরিয়ে একাকিত্ব ও নি:সঙ্গতা বেছে নেয়া। এত সব পথের মধ্যে সঠিক পথ বেছে নেয়ার জন্য মানুষের কি পথপ্রদর্শকের প্রয়োজন নেই? আল্লাহ পাক মানুষের পথপ্রদর্শনের জন্য নবী রাসূল ও আসমানী কিতাব পাঠিয়েছেন। তাই মানুষ যদি পবিত্র কোরআন, রাসূলে খোদা (সা.) ও আহলে বাইতের অনুসরণ করে তাহলে সঠিক পথের সন্ধান পাবে। তাইতো আমরা প্রত্যেক নামাজে আল্লাহর কাছে প্রার্থনা করি যাতে তিনি আমাদেরকে সরল, সঠিক পথে পরিচালিত করেন যে পথে কোন ক্ষতি ও বিভ্রান্তি নেই, তিনি যাতে ঐ পথে আমাদেরকে পরিচালিত করেন। সরল পথ হলো মধ্যম পথ। সরল পথ মানে সব কাজে মধ্যপন্থা অবলম্বন এবং যেকোন ধরনের বাড়াবাড়ি বর্জন। অনেকে মূলনীতি গ্রহণের ক্ষেত্রে বিভ্রান্তির শীকার হয় এবং অনেকে কর্মক্ষেত্রে ও নৈতিক ক্ষেত্রে ভুল পথে চলে যায়। অনেকে আবার সব কাজের জন্য আল্লাহকে দায়ী করে; যেন পরিণতির ব্যাপারে মানুষের কোন হাত নেই। কেউ আবার সব কাজে নিজের ক্ষমতাকে চূড়ান্ত মনে করে যেন সৃষ্টি জগতের কাজ-কর্মে আল্লাহর কোন হাত নেই। অনেক কাফের আল্লাহর প্রেরিত পুরুষ নবী-রাসূলদেরকে সাধারণ মানুষ এমনকি পাগল বলেও আখ্যায়িত করেছিল। অনেক বিশ্বাসী ব্যক্তি আবার হজরত ঈসা(আ.)এর মত নবীকে খোদার পর্যায়ে নিয়ে গিয়েছিল। এ ধরনের চিন্তা ও আচরণের অর্থ হলো রাসূল এবং তাঁর পবিত্র আহলে বাইতের নির্দেশিত পথ থেকে বিচ্যূত হওয়া। পবিত্র কোরআন আমাদেরকে আর্থ-সামাজিক কাজ-কর্ম ও এবাদতের ক্ষেত্রে মধ্যপন্থা অবলম্বনের নির্দেশ দিয়েছে। যেমন সূরা আঁরাফের ৩১ নম্বর আয়াতে বলা হয়েছে। অর্থাৎ "তোমরা খাও এবং পান করো। তবে অপব্যয় করোনা।" সূরা আসরা বা বনী ইসরাইলের ১১০ নম্বর আয়াতে বলা হয়েছে অর্থাৎ "নামাজে স্বর উঁচুও করো না আবার অতিশয় ক্ষীণও করো না। বরং এ দুইয়ের মধ্য পন্থা অবলম্বন কর। একই ভাবে সূরা ফুরকানের ৬৭ নম্বর আয়াতে বলা হয়েছে, অর্থাৎ "মুমিন ব্যক্তিরা যখন দান করে তখন তারা অপব্যয় করে না আবার কার্পণ্যও করে না। বরং তারা এ দুইয়ের মধ্যপন্থা অবলম্বন করে। ইসলাম ধর্মে পিতা-মাতার প্রতি সদাচরণের উপর অত্যন্ত জোর দেয়া হয়েছে এবং বলা হয়েছে, "পিতা-মাতার প্রতি উত্তম আচরণ করো।" আবার সেখানে এও বলা হয়েছে যে, "তারা যদি তোমাকে মিথ্যা পথে পরিচালিত করতে চায় তবে তাদের আনুগত্য করবে না।" যারা কেবল সমাজ থেকে বেরিয়ে একাকি এবাদত-বন্দেগীতে মশগুল হয় কিংবা শুধু মানব সেবাকে এবাদত বলে, তাদের ধারনার জবাবে পবিত্র কোরআন নামাজ ও জাকাতকে পাশাপাশি বর্ণনা দিয়ে বলেছে, " তোমরা নামাজ কায়েম কর এবং জাকাত আদায় কর।" এর একটি স্রষ্টার সাথে সম্পর্কিত এবং অন্যটি মানুষের সাথে সম্পর্কিত এবাদত। প্রকৃত মুমিন হলো তারা- যাদের আকর্ষণও রয়েছে এবং বিকর্ষণও রয়েছে।সূরা ফাতেহার শেষ আয়াতে বলা হয়েছে, "মোহাম্মদ রাসূলুল্লাহ (সা.) এবং তাঁর অনুসারীরা সত্য প্রত্যাখ্যানকারীদের প্রতি কঠোর এবং নিজেদের মধ্যে পরস্পরের প্রতি সহানুভূতিশীল। সূরা ফাতেহার ৬ নম্বর আয়াত থেকে যে বিষয়গুলো শিক্ষণীয় রয়েছে , তাহলো-সিরাতে মুস্তাকিম বা সরল পথই হলো কল্যাণের পথ। কারণ আল্লাহর সরল পথ অপরিবর্তনিয় কিন্তু মানব রচিত পথগুলো প্রতিদিন পরিবর্তীত হয়। অন্যদিকে দুটি বিন্দুর মধ্যে সবচেয়ে নিকটবর্তী পথ হলো সরল পথ এবং এই পথ একাধিক নয়। সরল সোজা পথে কোন বাঁক নেই এবং সবচেয়ে কম সময়ে এ পথ তাকে গন্তব্যে পৌঁছে দিতে পারে। আর সুরা "হামদ" এর ৬ নম্বর আয়াতের শেষ শিক্ষা হলো-সরল সঠিক পথ নির্বাচন এবং এ পথে টিকে থাকার জন্য আল্লার কাছে সাহায্য চাওয়া। কারণ আমরা বিভ্রান্তির মধ্যে পড়তে পারি। এ যাবত জীবন চলার পথে কোন বিভ্রান্তির মধ্যে না পড়লেও এটা কখনোই ভাবা ঠিক নয় যে পরবর্তী জীবনেও সঠিক চলতে পারবো। আমাদের মধ্যে এমন কত লোকই না আছে যারা সারা জীবন মুমিন ছিলেন কিন্তু যখন অর্থ-সম্পদ বা কোন পদ লাভ করেছেন তখন খোদাকে ভুলে গেছে। সরল সঠিক পথ চেনা কঠিন কাজ। তাই পরবর্তী আয়াতে এ পথের বাস্তব আদর্শ এবং যারা ঐ পথ থেকে বিচ্যুত হয়েছে তাদের পরিচয় আমাদের সামনে তুলে ধরে। সূরা ফাতেহার ৭ম আয়াত হলো- হে আল্লাহ! আমাদেরকে ঐ ব্যক্তিদের পথে পরিচালিত কর, যাদের তুমি অনুগ্রহ দান করেছো। তাদের পথে নয় যারা ক্রোধের শিকার এবং পথভ্রষ্ট।

জীবন চলার পথ বেছে নেয়ার ক্ষেত্রে মানুষ ৩টি দলে বিভক্ত। এক দল আল্লাহর পথ বেছে নেয় এবং আল্লাহর দেয়া জীবন-বিধান অনুযায়ী নিজেদের ব্যক্তিগত ও সামাজিক জীবন পরিচালনা করে। এ দল সবসময় আল্লাহর রহমত, অনুগ্রহ ও দয়া লাভ করে। প্রথম দলের বিপরীতে আরেকটি দল রয়েছে যারা সত্য চেনার পরও আল্লাহকে ছেড়ে গায়রুল্লাহকে বেছে নিয়েছে এবং নিজের কামনা-বাসনা, বন্ধু-বান্ধব, আত্মীয়-পরিজন ও সমাজের ইচ্ছাকে আল্লাহর ইচ্ছার উপর প্রাধান্য দেয়। এ দলের লোকদের মধ্যে তাদের কৃতকর্মের প্রভাব ধীরে ধীরে গেঁড়ে বসে এবং তারা সরল পথ থেকে বিচ্যুত হয়। তারা আল্লাহর সান্নিধ্য এবং দয়া লাভের পরিবর্তে ধ্বংসের অতল গহ্বরে পতিত হয়, আর আল্লাহর গজবের মধ্যে পড়ে। এই আয়াতে এ দলকে "মাগদুবি আলাইহিম" বা ক্রোধ নিপতিত বলে আখ্যায়িত করা হয়েছে। তৃতীয় আরেকটি দল রয়েছে যাদের কোন সুনির্দিষ্ট পথ নেই এবং কোন্‌ পথে চলবে তা ঠিক করতে পারেনি। তারা দিকভ্রান্ত এবং বিভ্রান্ত । এ আয়াতে তাদেরকে "দা'ল্লিন" বা পথভ্রষ্ট হিসেবে আখ্যায়িত করা হয়েছে। তারা প্রতিদিন একেক পথ বেছে নেয় কিন্তু গন্তব্যে পৌঁছতে পারে না। আমরা প্রত্যেক নামাজে যে বলি- "হে আল্লাহ! আমাদেরকে সরল পথ প্রদর্শন কর, তাদের পথ যাদেরকে তুমি অনুগ্রহ দান করেছো। নবী-রসূল, ওলী-আওলীয়া ও সৎ কর্মশীলদের পথে। তাদের পথে আমাদেরকে পরিচালিত করোনা যারা মানবতা থেকে দূরে সরে গেছে, তোমার ক্রোধের শিকার, দিক-ভ্রান্ত এবং একেক দিন একেক রুপ ধারণ করে। এখানে একটি প্রশ্ন জাগে, তাহলো-ক্রোধের শিকার ও পথভ্রষ্ট কারা? এর উত্তর হলো পবিত্র কোরআনে বহু দল ও ব্যক্তিকে পথভ্রষ্ট ও ক্রোধের শিকার বলে আখ্যায়িত করা হয়েছে। আমরা এখানে একটি স্পষ্ট উদাহরণ পেশ করবো।

কোরআনে বনি ইসরাইলের কাহিনী বর্ণনা করা হয়েছে এবং হজরত মূসা(আ.) কিভাবে তাদেরকে ফেরাউনের নির্যাতনের হাত থেকে মুক্তি দিয়েছেন তারও বিশদ বর্ণনা দেয়া হয়েছে। বনী ইসরাইল বংশের লোকেরা আল্লাহর নির্দেশ মেনে চলায় আল্লাহ তাদেরকে ঐ যুগের সব মানুষের উপর শ্রেষ্ঠত্ব দান করেন। এ সম্পর্কে সূরা বাকারার ৪৭ নম্বর আয়াতে বলা হয়েছে-"আমি তোমাদেরকে বিশ্বে সবার উপর শ্রেষ্ঠত্ব দান করেছি।" কিন্তু এই বনী ইসরাইল জাতিই তাদের আচরণের জন্য আল্লাহর ক্রোধের শিকার হয়। পবিত্র কোরআনে এ বিষয়ে বলা হয়েছে- "তারা আল্লাহর গজবের শিকার হয়েছে"। কারণ ইহুদী পুরোহিতরা আসমানী গ্রন্থ তৌরাতের বিধান বিকৃত করেছিল। তাদের মধ্যে যারা ব্যবসায়ী ও ধনী তারা সুদ গ্রহণ ও হারাম ব্যবসায় নিয়োজিত হয়েছিল। এত সব বিকৃতি ও অন্যায় সত্ত্বেও বনী ইসরাইল জাতির ভালো লোকেরা নিরবতা অবলম্বন করে এবং কোন প্রতিক্রিয়া দেখায় না। তাই শেষ পর্যন্ত এ জাতি সম্মান ও মর্যাদার শীর্ষ থেকে অপমান ও ধ্বংসের মধ্যে পতিত হয়। #

সর্বশেষ এডিট : ২৪ শে আগস্ট, ২০০৮ সন্ধ্যা ৭:৫৬
০টি মন্তব্য ০টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

একজন বণিক, যিনি বদলে দিয়েছিলেন সমগ্র আরবের ইতিহাস

লিখেছেন সৈয়দ কুতুব, ০৮ ই জুন, ২০২৬ রাত ২:৪৩


মরুভূমির মাঝে দাঁড়িয়ে পুরো আরবকে বদলে দেওয়ার স্বপ্ন দেতেন একজন মানুষ। শুনতে পাগলামি লাগে, তাই না? কিন্তু সেই মানুষটা যদি ছোটবেলা থেকে কাফেলায় কাজ করে থাকেন, যদি তিনি জানেন... ...বাকিটুকু পড়ুন

কৃত্তিম বুদ্ধিমত্তা যেভাবে আব্বাসীদের জন্য হুমকি হয়ে আসছে- কী হবে খালেদ মহিউদ্দিনের?

লিখেছেন হিমন, ০৮ ই জুন, ২০২৬ রাত ২:৫০

হোমো ইরেক্টাসদের প্রায় বিশ লাখ বছর আগের আগুনের ব্যবহার থেকে শুরু করে ছয় হাজার বছর আগের চাকা আবিষ্কার, ১৮৩১ সালের বিদ্যুৎ, গত শতাব্দীর অ্যান্টিবায়োটিক, আর এই সেদিনের ইন্টারনেট ও স্মার্টফোন—... ...বাকিটুকু পড়ুন

আসলে কেউ ফেরে না।

লিখেছেন রানার ব্লগ, ০৮ ই জুন, ২০২৬ সকাল ৭:০৬

মৃতরা ফিরে আসে না।
ফিরে আসে তাদের ফেলে যাওয়া শূন্যতা,
চায়ের কাপের ধোঁয়া,
অধেক বলা কোনো কথা
অথবা হঠাৎ থেমে যাওয়া কোন সুর

যে প্রেম চলে গিয়েছিল,
সে আর কোনোদিন দরজায় কড়া নাড়ে না।
শুধু একদিন আয়নায়... ...বাকিটুকু পড়ুন

দ্য ড্রাগ কিং

লিখেছেন শাম্মী নূর-এ-আলম রাজু, ০৮ ই জুন, ২০২৬ দুপুর ১২:১৫


সতর্কবার্তা: এটি একটি সম্পূর্ণ কাল্পনিক ক্রাইম ফিকশন। বাস্তব একটি অপরাধের কাঠামোর ওপর ভিত্তি করে পাঠকদের জন্য এর চরিত্র, নাম এবং স্থান পরিবর্তন করে গল্পটি সাজানো হয়েছে।

খুলনা... ...বাকিটুকু পড়ুন

সামুতে আবারও লিলিপুটিয়ানদের সংখ্যা বেড়ে যাচ্ছে

লিখেছেন সত্যপথিক শাইয়্যান, ০৮ ই জুন, ২০২৬ দুপুর ১২:৫৮

আমার গত পোস্টে আলামিন১০৪ নামের এক ব্লগার মন্তব্য করেছেন যে - "এ আই দিয়ে হুমায়ূন আহমেদের মতো লেখা যায়।"
তিনি এ আই-কে প্রম্পট দিয়েছিলেন ' হুমায়ুন আহমেদের মতো গল্প লিখে... ...বাকিটুকু পড়ুন

×