somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

সুরা বাকার- [৫]

২৭ শে আগস্ট, ২০০৮ বিকাল ৩:২৭
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :

কোরআনের আলোর আজকের পর্বেও আমরা সূরা বাকারা নিয়ে আলোচনা করব। এর আগের পর্বে এই সূরার প্রথম ও দ্বিতীয় আয়াত নিয়ে আলোচনা করেছিলাম। এবারে এ সূরার তৃতীয় ও চতুর্থ আয়াতের ব্যাখ্যা তুলে ধরবো।
সূরা বাকারার দ্বিতীয় আয়াতে কোরআনের পথনির্দেশনা ও হেদায়েতকে মুত্তাকী ও পরহেযগারদের জন্য বলে মন্তব্য করা হয়েছে। পরের আয়াতগুলোয় ঐ পরহেযগারদের বৈশিষ্ট্য বর্ণনা করা হয়েছে। তৃতীয় আয়াতে বলা হয়েছে- "মুত্তাকী ও পরহেযগার তারাই যারা অদৃশ্যে বিশ্বাস করে, নামাজ কায়েম করে এবং তাদেরকে যে জীবিকা দেয়া হয়েছে তা থেকে দান করে।" পবিত্র কোরআন বিশ্বজগতকে দুটি ভাগে বিভক্ত করেছে। একটি অদৃশ্য জগত যা আমরা চর্মচক্ষুতে দেখতে পাইনা, আর অপরটি হচ্ছে দৃশ্যমান জগত। অর্থাৎ ইন্দ্রিয়ের সাহায্যে আমরা যে জগত অনুভব করি; সেই বস্তুগত জগত কেবলমাত্র চোখে দেখা যায়, কানে শোনা যায় এবং পঞ্চ ইন্দ্রিয়ের সাহায্যে অনুভব করা যায় এমন সব বিষয়ের অস্তিত্ব স্বীকার করে। অথচ আমাদের সীমাবদ্ধ ইন্দ্রিয়ের পক্ষে সমস্ত সৃষ্টিজগত অনুভব করা সম্ভব নয়। যেমন আমরা নীচের দিকে বস্তুর পতন থেকে বুঝি যে পৃথিবীর আকর্ষণ শক্তি রয়েছে। অর্থাৎ আকর্ষণ শক্তিকে আমরা এর প্রভাব থেকে বুঝি। এমন অনেক লোক আছে যারা আল্লাহকে বিশ্বাস করার জন্য তাঁকে চোখে দেখতে চায়। যেমন বনি ইসরাইল গোত্র হজরত মূসা(আঃ) কে বলেছিল-"আল্লাহকে স্পষ্টভাবে না দেখা পর্যন্ত আমরা তোমার প্রতি ঈমান আনবো না।" অথচ আল্লাহপাক কোন বস্তুগত কিছু নন যে তাঁকে দেখা যাবে। তবে আমরা সৃষ্টিজগতে বিরাজমান অসংখ্য নিদর্শন থেকে তাঁর অস্তিত্ব সম্পর্কে নিশ্চিত হই এবং তাঁর প্রতি ঈমান আনি। সত্য অনুসন্ধানী ও তাকওয়া সম্পন্ন ব্যক্তিরা শুধু এই বস্তুগত জগতের মধ্যেই তাদের দৃষ্টি সীমাবদ্ধ রাখেননি। তারা অদৃশ্য জগত অর্থাৎ আল্লাহপাক, ফেরেশতাকুল, আখেরাত যা পঞ্চ-ইন্দ্রিয় দিয়ে অনুভব করা যায় না তার প্রতিও বিশ্বাস রাখেন। অবশ্য ঈমান জ্ঞানের উর্দ্ধে। ঈমান হলো এমন পর্যায় যাতে মানুষের অন্তর ও আত্মাও কোন কিছুর অস্তিত্ব স্বীকার করে, তার সাথে সম্পর্ক স্থাপন করে, ভালবাসে। এটা স্পষ্ট যে এ ধরনের ঈমান ও বিশ্বাস থেকে সৎ কাজ উৎসারিত হবে। মূলতঃ ইসলামের দৃষ্টিতে আমল বা বাস্তব কর্ম ছাড়া শুধু ঈমান দিয়ে মানুষের বিকাশ ও অগ্রগতি অর্জিত হবে না। এই আয়াতে বলা হয়েছে মুত্তাকী ও পরহেযগার ব্যক্তিরা অদৃশ্যে বিশ্বাস রাখেন। তারা নামায পড়েন এবং দান-খয়রাত করেন। নামাযের মাধ্যমে তারা আল্লাহকে স্মরণ করেন, নিজেদের মন ও আত্মার প্রয়োজন পূরণ করেন এবং লাভ করেন অনাবিল প্রশান্তি। অপরপক্ষে নিজেদের উপার্জিত অর্থ-সম্পদের একটি অংশ অভাবগ্রস্তদের হাতে তুলে দিয়ে সমাজের চাহিদা পূরণ করেন, যাতে সমাজেও শান্তি ও স্বাচ্ছন্দ্য বিরাজ করে। অবশ্য কেবল নামায পড়া যথেষ্ট নয় বরং নামায কায়েম করতে হবে। অর্থাৎ নিজেও নামায পড়তে হবে অপরকেও নামাযের প্রতি আহ্বান জানাতে হবে। আযানের পরপরই উত্তম সময়ে নামায পড়তে হবে এবং নামায আদায় করতে হবে মসজিদে জামাতবদ্ধ হয়ে। এভাবে সমাজে নামায প্রতিষ্ঠা করতে হবে। দানের ক্ষেত্রেও শুধু আর্থিক দানই ইসলামের উদ্দেশ্য নয়। লক্ষ্য রাখতে হবে কোরআনে বলা হয়েছে-" যা কিছু তোমাদেরকে দেয়া হয়েছে তা থেকে দান কর।" ধন-সম্পদ, শক্তি, ক্ষমতা, জ্ঞান, বুদ্ধি এবং আল্লাহর দেয়া সব কিছু এঅন্তর্ভূক্ত।
সূরা বাকারার ৩ নম্বর আয়াতের কয়েকটি শিক্ষণীয় দিক এবার তুলে ধরা যাক।
প্রথমতঃএই বিশ্বজগত কেবল বস্তুজগতের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয় বরং এমন বহু বিষয় আছে যা আমাদের দৃষ্টির আড়ালে। তবে আমাদের অন্তর ও বিচারবুদ্ধি সেসবের অস্তিত্ব স্বীকার করে। তাই সেসব অদৃশ্যের প্রতি আমাদের বিশ্বাস করা উচিৎ।
দ্বিতীয়তঃঈমান কর্ম থেকে বিচ্ছিন্ন নয়। মুমিন ও বিশ্বাসী ব্যক্তি কাজের লোক। অবশ্য ঐসব কাজ যার নির্দেশ আল্লাহ তাকে দিয়েছেন।
তৃতীয়তঃনামাজ হলো ঈমানদার ব্যক্তিদের কাজের কেন্দ্রবিন্দু।
চতুর্থতঃ আমাদের যাকিছু আছে সবই আল্লাহর। তাই এর কিছু অংশ আল্লাহর জন্য দান করবো। আর আল্লাহও দুনিয়া এবং আখেরাতে আমাদেরকে এর উত্তম প্রতিদান দেবেন।
সূরা বাকারার এ আয়াতের আরেকটি শিক্ষণীয় দিক হলো-ইসলামকে সামাজিক ধর্ম হিসেবে তুলে ধরা। ইসলাম সমাজ পরিচালনার জন্য একটি পূর্ণাঙ্গ ধর্ম। এ ধর্ম আল্লাহর সাথে সম্পর্কের কথাও বলে, আবার মানুষের সাথে সম্পর্কের কথাও বলে। একই সাথে সমাজের প্রয়োজনের দিকে লক্ষ্য রাখার নির্দেশ দেয়।
এবারে কোরআনের ভাষায় মুমিন ব্যক্তিদের আরো কিছু বৈশিষ্ট্য সম্পর্কে জানা যাক। সূরা বাকারার ৪র্থ আয়াতে বলা হয়েছে-"মুত্তাকী ও পরহেযগার তারাই যারা তোমার উপর এবং তোমার আগের পয়গম্বরদের উপর যা অবতীর্ণ হয়েছে সেগুলোর প্রতি বিশ্বাস রাখার পাশাপাশি, পরকালের প্রতিও পরিপূর্ণ বিশ্বাসী। আল্লাহকে চেনার একটি পথ হলো অহী। আর তাই তাকওয়া সম্পন্ন ব্যক্তিরা অহীতে বিশ্বাস করেন। এর আগের আয়াতে যেমনটি বলেছি উপলদ্ধি ক্ষমতা শুধু মানুষের ইন্দ্রিয়ের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়, বরং বস্তুগত জগতের উর্দ্ধেও ভিন্ন জগত রয়েছে যার অস্তিত্বকে মানুষের আক্‌ল বা বিচারবুব্ধি প্রবলভাবে সমর্থন করে। তবে এই আক্‌লও নিখুঁতভাবে ঐ জগত উপলদ্ধিতে অক্ষম। আর এ জন্যে আল্লাহপাক অহী পাঠিয়ে আমাদের ক্ষমতাকে পূর্ণ করেছেন। আমাদের আক্‌ল বা বিচারবুদ্ধি বলে-একজন স্রষ্টা আছেন। কিন্তু অহী আমাদেরকে ঐ স্রষ্টার গুণ ও বৈশিষ্ট্য বর্ণনা দেয়। আমাদের বিচারবুদ্ধি বলে, মানুষকে উপযুক্ত পুরস্কার বা শাস্তি দেয়ার জন্য মহাবিচারের ব্যবস্থা থাকতে হবে। আর অহী আমাদেরকে বলে, কেয়ামতের মাধ্যমেই হবে সেই মহাবিচার। অতএব দেখা যাচ্ছে, বিচারবুদ্ধি ও অহী একে অন্যের পরিপূরক, আর ঈমানদার ব্যক্তিরা উভয় পন্থা ব্যবহার করেন। অহী শুধু মহানবী মোহাম্মদ (সঃ ) এর উপরই নাযিল হয়নি, বরং সব নবীর উপরই নাযিল হয়েছে আল্লাহর প্রত্যাদেশ বা অহী। তাই পরহেযগার ও খোদাভীরু লোকদের অযৌক্তিক কোন বিদ্বেষ নেই। তারা পূর্ববর্তী নবীদের অস্বীকার করেন না, বরং নবীজীর পাশাপাশি তারা আল্লাহর সব পয়গম্বর এবং তাদের উপর নাযিলকৃত অহীতে বিশ্বাস করেন। এ ছাড়াও সূরা বাকারার ৪ নম্বর আয়াতে মুমিনদের আরেকটি বিশ্বাসের কথা বলা হয়েছে। আর তা হলো আখেরাত। পরকালও একটি অদৃশ্য বিষয়। পরকাল সম্পর্কে ভালোভাবে জানতে হলে অহীর উপর ভরসা করা ছাড়া উপায় নেই। এর ভিত্তিতে মুমিন ব্যক্তিরা কেয়ামতে পূর্ণ বিশ্বাস রাখেন এবং মৃত্যুকে মানুষের জীবনের চূড়ান্ত পরিসমাপ্তি বলে মনে করেন না। সূরা বাকারার এ আয়াতটি থেকে আমাদের কয়েকটি শিক্ষণীয় বিষয় হলোঃ
প্রথমতঃ সকল নবী রাসূলের উদ্দেশ্য এক ও অভিন্ন। তাই সব আসমানী গ্রন্থের প্রতি ঈমান রাখা প্রয়োজন।

দ্বিতীয়তঃঐশী গ্রন্থগুলোর উত্তরাধিকারী হলো মুসলিম উম্মাহ। তাই মুসলমানদের আসমানী কিতাব সংরক্ষণের চেষ্টা চালাতে হবে। #

সর্বশেষ এডিট : ২৭ শে আগস্ট, ২০০৮ বিকাল ৩:৩৩
০টি মন্তব্য ০টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

একজন বণিক, যিনি বদলে দিয়েছিলেন সমগ্র আরবের ইতিহাস

লিখেছেন সৈয়দ কুতুব, ০৮ ই জুন, ২০২৬ রাত ২:৪৩


মরুভূমির মাঝে দাঁড়িয়ে পুরো আরবকে বদলে দেওয়ার স্বপ্ন দেতেন একজন মানুষ। শুনতে পাগলামি লাগে, তাই না? কিন্তু সেই মানুষটা যদি ছোটবেলা থেকে কাফেলায় কাজ করে থাকেন, যদি তিনি জানেন... ...বাকিটুকু পড়ুন

কৃত্তিম বুদ্ধিমত্তা যেভাবে আব্বাসীদের জন্য হুমকি হয়ে আসছে- কী হবে খালেদ মহিউদ্দিনের?

লিখেছেন হিমন, ০৮ ই জুন, ২০২৬ রাত ২:৫০

হোমো ইরেক্টাসদের প্রায় বিশ লাখ বছর আগের আগুনের ব্যবহার থেকে শুরু করে ছয় হাজার বছর আগের চাকা আবিষ্কার, ১৮৩১ সালের বিদ্যুৎ, গত শতাব্দীর অ্যান্টিবায়োটিক, আর এই সেদিনের ইন্টারনেট ও স্মার্টফোন—... ...বাকিটুকু পড়ুন

আসলে কেউ ফেরে না।

লিখেছেন রানার ব্লগ, ০৮ ই জুন, ২০২৬ সকাল ৭:০৬

মৃতরা ফিরে আসে না।
ফিরে আসে তাদের ফেলে যাওয়া শূন্যতা,
চায়ের কাপের ধোঁয়া,
অধেক বলা কোনো কথা
অথবা হঠাৎ থেমে যাওয়া কোন সুর

যে প্রেম চলে গিয়েছিল,
সে আর কোনোদিন দরজায় কড়া নাড়ে না।
শুধু একদিন আয়নায়... ...বাকিটুকু পড়ুন

দ্য ড্রাগ কিং

লিখেছেন শাম্মী নূর-এ-আলম রাজু, ০৮ ই জুন, ২০২৬ দুপুর ১২:১৫


সতর্কবার্তা: এটি একটি সম্পূর্ণ কাল্পনিক ক্রাইম ফিকশন। বাস্তব একটি অপরাধের কাঠামোর ওপর ভিত্তি করে পাঠকদের জন্য এর চরিত্র, নাম এবং স্থান পরিবর্তন করে গল্পটি সাজানো হয়েছে।

খুলনা... ...বাকিটুকু পড়ুন

সামুতে আবারও লিলিপুটিয়ানদের সংখ্যা বেড়ে যাচ্ছে

লিখেছেন সত্যপথিক শাইয়্যান, ০৮ ই জুন, ২০২৬ দুপুর ১২:৫৮

আমার গত পোস্টে আলামিন১০৪ নামের এক ব্লগার মন্তব্য করেছেন যে - "এ আই দিয়ে হুমায়ূন আহমেদের মতো লেখা যায়।"
তিনি এ আই-কে প্রম্পট দিয়েছিলেন ' হুমায়ুন আহমেদের মতো গল্প লিখে... ...বাকিটুকু পড়ুন

×