তিনি আমাদের আরো জানান, টেস্ট টিউব বেবির প্রযুক্তি খুব বেশি দিনের পুরনো নয় । এ নিয়ে দীর্ঘ গবেষণা চললেও এই প্রযুক্তিতে প্রথম সাফল্য এসেছিলো গ্রেট বৃটেনে ১৯৭৮ সালের ২৫ই জুলাই মাসে। পৃথিবীর প্রথম টেষ্ট টিউব বেবির নাম হলো ''লুইস জয় ব্রাউন '' । কোনো নারীর ফেলোপিয়ান টিউবে কোনো প্রতিবন্ধকতা থাকলে তার পক্ষে মা হওয়া এককালে অসম্ভব ছিলো । কিন্তু লুইস জয় ব্রাউনের জন্মের মধ্য দিয়ে সে বাঁধা দূর হলো, ফেলোপিয়ান টিউবের সমস্যাকে চিকিৎসকরা আর গর্ভ ধারণের ক্ষেত্রে বাঁধা বলে সাধারণ ভাবে মনে করেন না । ফেলোপিয়ান টিউবের সমস্যায় যে সব নারী ভুগছেন, তাদের জন্য এটা নি:সন্দেহে সুখবর কিন্তু একই সাথে একটি প্রশ্ন দেখা দিতে পারে আর তা হলো ইন ভিন্টরো ফার্টিলাইজেশনের মাধ্যমে জন্ম নিল যে শিশু তার ভবিষ্যত কি হবে ? যদি সে শিশুটি মেয়ে হয় তবে সেকি সাধারণ ভাবে মা হওয়ার জন্য কি একই পদ্ধতির আশ্রয় নিতে হবে ? হ্যাঁ এমন এক প্রশ্নের জবাবে প্রফেসর শাহাবউদ্দিন আহমেদ আমাদের বলেছেন, এই আশংকা একদম অমূলক । কারণ পৃথিবীর প্রথম টেস্ট টিউব বেবির সন্তান কিন্তু স্বাভাবিক ভাবে জন্ম গ্রহণ করেছিলো । নারীর ডিম্বের সাথে পুরুষের শুক্রাণুর মিলনের সফল মিলনের মাধ্যমে গর্ভে সঞ্চার হয় । এ কথা কম-বেশি সবাই আমরা জানি। কিন্তু আমরা অনেকেই যা জানি না তা হলো যে ডিম্ব-শুক্রাণুর সফল মিলনের পরও সন্তান জন্ম লাভ নাও করতে পারে । প্রাকৃতিক নানা কারণে এ ক্ষেত্রে সফলতার হার মাত্র ৩১ শতাংশ । অর্থাৎ ১০০টি ফার্টিলাইজেশন বা ডিম্ব-শুক্রাণু মিলন ঘটলেও মাত্র ৩১টি সন্তান জন্ম নেয়। টেষ্ট টিউব বেবির সাফল্যর হার প্রায় অনুরুপ ।
তা হলে দেহের বাইরে যে ফার্টিলাইজেশন ঘটানো হয় সেখানে কি করা হয় ? এবারে এ প্রশ্নই স্বাভাবিক ভাবে দেখা দিতে পারে । এই প্রশ্নের জবাবে প্রফেসর শাহাবউদ্দিন আহমেদ চৌধুরী আমাদের বলেছিলেন, যে সব মা ডিম্ব উৎপাদন করতে পারছে না, প্রথমে তাদের ডিম্ব উৎপাদন করতে সাহায্য করে এমন ওষুধ অর্থাৎ কিছু হরমোন প্রয়োগ করা হয় । এ ভাবে মাতৃদেহে হরমোন প্রয়োগের মাধ্যমে যে ডিম্বটি তৈরি হলো তা স্বাভাবিক ভাবে ছেড়ে দেয়া হয় না । অর্থাৎ প্রাকৃতিক ভাবে গর্ভ ধারণের জন্য তাকে ছেড়ে দেয়া হয় না । বরং বিশেষ প্রক্রিয়ায় ডিম্বটি চিকিৎসকরা মাতৃদেহের বাইরে বের করে নিয়ে আসেন । এরপর তাকে ফার্টিলাইজ করার জন্য শুক্রাণুর সাথে মেশানো হয় । এভাবে ফার্টিলাইজ হয়ে যাওয়ার পর ডিম্বটি মায়ের জরায়ুতে আবার প্রতিস্থাপন করা হয় । তবে ডিম্বটি পুনরায় প্রতিস্থাপনের আগে মাকে নানা হরমোন দিয়ে তৈরি করে নেয়া হয়ে থাকে। প্রতিস্থাপনের পর সন্তান ঠিক ভাবে বৃদ্ধি পাচ্ছে কিনা তা নিয়মিত পরীক্ষা করে দেখা হয় । খুব সংক্ষেপে এই হল টেস্ট টিউব বেবির জন্মকথা । ১৯৭৮ সালে থেকে এই প্রযুক্তির বিজয় অভিযান শুরু হয় । এর মধ্যে অনেক সময় গড়িয়েছে । উন্নতি ঘটেছে এই প্রযুক্তির ক্ষেত্রেও । ড. শাহাবউদ্দিন আহমেদ চৌধুরী এই প্রযুক্তির উন্নয়নের কথা বলতে যেয়ে আমাদের জানান, নানা কারণে অনেক পুরুষ পর্যাপ্ত শুক্রাণু তৈরি করতে পারেন না । এ কারণে অনেকেই পিতা হওয়ার সৌভাগ্য থেকে বঞ্চিত হয়ে পড়েন । কিন্তু এবার তাদের সহায়তায় চিকিৎসা বিজ্ঞান এগিয়ে এসেছে । চিকিৎসকরা সরাসরি এ জাতীয় পুরুষদের শুক্রাণু সংগ্রহ করেন এবং পরে তা মাতৃদেহ থেকে বের করে আনা ডিম্বতে সরাসরি প্রবিষ্ট করিয়ে ফার্টিলাইজেশনে পর্বটি সাফল্যের সাথে সম্পন্ন করেন । এর পর এই ডিম্বটি পুনরায় মাতৃগর্ভে প্রতিস্থাপন করা হয় । আর এ ভাবে শুক্রাণু কম উৎপাদনকারী পুরুষরা পিতৃত্বের সুযোগটি পেয়ে যাচ্ছেন বলে তিনি আমাদের জানিয়েছেন ।
অন্য অনেক চিকিৎসা প্রযুক্তির মতো ইন ভিন্টরো ফার্টিলাইজেসন ব্যবস্থাকেও নানা অনৈতিক কাজে ব্যবহার করা সম্ভব বা চলছে । যা নৈতিকতা এবং ধর্ম বিরোধী বলে মেনে নেয়া যায় না বলে ড.শাহাবউদ্দিন আহমেদ চৌধুরী আমাদের জানান । মানব কল্যানধর্মী একটি প্রযু্ক্তির এই অপব্যবহার মেনে নেয়া যায় না বলেও তিনি জানান । অন্যদিকে তিনি বলেন, এ ভাবে সন্তান ধারণের ব্যবস্থা করতে যেয়ে সাধারণ ভাবে কিছু জটিলতা দেখা দিতে পারে । এর মধ্যে সবচেয়ে বড় যে সমস্যা দেখা দেয় তা হলো, অনেক সময় ইন ভিন্টরো ফার্টিলাইজেশনের ফলে একাধিক সন্তানের জন্ম নেয় । এ ছাড়া কোনো কোনো ক্ষেত্রে মায়ের জরায়ুতে ''সিস্ট'' হতে পারে। এ ছাড়া স্বাভাবিক গর্ভ ধারণের ক্ষেত্রে সাফল্য যেমন ৩১ শতাংশ । ইন ভিন্টরো ফার্টিলাইজেশনের ক্ষেত্রেও সফলতার হার তার কাছাকাছি অর্থাৎ ২৮ থেকে ৩০ শতাংশ বলে তিনি জানান ।
তবে সব মিলিয়ে এই প্রযুক্তি সন্তানহীন দম্পতির জন্য একটি আশার আলো হয়ে উঠেছে । অনেক পরিবারের ভাংগন রক্ষা করেছে । বহু নারী-পুরুষকে সন্তানের মুখ দেখার সৌভাগ্য এনে দিয়েছে । এবারে স্বাভাবিক ভাবেই একটা প্রশ্ন উঠতে পারে আর তা হলো এই চিকিৎসা-প্রযুক্তির যাত্রা অনেক আগে শুরু হলেও তা আজকের বাংলাদেশে ইন ভিন্টরো ফার্টিলাইজেশন করা হয় কিনা এবং এই প্রযুক্তির মাধ্যমে গর্ভধারণ করতে হলে খরচের পরিমাণটিই বা কি দাঁড়ায় ? আমাদের এই প্রশ্নের জবাবে বিশেষজ্ঞ এই চিকিৎসক বলেছিলেন, বাংলাদেশেও এই প্রযুক্তি নিয়ে সাফল্যের সাথে কাজ চলছে । এ বাবদ খরচের পরিমাণ তিন থেকে চার লক্ষ টাকা হতে পারে বলে তিনি আমাদের জানান ।#

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।

