somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

টেস্ট টিউব বেবি এবং বাংলাদেশ

২৭ শে সেপ্টেম্বর, ২০০৮ দুপুর ১:০৩
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :

টেস্ট টিউব বেবির কথা কি আপনি শুনেছেন ? হ্যাঁ এমন প্রশ্ন করা হলে আজকের দিনে অধিকাংশ মানুষই বলবেন, এটা একটা প্রশ্ন হলো? টেস্ট টিউব বেবির কথা শুনিনি এমন মানুষ আজকের দিনে কি খুঁজে পাওয়া যাবে ? সত্যি বিজ্ঞানের কল্যাণে যে সব শব্দের সাথে আমরা পরিচিত হয়ে উঠেছি তার একটি হলো, এই টেস্ট টিউব বেবি । একই সাথে আপনি হয়ত জানেন যে, বাংলাদেশেও চিকিৎসকরা টেষ্ট টিউব বেবি করতে পারছেন । আজ এই টেষ্ট টিউব বেবির ব্যাপারে আমরা এবার বিস্তারিত আলোচনা করব । টেষ্ট টিউব বেবি বলা হলেও চিকিৎসক বা চিকিৎসা বিজ্ঞানীরা কিন্তু একে ''ইন ভিন্টরো ফার্টিলাইজেশন বলে থাকেন'' সংক্ষেপে একে ''আই ভি এফ '' বলা হয় । ইন ভিন্টরো শব্দটি লাতিন থেকে নেয়া হয়েছে । মূল অর্থ হলো কাচের মধ্যে । আগেকার দিনে জীবিত কোনো প্রাণীর কোষকলা দেহের বাইরে উৎপাদন করার জন্য বিকার- টেস্ট টিউবের মতো কাচের তৈরি পাত্র ব্যবহার করা হতো । তবে আজকের দিনে ''ইন ভিন্টরো'' শব্দটি আরো ব্যাপক ভাবে প্রয়োগ করা হয়ে থাকে । দেহের বাইরে সম্পাদিত যে কোনো জৈব প্রক্রিয়াকেই ''ইন ভিন্টরো'' হিসেবে চিহ্নিত করা হয় । নানা কারণে অনেক দম্পতিই সন্তান ধারণ করতে পারেন না । যে সব নারী ''ফেলোপিয়ান টিউবে'' কোনো ধরণের সমস্যার কারণে সন্তান ধারণ করতে পারেন না তাদের চিকিৎসা করার জন্য অর্থাৎ তাদেরকে সন্তান ধারণে সক্ষম করে তোলার জন্য ইন ভিন্টরো ফার্টিলাইজেশনের শুরু হয়েছিলো । পরে দেখা গেলো শুধু ফেলোপিয়ান সংকট নয় আরো কিছু সংকটের সমাধান করার জন্য এই পদ্ধতি ব্যবহার করা যেতে পারে । আসরের পক্ষ থেকে আমরা এ ব্যাপারে কথা বলি ময়মনসিংহ মেডিক্যাল কলেজের চর্ম ও যৌন রোগ বিভাগের প্রধান, এসোসিয়েট প্রফেসর ডা. শাহাবউদ্দিন আহমেদ চৌধুরীর সাথে । ইন ভিন্টরো ফার্টিলাইজেশন শব্দটি ব্যাখা করতে যেয়ে এই বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক আমাদের এই কথাগুলো বলেন ।
তিনি আমাদের আরো জানান, টেস্ট টিউব বেবির প্রযুক্তি খুব বেশি দিনের পুরনো নয় । এ নিয়ে দীর্ঘ গবেষণা চললেও এই প্রযুক্তিতে প্রথম সাফল্য এসেছিলো গ্রেট বৃটেনে ১৯৭৮ সালের ২৫ই জুলাই মাসে। পৃথিবীর প্রথম টেষ্ট টিউব বেবির নাম হলো ''লুইস জয় ব্রাউন '' । কোনো নারীর ফেলোপিয়ান টিউবে কোনো প্রতিবন্ধকতা থাকলে তার পক্ষে মা হওয়া এককালে অসম্ভব ছিলো । কিন্তু লুইস জয় ব্রাউনের জন্মের মধ্য দিয়ে সে বাঁধা দূর হলো, ফেলোপিয়ান টিউবের সমস্যাকে চিকিৎসকরা আর গর্ভ ধারণের ক্ষেত্রে বাঁধা বলে সাধারণ ভাবে মনে করেন না । ফেলোপিয়ান টিউবের সমস্যায় যে সব নারী ভুগছেন, তাদের জন্য এটা নি:সন্দেহে সুখবর কিন্তু একই সাথে একটি প্রশ্ন দেখা দিতে পারে আর তা হলো ইন ভিন্টরো ফার্টিলাইজেশনের মাধ্যমে জন্ম নিল যে শিশু তার ভবিষ্যত কি হবে ? যদি সে শিশুটি মেয়ে হয় তবে সেকি সাধারণ ভাবে মা হওয়ার জন্য কি একই পদ্ধতির আশ্রয় নিতে হবে ? হ্যাঁ এমন এক প্রশ্নের জবাবে প্রফেসর শাহাবউদ্দিন আহমেদ আমাদের বলেছেন, এই আশংকা একদম অমূলক । কারণ পৃথিবীর প্রথম টেস্ট টিউব বেবির সন্তান কিন্তু স্বাভাবিক ভাবে জন্ম গ্রহণ করেছিলো । নারীর ডিম্বের সাথে পুরুষের শুক্রাণুর মিলনের সফল মিলনের মাধ্যমে গর্ভে সঞ্চার হয় । এ কথা কম-বেশি সবাই আমরা জানি। কিন্তু আমরা অনেকেই যা জানি না তা হলো যে ডিম্ব-শুক্রাণুর সফল মিলনের পরও সন্তান জন্ম লাভ নাও করতে পারে । প্রাকৃতিক নানা কারণে এ ক্ষেত্রে সফলতার হার মাত্র ৩১ শতাংশ । অর্থাৎ ১০০টি ফার্টিলাইজেশন বা ডিম্ব-শুক্রাণু মিলন ঘটলেও মাত্র ৩১টি সন্তান জন্ম নেয়। টেষ্ট টিউব বেবির সাফল্যর হার প্রায় অনুরুপ ।
তা হলে দেহের বাইরে যে ফার্টিলাইজেশন ঘটানো হয় সেখানে কি করা হয় ? এবারে এ প্রশ্নই স্বাভাবিক ভাবে দেখা দিতে পারে । এই প্রশ্নের জবাবে প্রফেসর শাহাবউদ্দিন আহমেদ চৌধুরী আমাদের বলেছিলেন, যে সব মা ডিম্ব উৎপাদন করতে পারছে না, প্রথমে তাদের ডিম্ব উৎপাদন করতে সাহায্য করে এমন ওষুধ অর্থাৎ কিছু হরমোন প্রয়োগ করা হয় । এ ভাবে মাতৃদেহে হরমোন প্রয়োগের মাধ্যমে যে ডিম্বটি তৈরি হলো তা স্বাভাবিক ভাবে ছেড়ে দেয়া হয় না । অর্থাৎ প্রাকৃতিক ভাবে গর্ভ ধারণের জন্য তাকে ছেড়ে দেয়া হয় না । বরং বিশেষ প্রক্রিয়ায় ডিম্বটি চিকিৎসকরা মাতৃদেহের বাইরে বের করে নিয়ে আসেন । এরপর তাকে ফার্টিলাইজ করার জন্য শুক্রাণুর সাথে মেশানো হয় । এভাবে ফার্টিলাইজ হয়ে যাওয়ার পর ডিম্বটি মায়ের জরায়ুতে আবার প্রতিস্থাপন করা হয় । তবে ডিম্বটি পুনরায় প্রতিস্থাপনের আগে মাকে নানা হরমোন দিয়ে তৈরি করে নেয়া হয়ে থাকে। প্রতিস্থাপনের পর সন্তান ঠিক ভাবে বৃদ্ধি পাচ্ছে কিনা তা নিয়মিত পরীক্ষা করে দেখা হয় । খুব সংক্ষেপে এই হল টেস্ট টিউব বেবির জন্মকথা । ১৯৭৮ সালে থেকে এই প্রযুক্তির বিজয় অভিযান শুরু হয় । এর মধ্যে অনেক সময় গড়িয়েছে । উন্নতি ঘটেছে এই প্রযুক্তির ক্ষেত্রেও । ড. শাহাবউদ্দিন আহমেদ চৌধুরী এই প্রযুক্তির উন্নয়নের কথা বলতে যেয়ে আমাদের জানান, নানা কারণে অনেক পুরুষ পর্যাপ্ত শুক্রাণু তৈরি করতে পারেন না । এ কারণে অনেকেই পিতা হওয়ার সৌভাগ্য থেকে বঞ্চিত হয়ে পড়েন । কিন্তু এবার তাদের সহায়তায় চিকিৎসা বিজ্ঞান এগিয়ে এসেছে । চিকিৎসকরা সরাসরি এ জাতীয় পুরুষদের শুক্রাণু সংগ্রহ করেন এবং পরে তা মাতৃদেহ থেকে বের করে আনা ডিম্বতে সরাসরি প্রবিষ্ট করিয়ে ফার্টিলাইজেশনে পর্বটি সাফল্যের সাথে সম্পন্ন করেন । এর পর এই ডিম্বটি পুনরায় মাতৃগর্ভে প্রতিস্থাপন করা হয় । আর এ ভাবে শুক্রাণু কম উৎপাদনকারী পুরুষরা পিতৃত্বের সুযোগটি পেয়ে যাচ্ছেন বলে তিনি আমাদের জানিয়েছেন ।
অন্য অনেক চিকিৎসা প্রযুক্তির মতো ইন ভিন্টরো ফার্টিলাইজেসন ব্যবস্থাকেও নানা অনৈতিক কাজে ব্যবহার করা সম্ভব বা চলছে । যা নৈতিকতা এবং ধর্ম বিরোধী বলে মেনে নেয়া যায় না বলে ড.শাহাবউদ্দিন আহমেদ চৌধুরী আমাদের জানান । মানব কল্যানধর্মী একটি প্রযু্ক্তির এই অপব্যবহার মেনে নেয়া যায় না বলেও তিনি জানান । অন্যদিকে তিনি বলেন, এ ভাবে সন্তান ধারণের ব্যবস্থা করতে যেয়ে সাধারণ ভাবে কিছু জটিলতা দেখা দিতে পারে । এর মধ্যে সবচেয়ে বড় যে সমস্যা দেখা দেয় তা হলো, অনেক সময় ইন ভিন্টরো ফার্টিলাইজেশনের ফলে একাধিক সন্তানের জন্ম নেয় । এ ছাড়া কোনো কোনো ক্ষেত্রে মায়ের জরায়ুতে ''সিস্ট'' হতে পারে। এ ছাড়া স্বাভাবিক গর্ভ ধারণের ক্ষেত্রে সাফল্য যেমন ৩১ শতাংশ । ইন ভিন্টরো ফার্টিলাইজেশনের ক্ষেত্রেও সফলতার হার তার কাছাকাছি অর্থাৎ ২৮ থেকে ৩০ শতাংশ বলে তিনি জানান ।
তবে সব মিলিয়ে এই প্রযুক্তি সন্তানহীন দম্পতির জন্য একটি আশার আলো হয়ে উঠেছে । অনেক পরিবারের ভাংগন রক্ষা করেছে । বহু নারী-পুরুষকে সন্তানের মুখ দেখার সৌভাগ্য এনে দিয়েছে । এবারে স্বাভাবিক ভাবেই একটা প্রশ্ন উঠতে পারে আর তা হলো এই চিকিৎসা-প্রযুক্তির যাত্রা অনেক আগে শুরু হলেও তা আজকের বাংলাদেশে ইন ভিন্টরো ফার্টিলাইজেশন করা হয় কিনা এবং এই প্রযুক্তির মাধ্যমে গর্ভধারণ করতে হলে খরচের পরিমাণটিই বা কি দাঁড়ায় ? আমাদের এই প্রশ্নের জবাবে বিশেষজ্ঞ এই চিকিৎসক বলেছিলেন, বাংলাদেশেও এই প্রযুক্তি নিয়ে সাফল্যের সাথে কাজ চলছে । এ বাবদ খরচের পরিমাণ তিন থেকে চার লক্ষ টাকা হতে পারে বলে তিনি আমাদের জানান ।#


সর্বশেষ এডিট : ২৭ শে সেপ্টেম্বর, ২০০৮ দুপুর ১:০৬
০টি মন্তব্য ০টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

একজন বণিক, যিনি বদলে দিয়েছিলেন সমগ্র আরবের ইতিহাস

লিখেছেন সৈয়দ কুতুব, ০৮ ই জুন, ২০২৬ রাত ২:৪৩


মরুভূমির মাঝে দাঁড়িয়ে পুরো আরবকে বদলে দেওয়ার স্বপ্ন দেতেন একজন মানুষ। শুনতে পাগলামি লাগে, তাই না? কিন্তু সেই মানুষটা যদি ছোটবেলা থেকে কাফেলায় কাজ করে থাকেন, যদি তিনি জানেন... ...বাকিটুকু পড়ুন

কৃত্তিম বুদ্ধিমত্তা যেভাবে আব্বাসীদের জন্য হুমকি হয়ে আসছে- কী হবে খালেদ মহিউদ্দিনের?

লিখেছেন হিমন, ০৮ ই জুন, ২০২৬ রাত ২:৫০

হোমো ইরেক্টাসদের প্রায় বিশ লাখ বছর আগের আগুনের ব্যবহার থেকে শুরু করে ছয় হাজার বছর আগের চাকা আবিষ্কার, ১৮৩১ সালের বিদ্যুৎ, গত শতাব্দীর অ্যান্টিবায়োটিক, আর এই সেদিনের ইন্টারনেট ও স্মার্টফোন—... ...বাকিটুকু পড়ুন

আসলে কেউ ফেরে না।

লিখেছেন রানার ব্লগ, ০৮ ই জুন, ২০২৬ সকাল ৭:০৬

মৃতরা ফিরে আসে না।
ফিরে আসে তাদের ফেলে যাওয়া শূন্যতা,
চায়ের কাপের ধোঁয়া,
অধেক বলা কোনো কথা
অথবা হঠাৎ থেমে যাওয়া কোন সুর

যে প্রেম চলে গিয়েছিল,
সে আর কোনোদিন দরজায় কড়া নাড়ে না।
শুধু একদিন আয়নায়... ...বাকিটুকু পড়ুন

দ্য ড্রাগ কিং

লিখেছেন শাম্মী নূর-এ-আলম রাজু, ০৮ ই জুন, ২০২৬ দুপুর ১২:১৫


সতর্কবার্তা: এটি একটি সম্পূর্ণ কাল্পনিক ক্রাইম ফিকশন। বাস্তব একটি অপরাধের কাঠামোর ওপর ভিত্তি করে পাঠকদের জন্য এর চরিত্র, নাম এবং স্থান পরিবর্তন করে গল্পটি সাজানো হয়েছে।

খুলনা... ...বাকিটুকু পড়ুন

সামুতে আবারও লিলিপুটিয়ানদের সংখ্যা বেড়ে যাচ্ছে

লিখেছেন সত্যপথিক শাইয়্যান, ০৮ ই জুন, ২০২৬ দুপুর ১২:৫৮

আমার গত পোস্টে আলামিন১০৪ নামের এক ব্লগার মন্তব্য করেছেন যে - "এ আই দিয়ে হুমায়ূন আহমেদের মতো লেখা যায়।"
তিনি এ আই-কে প্রম্পট দিয়েছিলেন ' হুমায়ুন আহমেদের মতো গল্প লিখে... ...বাকিটুকু পড়ুন

×