somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

পবিত্র কুরআন-১৩

০২ রা নভেম্বর, ২০০৮ দুপুর ১:৪৫
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :

কোরআনের আলো অনুষ্ঠানের আজকের পর্বে আমরা সূরা বাকারার ২৫ ও ২৬ নম্বর আয়াত নিয়ে আলোচনা করব। সূরা বাকারার ২৫ নম্বর আয়াতে বলা হয়েছে-"যারা বিশ্বাস করে এবং সৎ কাজ করে তাদের সুসংবাদ দাও যে তাদের জন্যই বেহেশত যার তলদেশে নদী প্রবাহিত। যখনই তাদের তা হতে ফল-মূল খেতে দেওয়া হবে, তখনই তারা বলবে আমাদের পূর্বে জীবিকা হিসাবে যা দেওয়া হতো এতো তাই-ই। তাদেরকে অনুরূপ ফলই দেয়া হবে এবং সেখানে তাদের জন্য পবিত্র সঙ্গিনী রয়েছে, তারা সেখানে স্থায়ী হবে।" আগের আয়াতে কাফেরদেরকে জাহান্নামের আগুনের ভয় দেখানোর পর, এ আয়াতে মুমিনদের প্রতিফল বর্ণনা করা হয়েছে। যাতে করে কাফের ও মুমিনদের পরিণতি যাচাইয়ের পর সত্য স্পষ্ট হয়ে ওঠে। অবশ্য ঈমান সৎ কাজ ছাড়া ফলপ্রসূ হবে না। শুধু ঈমান বা শুধু ভালো কাজ কোনটিই একক ভাবে মানুষের সৌভাগ্য নিশ্চিত করতে পারে না। ঈমান হচ্ছে গাছের মূল বা শিকড়ের মত আর ভালো কাজ হচ্ছে বৃক্ষের ফল স্বরুপ। গাছের সুমিষ্ট ও ভালো ফল, ঐ গাছের সুস্থ ও সবল মূলের প্রমাণ দেয়। আর সবল ও সুস্থ মূলের গাছই ভালো ফল দিতে পারে। অবিশ্বাসী বা কাফেররাও অনেক সময় ভালো কাজ করে, কিন্তু তাদের অন্তরে ঈমানের মজবুত ভিত না থাকায়, সে সব কাজ স্থায়ী হয় না। কেয়ামত বা শেষ বিচারের দিন মুমিন ব্যক্তিদের স্থান হবে বেহেশত। বেহেশতের বাগানগুলো চির সবুজ এবং ফলে-ফুলে ভরা। কেননা সজীবতার উৎস পানির নহর গাছগুলোর নীচ দিয়ে সবসময় বয়ে যাচ্ছে। বেহেশতের ফলগুলো দেখতে বাহ্যত: এ দুনিয়ার মতো যাতে বেহেশবাসীরা সেগুলো দেখেই চিনতে পারে। ফলগুলো যেন তাদের কাছে অদ্ভুত বা অপরিচিত মনে হয় না। তবে স্বাদ ও গন্ধের দিক থেকে সেগুলো অনেক ভিন্ন।
বেহেশতে কেউ জন্ম গ্রহণ করে না। তবে মানুষ যেহেতু সঙ্গী বিহীন থাকতে পারে না তাই বেহেশতবাসীদের জন্য সেখানে সঙ্গীনীর ব্যবস্থা রাখা হয়েছে। পুত-পবিত্রতা তাদের অন্যতম চারিত্রিক বৈশিষ্ট্য। যদিও পবিত্র কোরআনের অনেক আয়াতে বস্তুগত অনেক নেয়ামত, যেমন বাগান, প্রাসাদ, সঙ্গীনী প্রভৃতির কথা উল্লেখ করা হয়েছে। কিন্তু আবার অনেক আয়াতে এগুলোর সাথে বেহেশতে আধ্যাত্মিক নেয়ামতের কথাও বলা হয়েছে। যেমন সূরা তওবার ৭২ নম্বর আয়াতে বেহেশতের বস্তুগত বা বৈষয়িক নেয়ামতের কথা উল্লেখ করার পর বলা হয়েছে-"আল্লাহর সন্তুষ্টিই সর্বশ্রেষ্ঠ"। সূরা বায়্যেনার ৮ নম্বর আয়াতে বলা হয়েছে-"মহান আল্লাহ তাদের প্রতি সন্তুষ্ট এবং তারাও আল্লাহর প্রতি সন্তুষ্ট।" পবিত্র কোরানে বেহেশতী নেয়ামত ও ঐশ্বর্যের বর্ণনা দিতে গিয়ে বেহেশতবাসীদের স্থান ও আবাসস্থল সম্পর্কে বলা হয়েছে- ‘এটাই তাদের একমাত্র পুরস্কার নয়।' এ ছাড়াও পয়গম্বর, ওলি-আউলিয়া এবং মানব ইতিহাসের সবচেয়ে ভালো ও সৎ ব্যক্তিদের মাঝে অবস্থান তাদের আত্মিক প্রশান্তি বয়ে আনবে এবং এটা তাদের জন্য স্বর্গীয় উপহার। এ আয়াতের শিক্ষণীয় বিষয়গুলো হচ্ছে-
প্রথমত : সঠিক প্রশিক্ষণের জন্য হুমকি ও ভয়-ভীতি দেখানোর পাশাপাশি উৎসাহেরও প্রয়োজন আছে। কাফেরদেরকে জাহান্নামের ভয় দেখানোর পর এ আয়াতে মুমিনদেরকে বেহেশতের সুসংবাদ দেয়া হয়েছে।
দ্বিতীয়ত : ঈমানের বাহ্যিক রূপ হচ্ছে ভালো কাজ। এজন্য পবিত্র কোরানে এ দুটি অর্থাৎ ঈমান ও সৎ কাজ সব সময় এক সাথে এসেছে।
তৃতীয়ত : পবিত্র কোরআনের দৃষ্টিতে ভালো কাজ সেটাই যা আল্লাহর উদ্দেশ্যে করা হবে। সুতরাং সামাজিক সেবা বা সম্পূর্ণ নিজস্ব ইচ্ছায় ভালো কাজ করলে সেটা কোরআনের দৃষ্টিতে গ্রহণযোগ্য নয়। কেননা ঈমান আনার পর সৎ কাজ করলে সেটাই কেবল গ্রহণযোগ্য। এ দুনিয়ায় হালাল হারাম বাছতে গিয়ে মুমিন ব্যক্তিকে অনেক কিছু বর্জন করতে হয়। তবে বেহেশতে এ সব কিছু পুষিয়ে দেয়া হবে।
চতুর্থত : দুনিয়ার ঐশ্বর্য ও সুখ-সমৃদ্ধি ক্ষণিকের জন্যে এবং তা অস্থায়ী। কাজেই মানুষ তা হাতছাড়া করলে দু:খ পায় এবং উদ্বিগ্ন হয়ে পড়ে। কিন্তু আখেরাত বা পরকালের ঐশ্বর্য ও সুখ-সমৃদ্ধি চিরন্তন ও তা সব সময় স্থায়ী থাকবে। কাজেই তা হারাবার ভয় থাকবে না। আর এ জন্যেই এই আয়াতে বলা হয়েছে-‘বেহেশতবাসীরা সেখানে স্থায়ীভাবে বাস করবে।'
পঞ্চমত : উপযুক্ত সঙ্গীনী তাকেই বলা যায় যে সর্ব দিক থেকেই পবিত্র, বাহ্যিক কাজ-কর্ম ও অন্তরে যার কোন কলুষতা নেই।

সূরা বাকারার ২৬ নম্বর আয়াতে বলা হয়েছে-"নিশ্চয়ইই মহান আল্লাহ মশা কিংবা তারচেয়ে বড় উপমা দিতে সংকোচ বোধ করেন না। সুতরাং যারা বিশ্বাসী তারা জানে যে, এ সত্য উপমা তাদের প্রতিপালকের কাছ থেকে এসেছে এবং যারা অবিশ্বাস করে তারা বলে এই উপমাতে আল্লাহর অভিপ্রায় কি? এর দ্বারা তিনি অনেককেই বিভ্রান্ত করেন, আবার বহু লোককে সৎ পথে পরিচালিত করেন। কিন্তু অসৎ লোক ছাড়া তিনি কাউকে বিভ্রান্ত করেন না।"

ইসলামের বিরুদ্ধবাদী কাফেররা যখন পবিত্র কোরআনের অনুরুপ একটি গ্রন্থ রচনা করতে ব্যর্থ হলো, তখন তারা কোরআনের উপমাগুলোকে বাহানা হিসাবে ব্যবহার করতে লাগল। তারা বললো, এ সব উপমা থেকে মহান সৃষ্টিকর্তার স্থান অনেক উর্ধ্বে। সৃষ্টিকর্তা মশা, মাছি ও মাকড়সার মত তুচ্ছ উপমা দিতে পারেন না, এসব মানুষেরই কাজ। আসলে ইসলামে অবিশ্বাসী কাফেররা আল্লাহ বা সৃষ্টিকর্তাকেই বিশ্বাস করতো না। এ সব কথা বলার পেছনে তাদের উদ্দেশ্য ছিল কোরআন ও পয়গম্বরের উপর মুসলমানদের বিশ্বাসকে নড়বড়ে করে দেয়া এবং তাদের ঈমানকে দুর্বল করে দেয়া। তা ছাড়া পবিত্র কোরআনের সব উপমাই এ ধরণের নয়। যেমন এর আগে মুনাফিক বা কপট ব্যক্তিদেরকে অন্ধকারে আলোহীন বিপদ সংকুল পথে আটকে পড়া পথিকের সাথে তুলনা করা হয়েছে। আর উদাহরণ বা উপমা ব্যবহারের উদ্দেশ্য হচ্ছে বাস্তব অবস্থাকে সুস্পষ্ট করে তোলা। যখন কেউ দুর্বল প্রতিপক্ষের বর্ণনা দিতে চায়, তখন কোন দুর্বল বস্তু বা প্রাণীর উপমা দিয়ে তার বর্ণনা তুলে ধরে। যেমন পবিত্র কোরআনের সুরা হজ্জ্বের ৭৩ নম্বর আয়াতে বলা হয়েছে-"তোমরা আল্লাহর পরিবর্তে যাদের উপাসনা কর তারা তো কখনও একটি মাছিও সৃষ্টি করতে পারবে না, এমনকি এ উদ্দেশ্যে তারা সবাই একত্রিত হলেও। এবং মাছি যদি কিছু নিয়ে চলে যায় তাও তারা তার কাছ থেকে তা উদ্ধার করতে পারবে না।"
সূরা বাকারার ২৬ নম্বর আয়াতে বলা হয়েছে-"আল্লাহপাক মাছি বা তারচেয়ে ছোট প্রাণীকে উপমা হিসাবে ব্যবহার করতে সংকোচ বোধ করেন না। কেননা উপমাতো কেবল বাস্তব অবস্থাকে সুস্পষ্ট করে বোঝাবার জন্য। তাই মানুষের জন্য অধিক বোধগম্য বিষয়কেই উপমা হিসাবে ব্যবহার করা উচিৎ। উপমা বা উদাহরণের ক্ষেত্রে মশা বা বিশাল হাতির মধ্যে কোন পার্থক্য নেই। যেটা বিষয়বস্তুর সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ তাই ব্যবহার করা উচিৎ। অবশ্য পবিত্র কোরআনের উপমাগুলো সম্পর্কে দুই ধরণের দৃষ্টিভঙ্গী সম্পন্ন মানুষ দেখা যায়। এর মধ্যে যারা সত্য সন্ধানী এবং কোরআনের উপমাগুলোর নিগূঢ় তত্ত্ব উপলদ্ধি করতে সক্ষম তারা এ সব উপমা থেকে সত্যের সন্ধান লাভ করেন এবং বস্তুজগতের নিগূঢ় তত্ত্ব তাদের সামনে উদ্ভাসিত হয়। অপর দিকে যাদের অন্তর পবিত্র কোরআন ও ইসলামের মহান নবীর প্রতি হিংসা বিদ্বেষ ও শত্রুতায় পূর্ণ তারা পবিত্র কোরআনের অর্থ উপলদ্ধি করতে ব্যর্থ হয় এবং কোরআন ও পয়গম্বরের ব্যাপারে দোদুল্যমনার কারণে ঐশী পথ নির্দেশনা থেকে বঞ্চিত হয়ে পথভ্রষ্ট হয়ে পড়ে।
এ আয়াত দুটি থেকে কয়েকটি শিক্ষণীয় বিষয় হচ্ছে-কোন গুরুত্বপূর্ণ ও কঠিন বিষয় সব সময় সহজ ভাষায় বর্ণনা করা উচিৎ যাতে সাধারণ মানুষও ভালো করে বুঝতে পারে এবং মহান আল্লাহর ক্ষেত্রেও এ কাজ দোষণীয় নয়। পবিত্র কোরানে অত্যন্ত বাস্তব ভিত্তিক উপমা ব্যবহার করা হয়েছে। এ জন্য কখনো কোন প্রাণীকে, আবার কখনো প্রকৃতির কোন ঘটনা যেমন বৃষ্টি ও বজ্রপাতকে উপমা হিসাবে ব্যবহার করা হয়েছে। গুনাহ বা পাপ মানুষকে সত্য উপলদ্ধিতে বাধা সৃষ্টি করে এবং বিভ্রান্তি ও বিপথগামীতায় নিমজ্জিত করে। মহান আল্লাহর পক্ষ থেকে যা অবতীর্ণ হয়েছে সবই সত্য ও বাস্তব। সৎ পথ প্রাপ্তি বা বিপথগামীতা ঐ মহা সত্যের ব্যাপারে মানুষের প্রতিক্রিয়ার ফল।

১টি মন্তব্য ১টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

একজন বণিক, যিনি বদলে দিয়েছিলেন সমগ্র আরবের ইতিহাস

লিখেছেন সৈয়দ কুতুব, ০৮ ই জুন, ২০২৬ রাত ২:৪৩


মরুভূমির মাঝে দাঁড়িয়ে পুরো আরবকে বদলে দেওয়ার স্বপ্ন দেতেন একজন মানুষ। শুনতে পাগলামি লাগে, তাই না? কিন্তু সেই মানুষটা যদি ছোটবেলা থেকে কাফেলায় কাজ করে থাকেন, যদি তিনি জানেন... ...বাকিটুকু পড়ুন

কৃত্তিম বুদ্ধিমত্তা যেভাবে আব্বাসীদের জন্য হুমকি হয়ে আসছে- কী হবে খালেদ মহিউদ্দিনের?

লিখেছেন হিমন, ০৮ ই জুন, ২০২৬ রাত ২:৫০

হোমো ইরেক্টাসদের প্রায় বিশ লাখ বছর আগের আগুনের ব্যবহার থেকে শুরু করে ছয় হাজার বছর আগের চাকা আবিষ্কার, ১৮৩১ সালের বিদ্যুৎ, গত শতাব্দীর অ্যান্টিবায়োটিক, আর এই সেদিনের ইন্টারনেট ও স্মার্টফোন—... ...বাকিটুকু পড়ুন

আসলে কেউ ফেরে না।

লিখেছেন রানার ব্লগ, ০৮ ই জুন, ২০২৬ সকাল ৭:০৬

মৃতরা ফিরে আসে না।
ফিরে আসে তাদের ফেলে যাওয়া শূন্যতা,
চায়ের কাপের ধোঁয়া,
অধেক বলা কোনো কথা
অথবা হঠাৎ থেমে যাওয়া কোন সুর

যে প্রেম চলে গিয়েছিল,
সে আর কোনোদিন দরজায় কড়া নাড়ে না।
শুধু একদিন আয়নায়... ...বাকিটুকু পড়ুন

দ্য ড্রাগ কিং

লিখেছেন শাম্মী নূর-এ-আলম রাজু, ০৮ ই জুন, ২০২৬ দুপুর ১২:১৫


সতর্কবার্তা: এটি একটি সম্পূর্ণ কাল্পনিক ক্রাইম ফিকশন। বাস্তব একটি অপরাধের কাঠামোর ওপর ভিত্তি করে পাঠকদের জন্য এর চরিত্র, নাম এবং স্থান পরিবর্তন করে গল্পটি সাজানো হয়েছে।

খুলনা... ...বাকিটুকু পড়ুন

সামুতে আবারও লিলিপুটিয়ানদের সংখ্যা বেড়ে যাচ্ছে

লিখেছেন সত্যপথিক শাইয়্যান, ০৮ ই জুন, ২০২৬ দুপুর ১২:৫৮

আমার গত পোস্টে আলামিন১০৪ নামের এক ব্লগার মন্তব্য করেছেন যে - "এ আই দিয়ে হুমায়ূন আহমেদের মতো লেখা যায়।"
তিনি এ আই-কে প্রম্পট দিয়েছিলেন ' হুমায়ুন আহমেদের মতো গল্প লিখে... ...বাকিটুকু পড়ুন

×