একটি স্নিগ্ধ সন্ধ্যার গল্প
দ্বিতীয় পর্ব: অদৃশ্য দূরত্ব
বিকেলের শেষ আলোটা ধীরে ধীরে হাসপাতালের জানালার কাঁচ বেয়ে নেমে আসছিল। বাইরে কৃষ্ণচূড়ার লাল ফুলগুলো বাতাসে দুলছে, অথচ মনমিতার চোখে সেদিকে কোনো রঙ নেই। তার হাতে ধরা রিপোর্টের পাতাগুলো যেন হাজার মণ ওজনের।
ডাক্তার খুব শান্ত গলায় বলেছিলেন,
— "রোগটা ধরা পড়েছে। চিকিৎসা হবে, কিন্তু পথটা সহজ নয়।"
মনমিতা শুধু মাথা নাড়ল। কোনো প্রশ্ন করল না। মানুষের জীবনে এমন কিছু মুহূর্ত আসে, যখন শব্দগুলো অর্থ হারিয়ে ফেলে।
হাসপাতাল থেকে বেরিয়ে সে ফোনটা হাতে নিল। স্ক্রিনে প্রথমেই ভেসে উঠল অরিন্দমের নাম।
"আজ সন্ধ্যায় নদীর ধারে আসবে তো?"
মনমিতা দীর্ঘক্ষণ তাকিয়ে রইল। তারপর ছোট্ট করে লিখল—
"আজ পারব না। শরীরটা ভালো নেই।"
কয়েক সেকেন্ডের মধ্যেই উত্তর এল—
"তাহলে আমি তোমার বাসার সামনে দাঁড়িয়ে থাকব। শুধু পাঁচ মিনিট দেখা হবে।"
মনমিতার চোখ ভিজে উঠল।
সে জানে, এই মানুষটা অপেক্ষা করতে জানে। কিন্তু সে জানে না, যার জন্য অপেক্ষা করছে, সে হয়তো খুব বেশি দিন অপেক্ষার কারণ হয়ে থাকবে না।
অরিন্দম সেই সন্ধ্যায় সত্যিই এসেছিল।
হাতে কোনো ফুল ছিল না, কোনো দামি উপহারও নয়। শুধু কাগজে মোড়ানো ছোট্ট একটা বই।
— "তোমার জন্য।"
মনমিতা হেসে বলল,
— "এখনো বই উপহার দাও?"
অরিন্দমও হেসে উঠল।
— "ফুল শুকিয়ে যায়। বই মানুষকে বাঁচিয়ে রাখে।"
মনমিতা বইটা বুকে জড়িয়ে ধরল। কিন্তু বুকের ভেতর লুকিয়ে রাখা সত্যিটা আরও ভারী হয়ে উঠল।
পরদিন থেকে মনমিতা ইচ্ছে করেই দূরে সরে যেতে শুরু করল।
ফোন ধরত না।
মেসেজের উত্তর দিত ঘণ্টার পর ঘণ্টা পরে।
কখনো বলত, "ব্যস্ত আছি।"
কখনো বলত, "আজ কথা বলতে ইচ্ছে করছে না।"
অরিন্দম অবাক হয়ে গেল।
যে মেয়েটা প্রতিদিন সন্ধ্যায় তার সঙ্গে আকাশের রঙ বদলানো দেখত, সে হঠাৎ এত বদলে গেল কেন?
বন্ধু সৌরভ বলল,
— "হয়তো ও আর তোমাকে ভালোবাসে না।"
অরিন্দম মাথা নাড়ল।
— "না। মানুষের চোখ মিথ্যে বলতে পারে না। ওর চোখে এখনো আমার জন্য ভালোবাসা আছে। শুধু... কোনো বড় কষ্ট লুকিয়ে আছে।"
সেদিন গভীর রাতে মনমিতা ডায়েরি খুলল।
সে লিখল—
"যদি ভালোবাসা সত্যিই কাউকে মুক্তি দেওয়ার নাম হয়, তবে আমি আজ অরিন্দমকে মুক্তি দিচ্ছি। সে যেন এমন কাউকে পায়, যে তার সঙ্গে বুড়ো হতে পারবে। আমি তো হয়তো পারব না..."
কলমের কালি ঝাপসা হয়ে গেল।
কারণ কাগজের ওপর নীরবে পড়ছিল কয়েক ফোঁটা অশ্রু।
সেই রাতেই অরিন্দম একটি সিদ্ধান্ত নিল।
কারণ ছাড়া সে কখনো হাল ছাড়বে না।
সে খুঁজে বের করবে, মনমিতা কেন তাকে দূরে ঠেলে দিচ্ছে।
আর যদি পৃথিবীর সব মানুষ তার বিরুদ্ধে দাঁড়ায়, তবুও সে অন্তত একবার সত্যিটা শুনবে—মনমিতার মুখ থেকে।
চলবে...
সর্বশেষ এডিট : ০১ লা জুলাই, ২০২৬ বিকাল ৫:২২

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।



