somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

পবিত্র কুরআন-৭

৩১ শে আগস্ট, ২০০৮ রাত ৯:০২
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :

কোরআনের আলো অনুষ্ঠানের এ পর্বে আমরা সূরা বাকারার ৮, ৯ ও ১০ নম্বর আয়াত নিয়ে আলোচনা করব। সূরা বাকারার ৮ নম্বর আয়াতে বলা হয়েছে- "মানুষের মধ্যে এমন লোক আছে যারা বলে-আমরা আল্লাহ ও পরকালে বিশ্বাসী। অথচ তারা বিশ্বাসী নয়।" হেদায়েত বা পথপ্রদর্শনের গ্রন্থ কোরআন আমাদের জন্য মুমিন, কাফের ও মুনাফেকদের বৈশিষ্ট্য বর্ণনা করেছে। যাতে আমরা নিজেদের সম্পর্কেও জানতে পারি যে, কোন দলে আছি এবং অন্যদেরকেও চিনতে পারি। এ ভাবে সচেতনভাবে আমরা সমাজের সদস্যদের সাথে উপযুক্ত আচরণ করতে পারি।
সূরা বাকারার প্রথম থেকে এ পর্যন্ত ৪টি আয়াতে মুমিনদের এবং দুটি আয়াতে কাফেরদের পরিচয় তুলে ধরা হয়েছে। এ আয়াত এবং পরবর্তী আয়াতগুলোয় তৃতীয় একটি দলের পরিচয় বর্ণনা করা হয়েছে। প্রথম দলের সদস্যদের মধ্যে যে ঈমানী নূর রয়েছে তাও এ দলের সদস্যদের মধ্যে নেই। আবার দ্বিতীয় দলের সদস্যদের মতো ঔদ্ধত্য এদের মধ্যে নেই। এ তৃতীয় দলের সদস্যদের অন্তরে কোন ঈমান নেই এবং মুখেও এরা খোদাদ্রোহিতামূলক কিছু প্রকাশ করে না। এরা ভীতু মুনাফিক যারা কিনা অন্তরের অবিশ্বাস ও কুফরী গোপন করে রাখে এবং বাহ্যিকভাবে ইসলামের দাবী করে।
ইসলামের নবী হজরত মোহাম্মদ(সা:) মক্কা থেকে মদীনায় হিজরতের পর বদরের যুদ্ধ সংঘটিত হয়। মুশরিকরা এ যুদ্ধে মুসলমানদের হাতে পরাজয় বরণ করার পর মক্কা ও মদীনার কিছু লোক ইসলামে বিশ্বাস না করলেও জান-মাল রক্ষা কিংবা মুসলমানদের মধ্যে কোন উঁচু পদে আসন হবার জন্য বাহ্যিকভাবে ইসলামের প্রতি বিশ্বাসের দাবী করে। তারা বাহ্যিকভাবে আচার-আচরণে নিজেদেরকে অন্যদের সাথে মিশিয়ে ফেলে। এটা স্পষ্ট যে এ ধরনের লোকেরা ভীতু এবং কাফেরদের মত প্রকাশ্যে ইসলামকে অস্বীকারের সাহস তাদের মধ্যে নেই। যেকোন সামাজিক পরিবর্তন ও বিপ্লবের মধ্যে বহুরূপী ও দ্বিমুখী চরিত্রের সন্ধান পাওয়া যায়। তাই যারা মুখে ঈমানের কথা বলে, তারা অন্তরেও যে একই ধরনের বিশ্বাস পোষণ করে সে কথা ভাবা ঠিক নয়। এমন বহু লোক আছে যারা বাহ্যিকভাবে ধর্ম পরায়ণ মুসলমান,অথচ সবার অলক্ষ্যে তারা ইসলামের উপর আঘাত হানে। সূরা বাকারার এই ৮ নম্বর আয়াতের প্রধান শিক্ষণীয় বিষয় হলো-ঈমান অন্তরের ব্যাপার, মৌখিক কিছু নয়। তাই কোন ব্যক্তিকে চেনার জন্য শুধু তার মৌখিক ব্যক্তব্যকে যথেষ্ঠ মনে করা উচিৎ নয়।
সূরা বাকারার ৯ নম্বর আয়াতে বলা হয়েছে- "তারা আল্লাহ ও বিশ্বাসীদেরকে প্রতারিত করতে চায়। অথচ তারা যে নিজেদেরকে ছাড়া কাউকে প্রতারিত করেনা তা বুঝতে পারে না।" মুনাফিকদের ধারনা তারা অত্যন্ত চালাক এবং তাদের চালাকি কেউ ধরতে পারে না। তারা নিজেদেরকে ঈমানদার হিসাবে প্রকাশ করে মনে করে মুসলমানদের মতো বিভিন্ন সুবিধা ভোগ করতে পারবে এবং আল্লাহকে ধোকা দিতে পারবে। তারা পয়গম্বর ও মুমিনদেরকে ধোকা দিয়ে মোক্ষম সময়ে ইসলামের উপর আঘাত হানতে চায়। কিন্তু আল্লাহ তাদের অন্তরের বিশ্বাস অবিশ্বাস এবং দ্বিমুখী চরিত্র সম্পর্কে জানেন। উপযুক্ত সময়ে তিনি তাদের মুখোশ উন্মোচিত করেন এবং মুমিনদের কাছে এদের কদর্য চেহারা প্রকাশ করে দেন। কোন অসুস্থ লোক যদি চিকিৎসকের দেয়া ব্যবস্থাপত্র মেনে না চলে চিকিৎসককে মিথ্যা কথা বলে তাহলে সে নিজেকেই ধোকা দিল। যদিও সে ভাবে যে সে মিথ্যা বলে চিকিৎসককে ধোকা দিয়েছে। কোরআনে বর্ণিত মুনাফিকরাও এরকম। এই বহুরুপী লোকেরা মনে করে তারা আল্লাহকে ধোকা দিয়েছে। আসলে তারা নিজেরাই নিজেদেরকে প্রতারিত করে থাকে। সূরা বাকারার ৯ নম্বর আয়াতের কয়েকটি শিক্ষণীয় বিষয় এবার তুলে ধরা যাক।
প্রথমত: মুনাফিকরা ধোকাবাজ। মানুষের বাহ্যিক চেহারা ও আচরণ দেখে যাতে ধোকা না খায়, সে জন্য সতর্ক থাকতে হবে।
দ্বিতীয়ত: অন্যদের সাথেও প্রতারণা করা থেকে আমাদের বিরত থাকতে হবে। কারণ প্রতারণার কুফলে খোদ প্রতারকই আক্রান্ত হয়।
তৃতীয়ত: মুনাফিকরা ইসলামের সাথে যে ধরনের আচরণ করে তাদের প্রতি ইসলামের ব্যবহারও সেরকম। অর্থাৎ বাহ্যত: মুনাফিকরা মুসলমান হওয়ার ভাব দেখায়, তাই ইসলামও বাহ্যিকভাবে তাকে মুসলমান হিসাবেই জানে। তার অন্তরে ঈমানের লেশমাত্র নেই, তাই কেয়ামতের দিন আল্লাহ তাকে কাফেরদের মত শাস্তি দেবেন।
চতুর্থত: মুনাফিক ব্যক্তি নিজেকে খুব চালাক বলে মনে করে, অথচ সে নির্বোধ। সে জানে না যে তার প্রতিপক্ষ আল্লাহ সবার মনের গোপন খবর রাখেন।
সূরা বাকারার ১০ নম্বর আয়াতে বলা হয়েছে- "তাদের অন্তরে রোগ আছে। এরপর আল্লাহ তাদের রোগ বৃদ্ধি করেন। তাদের মিথ্যাবাদিতার কারণে তাদের জন্য রয়েছে কষ্টদায়ক শাস্তি।"
অন্তরের অসুস্থতার যদি চিকিৎসা করা না হয় তাহলে ক্রমেই তা বৃদ্ধি পায় এবং এক সময় তার মনুষ্যত্ব ধ্বংস করে দেয়। ‘নিফাক' বা কপটতা আত্মার অন্যতম বিপদ জনক ব্যাধি যা আমাদের সবার মন ও আত্মার জন্য হুমকির সৃষ্টি করে। সুস্থ ব্যক্তি বহুরূপী নয়। তার দেহ ও আত্মার মধ্যে রয়েছে পূর্ণ সমন্বয়। মনে যা আছে তাই সে বলে এবং তার চিন্তার সাথে আচরণের মিল থাকে। কপটতার রোগ অন্য বেশ কিছু আত্মার রোগ সৃষ্টি করে। ব্যক্তির মধ্যে হিংসা, লোভ, কৃপণতা এসব কিছু সহজেই দেখা যায় কপটতা থেকে। এই কপটতা ক্যান্সারের মত দিন দিন মুনাফিক ব্যক্তির মনে-প্রাণে ছড়িয়ে পড়ে। পবিত্র কোরআন মিথ্যাচারকে ‘কপটতা' রোগের মূল উৎস বলে অভিহিত করে। মিথ্যা থেকেই এ কপটতা শুরু হয় এবং মিথ্যার মাধ্যমেই তা অব্যাহত থাকে। আর মিথ্যা বলা থেকে তারা নিজেরাই ক্ষতিগ্রস্ত হয়। কোন মৃত দেহ যখন পানিতে পড়ে থাকে তখন সেটা থেকে ভীষণ দুর্গন্ধ বের হতে থাকে। বৃষ্টির পানিতে ঐ লাশের দুর্গন্ধ মোটেও কমে না বরং পঁচে গলে ঐ লাশ থেকে আরো বিকট গন্ধ বের হতে থাকে। নিফাককে ঠিক লাশের সাথে তুলনা করা যায়। এই নিফাক বা কপটতা যদি কোন ব্যক্তির মনে শিকড় গেড়ে বসে তাহলে আল্লাহর পক্ষ থেকে যত হুকুম নাযিল হোক না কেন কোন লাভ হবে না। বরং মুনাফিক ব্যক্তি নিজেকে পরিশুদ্ধ করার পরিবর্তে বাহ্যিকভাবে ভালো ও সৎ ব্যক্তির মত আচরণ করে। ফলে তার কপটতা বাড়তে থাকে এবং এটি তার মনের মধ্যে স্থায়ী আসন গেড়ে নেয়। নিফাক শব্দটির অর্থ বেশ ব্যাপক, মানুষের কথা ও কাজের মধ্যে যে কোন ধরনের অসংগতিও এই শব্দের আওতায় পড়ে। একজন মুমিন ব্যক্তির মধ্যেও এ ধরনের অসামঞ্জস্য থাকতে পারে। ইবাদতের মধ্যেও নিফাক কপটতা থাকতে পারে। যদি কোন লোক আল্লাহ ছাড়া অন্য কোন উদ্দেশ্যে ইবাদত করে সেটাও এক ধরনের নিফাক। রাসূলে খোদা(সা:) বলেছেন কোন ব্যক্তি যত নামাজ রোজাই করুক না কেন তিনটি বৈশিষ্ট্যের অধিকারী হলে সেই হবে মুনাফিক। আমানতের খিয়ানত করা, মিথ্যা কথা বলা এবং প্রতিশ্রুতি ভঙ্গ করা। এ আয়াতের কয়েকটি শিক্ষণীয় বিষয় হচ্ছে-
প্রথমত: নিফাক হচ্ছে এক ধরনের মানসিক রোগ। সে পুরোপুরি সুস্থও নয় আবার মৃতও নয়। মুমিনও নয় আবার কাফেরও নয়।
দ্বিতীয়ত: নিফাক ক্যান্সারের মতো সারা শরীরে ছড়িয়ে পড়তে পারে। যদি এর চিকিৎসা না হয় তাহলে মানুষের পুরো অস্তিত্ব হুমকিগ্রস্ত হয়ে পড়ে।
তৃতীয়ত: মিথ্যাই হচ্ছে নিফাকের উৎস। মুনাফিকদের সাধারণ বৈশিষ্ট্যই হচ্ছে মিথ্যা বলা।
০টি মন্তব্য ০টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

একজন বণিক, যিনি বদলে দিয়েছিলেন সমগ্র আরবের ইতিহাস

লিখেছেন সৈয়দ কুতুব, ০৮ ই জুন, ২০২৬ রাত ২:৪৩


মরুভূমির মাঝে দাঁড়িয়ে পুরো আরবকে বদলে দেওয়ার স্বপ্ন দেতেন একজন মানুষ। শুনতে পাগলামি লাগে, তাই না? কিন্তু সেই মানুষটা যদি ছোটবেলা থেকে কাফেলায় কাজ করে থাকেন, যদি তিনি জানেন... ...বাকিটুকু পড়ুন

কৃত্তিম বুদ্ধিমত্তা যেভাবে আব্বাসীদের জন্য হুমকি হয়ে আসছে- কী হবে খালেদ মহিউদ্দিনের?

লিখেছেন হিমন, ০৮ ই জুন, ২০২৬ রাত ২:৫০

হোমো ইরেক্টাসদের প্রায় বিশ লাখ বছর আগের আগুনের ব্যবহার থেকে শুরু করে ছয় হাজার বছর আগের চাকা আবিষ্কার, ১৮৩১ সালের বিদ্যুৎ, গত শতাব্দীর অ্যান্টিবায়োটিক, আর এই সেদিনের ইন্টারনেট ও স্মার্টফোন—... ...বাকিটুকু পড়ুন

আসলে কেউ ফেরে না।

লিখেছেন রানার ব্লগ, ০৮ ই জুন, ২০২৬ সকাল ৭:০৬

মৃতরা ফিরে আসে না।
ফিরে আসে তাদের ফেলে যাওয়া শূন্যতা,
চায়ের কাপের ধোঁয়া,
অধেক বলা কোনো কথা
অথবা হঠাৎ থেমে যাওয়া কোন সুর

যে প্রেম চলে গিয়েছিল,
সে আর কোনোদিন দরজায় কড়া নাড়ে না।
শুধু একদিন আয়নায়... ...বাকিটুকু পড়ুন

দ্য ড্রাগ কিং

লিখেছেন শাম্মী নূর-এ-আলম রাজু, ০৮ ই জুন, ২০২৬ দুপুর ১২:১৫


সতর্কবার্তা: এটি একটি সম্পূর্ণ কাল্পনিক ক্রাইম ফিকশন। বাস্তব একটি অপরাধের কাঠামোর ওপর ভিত্তি করে পাঠকদের জন্য এর চরিত্র, নাম এবং স্থান পরিবর্তন করে গল্পটি সাজানো হয়েছে।

খুলনা... ...বাকিটুকু পড়ুন

সামুতে আবারও লিলিপুটিয়ানদের সংখ্যা বেড়ে যাচ্ছে

লিখেছেন সত্যপথিক শাইয়্যান, ০৮ ই জুন, ২০২৬ দুপুর ১২:৫৮

আমার গত পোস্টে আলামিন১০৪ নামের এক ব্লগার মন্তব্য করেছেন যে - "এ আই দিয়ে হুমায়ূন আহমেদের মতো লেখা যায়।"
তিনি এ আই-কে প্রম্পট দিয়েছিলেন ' হুমায়ুন আহমেদের মতো গল্প লিখে... ...বাকিটুকু পড়ুন

×