somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

দল যার যার, বাজার সবার

০৮ ই অক্টোবর, ২০২৬ বিকাল ৪:৪৬
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :

দল যার যার, বাজার সবার
আপনি আওয়ামী লীগ করেন, বিএনপি করেন, জাতীয় পার্টি করেন কিংবা কোনো রাজনৈতিক দলের সঙ্গেই যুক্ত নন রাজনৈতিক মতাদর্শে আমাদের ভিন্নতা থাকতেই পারে। কারও রাজনৈতিক পছন্দ এক রকম, কারও আরেক রকম। কিন্তু বাজারের সামনে দাঁড়ালে সেই বিভাজনের কোনো মূল্য থাকে না। কারণ ক্ষুধা দল দেখে আসে না, সংসারের খরচ দল দেখে বাড়ে না, দ্রব্যমূল্যও রাজনৈতিক পরিচয় দেখে কাউকে ছাড় দেয় না।
যে বাজার থেকে আমি চাল, ডাল, তেল, সবজি কিংবা নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্য কিনি, সেই বাজার থেকেই অন্য দলের মানুষও কেনাকাটা করেন। একই দোকানে দাঁড়িয়ে আমরা সবাই একই দামে পণ্য কিনি। তাই বাজারের বাস্তবতা সম্পর্কে দেশের সাধারণ মানুষের চেয়ে ভালো অবগত আর কে হতে পারে?
আজ চালের দাম কত, ডালের দাম কত, তেলের দাম কত এসব জানতে কোনো রাজনৈতিক দলের প্রচারপত্র পড়তে হয় না। সংসারের বাজার করতে গেলেই মানুষ তার উত্তর পেয়ে যায়। মাসের আয় একই জায়গায় পড়ে আছে, অথচ ব্যয়ের তালিকা প্রতিদিন দীর্ঘ হচ্ছে। ফলে রাজনৈতিক মতের পার্থক্য থাকলেও জীবনযাপনের সংকট আমাদের ক্রমেই একই জায়গায় এনে দাঁড় করাচ্ছে।
আপনি যদি ভালো থাকেন, তার অর্থ এই নয় যে দেশের সবাই ভালো আছে। আমি যদি কোনোভাবে সংসার চালিয়ে নিতে পারি, তাতেও প্রমাণ হয় না যে আমার পাশের বাড়ির মানুষটি ভালো আছেন।
আমাদের চারপাশে তাকালেই তার প্রমাণ পাওয়া যায়। নিম্ন ও মধ্যবিত্ত পরিবারের ওপর নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের মূল্যবৃদ্ধির চাপ ক্রমেই বাড়ছে। খাদ্য, জ্বালানি, গ্যাস, বিদ্যুৎ ও অন্যান্য প্রয়োজনীয় ব্যয়ের সঙ্গে আয় যদি তাল মেলাতে না পারে, তাহলে মানুষের জীবন কেবল হিসাবের খাতায় নয় বাস্তব জীবনেও সংকুচিত হয়ে পড়ে।
সবচেয়ে ভয়ংকর বিষয় হলো, সংকট যখন দীর্ঘস্থায়ী হয় তখন মানুষ ধীরে ধীরে তার চাহিদা কমিয়ে দিতে বাধ্য হয়। একসময় যে পরিবার মাছ-মাংস কিনত, তারা হয়তো শুধু ডাল-সবজির ওপর নির্ভর করে। যে পরিবার নিয়মিত পুষ্টিকর খাবার কিনত, তারা প্রয়োজনের তালিকা ছোট করতে বাধ্য হয়। বাইরে থেকে হয়তো এটিকে বলা যায় ‘খরচ কমানো’; কিন্তু বাস্তবে এটি মানুষের জীবনযাত্রার মানের অবনতি।
এই পরিস্থিতিকে শুধু রাজনৈতিক বিতর্কের বিষয় বানিয়ে দেখলে চলবে না। এটি রাষ্ট্রের অর্থনীতি, মানুষের জীবন ও ভবিষ্যৎ প্রজন্মের সঙ্গে সম্পর্কিত একটি গুরুতর প্রশ্ন।
আজ আওয়ামী লীগের কর্মী যে বাজারে যান, বিএনপির কর্মীও সেই বাজারে যান। জাতীয় পার্টির সমর্থকও সেই বাজারে যান। রাজনীতির বাইরে থাকা সাধারণ মানুষও সেই বাজারেই যান। সুতরাং দল যার যার, কিন্তু বাজার সবার।
এ কারণেই দ্রব্যমূল্য নিয়ন্ত্রণের প্রশ্নে রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে মতপার্থক্য থাকলেও সাধারণ মানুষের স্বার্থে একটি জায়গায় ঐক্য প্রয়োজন। সরকারের কাছে জবাবদিহি দাবি করা, বাজার ব্যবস্থাপনায় স্বচ্ছতা চাওয়া, সিন্ডিকেট ও কারসাজির বিরুদ্ধে কার্যকর ব্যবস্থা দাবি করা এবং সাধারণ মানুষের ক্রয়ক্ষমতা রক্ষার জন্য নীতিগত পদক্ষেপের দাবি তোলা এসব কোনো একটি দলের একক দায়িত্ব নয়।
তবে প্রতিবাদের ভাষাও হতে হবে দায়িত্বশীল, শান্তিপূর্ণ ও জনস্বার্থভিত্তিক। কারণ বাজার নিয়ন্ত্রণের নামে এমন কোনো পরিস্থিতি তৈরি করা উচিত নয়, যাতে সাধারণ মানুষের দুর্ভোগ আরও বেড়ে যায়।
আমাদের মনে রাখতে হবে একটি দেশের অর্থনীতির সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সূচক শুধু বড় বড় প্রকল্প, শেয়ারবাজার কিংবা মোট দেশজ উৎপাদনের হিসাব নয়। একজন সাধারণ মানুষ মাসের শেষে তার পরিবারের খাবারের ব্যবস্থা করতে পারছেন কি না, সন্তানের পড়াশোনার খরচ দিতে পারছেন কি না, চিকিৎসার প্রয়োজন হলে তা বহন করতে পারছেন কি না সেটিও দেশের অর্থনৈতিক স্বাস্থ্যের গুরুত্বপূর্ণ মাপকাঠি।
আজ প্রশ্নটি তাই কেবল ‘আমি ভালো আছি কি না’ এটি নয়। প্রশ্ন হলো, আমার পাশের মানুষটি কেমন আছেন? আমার এলাকার দিনমজুর কেমন আছেন? নিম্নবিত্ত পরিবারটি কীভাবে সংসার চালাচ্ছে? একজন রিকশাচালক, শ্রমিক, ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী কিংবা মধ্যবিত্ত চাকরিজীবী মাসের শেষ দিনগুলো কীভাবে পার করছেন?
দেশের সামগ্রিক বাস্তবতা বিবেচনা করলে এই প্রশ্নগুলো এড়িয়ে যাওয়ার সুযোগ নেই।
দ্রব্যমূল্য নিয়ন্ত্রণ কোনো রাজনৈতিক স্লোগান নয়; এটি মানুষের বেঁচে থাকার প্রশ্ন। তাই দল-মত নির্বিশেষে সাধারণ মানুষের এখন সোচ্চার হওয়া প্রয়োজন। একই সঙ্গে সরকারেরও উচিত বাস্তব পরিস্থিতি স্বীকার করে কার্যকর ও দীর্ঘমেয়াদি পদক্ষেপ নেওয়া। শুধু সাময়িক অভিযান, বক্তৃতা কিংবা আশ্বাস দিয়ে বাজারের দীর্ঘস্থায়ী সমস্যা সমাধান করা সম্ভব নয়।
আমরা এমন একটি দেশ চাই যেখানে রাজনৈতিক মতের ভিন্নতা থাকবে, কিন্তু মানুষের মৌলিক অধিকার ও জীবনযাত্রার নিরাপত্তার প্রশ্নে সবাই কথা বলবে।
কারণ শেষ পর্যন্ত আমাদের পরিচয় আলাদা হতে পারে, কিন্তু আমাদের রান্নাঘর আলাদা নয়। আমাদের সন্তানদের প্রয়োজন আলাদা নয়। আমাদের বাজারের কষ্ট আলাদা নয়।
দল যার যার কিন্তু বাজার সবার।
রাজনীতি যার যার কিন্তু মানুষের বাঁচার অধিকার সবার।
আজ যদি আমরা মানুষের এই মৌলিক সংকটকে গুরুত্ব না দিই, তাহলে ভবিষ্যতে সংকট আরও গভীর হতে পারে। তাই এখনই প্রয়োজন বাস্তবতা স্বীকার করা, মানুষের কণ্ঠ শোনা এবং দ্রব্যমূল্য নিয়ন্ত্রণে কার্যকর পদক্ষেপ নিশ্চিত করা।
দেশ কোনো এক দলের নয়।
দেশ আমাদের সবার।
আর দেশের মানুষের কষ্টও আমাদের সবার কষ্ট।
সর্বশেষ এডিট : ০৮ ই অক্টোবর, ২০২৬ বিকাল ৪:৪৬
৩টি মন্তব্য ০টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

সব হারিয়েও বেঁচে থাকা: একজন রোকসানা রুমার নিঃসঙ্গ গল্প

লিখেছেন ওয়াদুদ সোহেল মোল্লা, ০৭ ই অক্টোবর, ২০২৬ সন্ধ্যা ৭:৫৬


জীবন আসলে বড় অদ্ভুত এক গোলকধাঁধা। আমরা ভাবি মেধা, ডিগ্রি আর সাফল্য দিয়ে পুরো জীবনটা সাজিয়ে ফেলা যাবে। কিন্তু ভাগ্যের নির্মম পরিহাস মানুষকে কোথায় এনে দাঁড় করায়, তা কেউ জানে... ...বাকিটুকু পড়ুন

মিটারে টাকা ভরতে গিয়ে এ কি হলো আমার সাথে। না পড়লে চরম মিস।

লিখেছেন নাহল তরকারি, ০৭ ই অক্টোবর, ২০২৬ রাত ১০:১২

বিদুৎ মিটার, দুই প্রকার। এক হচ্ছে প্রিপেইড আরেকটি পোস্ট পেইড। আমার কাছে পোস্ট পেইড ভালো লাগে। কারন এখানে বিলের কপি দিয়ে যায়। ও বিলের কপি নিয়ে ব্যাংকে গিয়ে জমা দিয়ে... ...বাকিটুকু পড়ুন

=নীলাম্বরী সেজে আছি=

লিখেছেন কাজী ফাতেমা ছবি, ০৭ ই অক্টোবর, ২০২৬ রাত ১১:৩৮



এই এসো না কাছে এসো,
নীল শাড়ীতে নীলাম্বরী
ঠায় দাঁড়িয়ে অপেক্ষাতে
এসে ভাসাও প্রেমের তরী।

নীল সমুদ্দুর ডেকেছে আজ
তাই দাঁড়িয়ে আছি একা
এসো তুমি হাওয়ায় উড়ে
এসে করো একটু দেখা।

হাঁটতে ইচ্ছে বালিচরে,
তুমি আমার - পাশে হাঁটবে?
মনের... ...বাকিটুকু পড়ুন

মূল্যস্ফীতি বাড়লে বা কমলে আমরা টের পাই না কেন ?

লিখেছেন সৈয়দ কুতুব, ০৭ ই অক্টোবর, ২০২৬ রাত ১১:৫১


গ্লোবাল ওয়ার্মিংয়ের কারণে বাংলাদেশে এখন কয়টা ঋতু আছে তা কেউ বলতে পারে না। আমার মনে হয় গ্রীষ্ম আর বর্ষার একটা মিশ্র ঋতু আছে, আর আছে শীত। এই গ্লোবাল ওয়ার্মিংয়ের... ...বাকিটুকু পড়ুন

মুহাম্মদ আলি জিন্না

লিখেছেন রাজীব নুর, ০৮ ই অক্টোবর, ২০২৬ সকাল ১১:৩৫



১৮৭৬ সালে করাচিতে এক দুষ্ট বালকের জন্ম হয়।
এবং ৭৬ বছর বয়সে দীর্ঘদিন যক্ষা রোগে ভূগে- দেশ ভাগের পরের বছর মারা যান। এই দুষ্ট বালক'ই পাকিস্তানের প্রতিষ্ঠাতা। নাম তার... ...বাকিটুকু পড়ুন

×