আধা মরুভূমি এই গ্রামের অধিবাসীরা অতটা সচ্ছল নয়। গ্রামবাসী, বিশেষত কৃষক শ্রেণীর লোকেরা ছাগল পালন করে। স্থানীয়ভাবে জন্মানো আর্গান গাছের ফল এসব ছাগলের বেজায় প্রিয়। আট-দশ ফুট উঁচু আর্গান গাছ এখানকার মাটিতে ভালো জন্মায়। গাছটির ফল পাকার সময় হলে প্রাণীগুলো পাগলপারা হয়ে ওঠে। দলে দলে গাছের কাছে ভিড় জমায়। অর্ধেক আঙুলের সমান লম্বা মোহনীয় ঘ্রাণের এসব ফলের টানেই নির্দ্বিধায় মগডালে চড়ে বসে ছাগলগুলো। একটার পর আরেকটা। একসঙ্গে ষোলটা ছাগল গাছের ডালে বানরের মতো ঘুরছে। সে এক দেখার মতো দৃশ্য বটে!
তাদের অনুসরণ করে হাজির হন কৃষকরা। তবে ছাগলের সার্কাস দেখতে নয়। ওই ফলের বাইরে নরম শাঁসের ভেতরে রয়েছে শক্ত বীজ। যা ছাগলের অখাদ্য। কৃষক তক্কে তক্কে থাকেন, কখন ছাগল ফল খেয়ে বীজ নিচে ফেলবে। ফেললেই ছুটে যান কৃষকরা। এমনকি ওই বীজের জন্য তাঁরা নির্দ্বিধায় ছাগলের মলও পরখ করেন। কুড়িয়ে পাওয়া মাত্রই বীজটা চালান করে দেন গলায় বাঁধা ঝুড়ির মধ্যে।
বাড়িতে আনার পর কৃষক-গিনি্নর কাজ শুরু। বীজগুলো ভালো করে পরিষ্কার করে দুটো ইটের ফাঁকে রেখে ভেঙে নেওয়ার পর পাওয়া যায় এক থেকে তিনটি দানা। আগুনে সেঁকে দানাগুলো আবার গুঁড়ো করা হয়। সঙ্গে মেশানো হয় অল্প পানি। এই মিশ্রণ হাতে পিষে বের করা হয় তেল। এক মাইল দূর থেকেও নাকি ওই তেলের সুগন্ধ পাওয়া যায়। পুরো প্রক্রিয়ায় যন্ত্রের কোন ভূমিকা নেই।
ওই তেলের রয়েছে দারুণ ঔষধি গুণ। স্থানীয়রা সকালের নাশতায় রুটি ও সালাদ তৈরিতে এই তেল ব্যবহার করে। বয়স কমানোর শক্তি আছে বিশ্বাস করে তেলটি মুখেও মাখে তারা। মরক্কোর বাজারে এটি বিলাসদ্রব্য হিসেবে বিক্রয় করা হয়। এক লিটার কিনতে গুনতে হবে পঞ্চাশ ডলার। ২০০১ সাল থেকে এটি ইউরোপ-আমেরিকার প্রসাধন কম্পানির নজরে পড়েছে। সেসব দেশের দোকানে এখন আর্গান তেল শোভা পায়। এতে রয়েছে পুষ্টিকর ফ্যাটি এসিড ও ভিটামিন ই। অতিরিক্ত প্রয়োজন মেটাতে অবশ্য চিরাচরিত পদ্ধতিতে অবলম্বন না করে তেলটি উৎপাদিত হয় কারখানায়। বিশ্বব্যাপী বিপুল চাহিদা দেখে মোনাকোর রাজপুত্র আলবার্ট এগিয়ে এসেছেন পৃষ্ঠপোষকতায়।
আর এই আর্গানের টানেই গাছে নিজে থেকেই গাছে ওঠা শিখেছে মরোক্কান ছাগলগুলো। ওরা উঠলেই তাদের পিছু নেয় চাষীরা। শক্ত ফল ভেঙে বীজ বের করার দায়িত্বটা যেন ছাগলের ঘাড়েই বর্তেছে। কিন্তু উৎপাদনের মাত্রাতিরিক্ত চাপে বিলুপ্ত হতে চলেছে এই আর্গান গাছ। তাই সময় থাকতে রুখে দাঁড়িয়েছে অঞ্চলের লোকজন। এগিয়ে এসেছে কিছু আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠানও। নতুন করে গাছ লাগানোর উৎসাহ যোগাচ্ছে ওরা। আর এখন বছরের একটি নির্দিষ্ট সময় ওই গাছের চৌহদ্দিতে ছাগলের প্রবেশ একেবারেই নিষিদ্ধ!
সর্বশেষ এডিট : ০১ লা এপ্রিল, ২০১১ সকাল ১১:১১

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।



