১।
“My grandfather once told me that there were two kinds of people: those who do the work and those who take the credit. He told me to try to be in the first group; there was much less competition.”
আমার অনেক গুলো শখের মাঝে একটি হল বিখ্যাত বিখ্যাত সব মানুষদের উক্তি এবং উদ্ধৃতি আগ্রহ নিয়ে পড়া।উদ্ধৃতি গুলো কখনো কখনো শিক্ষামূলক, কখনো উৎসাহব্যঞ্জক আবার কখনোবা শুধুই বুদ্ধিদীপ্ত মজার।
উপরের উদ্ধৃতিটি ইন্দিরা গান্ধি, ভারতের সাবেক প্রধানমন্ত্রির।
উদ্ধৃতিটির বাংলা ভাবানুবাদের আমি একটা প্রয়াস নিলাম।
"আমার দাদা আমায় একবার বলেছিলেন যে দুই ধরনের মানুষ আছে: যারা কাজ করবে এবং যারা কাজের বাহবা নিবে। প্রথম দলে অপেক্ষাকৃত কম প্রতিযোগিতা হয় বলে তিনি আমাকে সেখানে থাকার চেষ্টা করতে বলেছিলেন।" - ইন্দিরা গান্ধি
২।
মূলত উপরের এই উদ্ধৃতিটি পড়বার পর-ই আমার ইন্দিরা গান্ধির দাদা'র সম্পর্কে জানবার আগ্রহ জন্মে।তার সম্পর্কে আগে কখনো কোথাও পড়িনি।
ইন্দিরা গান্ধির বাবা ছিলেন জওহরলাল নেহেরু (এই তথ্যটি আমার আগেই জানা ছিল)। স্বাধীন ভারতের প্রথম প্রধানমন্ত্রি।
আর জওহরলাল নেহেরু'র বাবা অর্থাৎ ইন্দিরা গান্ধি'র দাদা হলেন মতিলাল নেহেরু (এই তথ্যটি আমার জানা ছিল না),ভারতের জাতীয়তাবাদ আন্দোলনে এক ডাকসাইটে নেতা ।তার আদিবাস ছিল ভারতের উত্তরখণ্ডের মাসুরি শহরে।ব্রিটিশ শাসনামলে ইংরেজ অফিসারদের প্রাতঃ ও বৈকালিক ভ্রমণের/ বিনোদন এর জন্য এই শহরে বড় একটি উদ্যান মত ছিল। উদ্যান এর বাইরে সাইনবোর্ড এ বড় করে লিখা ছিল "Indian's & Dogs not allowed” (কুকুর এবং ভারতীয়দের প্রবেশ নিষেধ)!! মতিলাল নেহেরু প্রতিদিন-ই ইচ্ছাকৃতভাবে, ব্রিটিশ আইনকে বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখিয়ে, শাস্তির কোনোরূপ তোয়াক্কা না করে উদ্যানে প্রবেশ করতেন এবং জরিমানা দিতেন। এটা ছিল তার এক ধরনের প্রতিকী প্রতিবাদ!
রাজনীতির এই রক্তই তো ইন্দিরা গান্ধির শরীরে প্রবাহিত! বলিষ্ঠ রাজনীতির এক আদর্শ উত্তরসূরি।ভারতের প্রথম নারী প্রধানমন্ত্রি। দুই দফায় মোট ৪বার প্রধানমন্ত্রির দফতর সামলেছেন। ১৯৬৬-৭৭ টানা ৩ বার এবং পরবর্তিতে ১৯৮০-৮৪।
অপ্রাসঙ্গিক ভাবে আরো একটি বিষয় এখানে বলে নেই।
ইন্দিরা গান্ধির বয়স তখন ১০। গ্রীষ্মের ছুটিতে বেড়াতে এলেন মাসুরি শহরে। কাজের ব্যস্ততায় জওহরলাল নেহেরু তখন এলাহাবাদে।শতেক ব্যস্ততার মাঝেও প্রতিদিন সময় করে বাবা জওহরলাল নেহেরু, কন্যা ইন্দিরা গান্ধি কে চিঠি লিখতেন। চিঠিতে উঠে আসত পরিবেশ ও প্রকৃতির কথা, সমসাময়িক সমাজ, রাষ্ট্র ও রাজনীতির কথা।আর এভাবেই ইন্দিরা গান্ধি সেই ছোট বয়সেই পেয়েছিলেন রাজনীতির পাঠ।
পরবর্তিতে ইন্দিরা গান্ধিকে লিখা জওহরলাল নেহেরুর এই চিঠিগুলো সংকলিত করে একটি বই ও বের হয়েছিল। বই এর নাম 'Letters From a Father to His Daughter'! সংগ্রহে রাখার মত একটি বই! নিউমার্কেটে বই এর দোকানগুলোতে খুঁজলেই পাওয়া যাবে।
৩।
বিজয়ের ৪০ তম বছরে, বিজয়ের মাস জুড়ে, 'দৈনিক প্রথম আলো' তাদের পত্রিকার প্রথম পাতার প্রথম কলামে 'বিদেশি সহযোদ্ধা' শিরোনামে নিয়মিত সংবাদ ছাপছে।ডিসেম্বরের ৬ তারিখে তারা বিদেশি সহযোদ্ধা ইন্দিরা গান্ধি-কে দু:সময়ের বন্ধু আখ্যা দিয়ে একটি সংবাদ করে। এই সংবাদ থেকে ইন্দিরা গান্ধি সম্পর্কে আরো বেশ কিছু তথ্য জানতে পারি ।
মুক্তিযুদ্ধকালীন ৪ এপ্রিল ১৯৭১, আওয়ামী লীগ এর দ্বিতীয় প্রধান নেতা তাজউদ্দিন আহমেদ, তৎকালীন ভারতীয় প্রধানমন্ত্রি ইন্দিরা গান্ধি'র সাথে তার সরকারি বাসভবনে দেখা করে বাংলাদেশের স্বধীনতা সংগ্রামে ভারতের সহযোগিতা চান।জবাবে ইন্দিরা গান্ধি বলেন "সহযোগিতা দিতে হলে তো আপনাদের সরকার গঠন করতে হবে"।তাজউদ্দিন জবাব দেন "আমরা সরকার গঠন করব"। এরপর তাজউদ্দিন আহমেদ ১০ এপ্রিল বঙ্গবন্ধুর নেতৃত্বে অস্থায়ী সরকার গঠনের ঘোষণা দেন এবং ১৭ এপ্রিল সৈয়দ নজরুল ইসলামকে অস্থায়ী রাষ্ট্রপতি এবং তাজউদ্দিন আহমেদ কে প্রধানমন্ত্রি করে আনুষ্ঠানিক শপথ গ্রহণ সম্পন্ন হয়। এদিকে দীর্ঘ ৯ মাস ইন্দিরা গান্ধির নেতৃত্বের ভারতীয় সরকার মুক্তিবাহিনীদের অর্থ, অস্ত্র ও প্রশিক্ষন দেয়।শক্তিশালী চীন ও আমেরিকা তখন পাকিস্তানের পক্ষে ছিল বলে, ইন্দিরা গান্ধির নেতৃত্বে ভারতীয় সরকার সরাসরি পাকিস্তানের সাথে যুদ্ধে না জড়িয়ে, বাংলাদেশে দখলদার বাহিনীর অত্যাচার-নির্যাতন ও শরনার্থী সমস্যার কথা বিশ্বসম্প্রদায় এর কাছে তুলে ধরেন।বাংলাদেশের পক্ষে বিশ্বজনমত গড়ে তুলতে ইউরোপ ও আমেরিকায় ঝটিকা সফর করেন।
২৭ মার্চ প্রথম ভারতের লোকসভা ও রাজ্যসভায় এক প্রস্তাবে অবিলম্বে পাকিস্তানি বাহিনীর গণহত্যা ও নির্যাতন বন্ধের আহ্বান জানানো হয়। এরপর বিভিন্ন রাজনৈতিক দল বাংলাদেশকে স্বীকৃতি দেওয়ার দাবি জানায়। কিন্তু ইন্দিরা গান্ধী ধীরে চলো নীতি ও কূটনৈতিক কৌশলের পক্ষপাতী ছিলেন। আগস্টে তিনি সোভিয়েত ইউনিয়নের সঙ্গে প্রতিরক্ষা সহযোগিতা চুক্তি সই করেন। ইন্দিরা গান্ধী শীত পর্যন্ত যুদ্ধ ঠেকিয়ে রাখতে চেয়েছিলেন। কেননা সে সময়ে চীনা বাহিনীর পক্ষে সীমান্তে অভিযান চালানো সম্ভব হবে না, বরফ পড়ে রাস্তা বন্ধ হয়ে যাবে।
যুক্তরাষ্ট্র সফরকালে ইন্দিরা গান্ধী মার্কিন প্রেসিডেন্ট রিচার্ড নিক্সনকে ঠাট্টা করে বলেছিলেন, ‘মি. প্রেসিডেন্ট, আমি ওয়াশিংটনের আবহাওয়া নিয়ে আলোচনা করতে আসিনি। এসেছি সাড়ে সাত কোটি মানুষের ন্যায়সংগত সংগ্রাম এবং এক কোটি শরণার্থীর দুঃখ-দুর্দশার কথা বলতে।’
অক্টোবর-নভেম্বর মাসজুড়ে ভারতীয় বাহিনীর সহযোগিতায় মুক্তিবাহিনী বিভিন্ন রণক্ষেত্রে পাকিস্তানি বাহিনীকে পরাস্ত করতে থাকে। আত্মরক্ষার শেষ চেষ্টা হিসেবে পাকিস্তান ৩ ডিসেম্বর ভারতের বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করে। ভারত তার পাল্টা জবাব দেয়।
১৬ ডিসেম্বর দখলদার বাহিনীর কমান্ডার জেনারেল নিয়াজি ঢাকার ঐতিহাসিক রেসকোর্স ময়দানে বাংলাদেশ ও ভারতের যৌথ বাহিনীর পূর্বাঞ্চলীয় কমান্ডের কাছে নিঃশর্ত আত্মসমর্পণ করেন।(প্রথম আলো'র অনলাইন ভার্সনে পুরো সংবাদটি পাওয়া যাবে।)
বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধে ইন্দিরা গান্ধির অবদান এর স্বীকৃতি এত বছর পরে এসে, ২০১১ সালে বাংলাদেশ সরকার দিয়েছে। তাকে ভূষিত করা হয়েছে মরণোত্তর সর্বোচ্চ রাষ্ট্রীয় সম্মানে।
8।
আচ্ছা অনেক কঠিন কঠিন জ্ঞানগর্ভ আলোচনা করে ফেললাম ।মূল বিষয়ে এখনো আসি-ই নি! রিলাক্স হবার জন্য এখন আমি গান শুনছি।ইয়াত্রি ব্যাণ্ড এর তপুর গান ।পুরোনো গান।লিরিকস টা শেয়ার করবার লোভ সামলাতে পারছি না। লিরিকস টা দিয়ে নেই। এরপর আবার মূল আলোচনায় আসব।
“তুমি চাও রোদ্দুর, আমি চাই আকাশ মেঘলা
খোঁজো পূর্ণিমা, বলি চাঁদ ডুবে যাক না
ছুঁটে চলো একা দূরে, আমার ইচ্ছে করে না
দুজনেই দুজনাকে চাই, তবুও নিজেদের আজ কেউ চাই না
মেলে না, আজ কিছু মেলে না
ভালবাসা বাচঁতে চাওয়া ছাড়া
এ দুটোই মিলে যায়, বসে একা ভাবি তাই
এই কি বেশি না, এই কি বেশি না
বল এই কি বেশি না, আজ এই কি বেশি না
ঘুমন্ত শহর, তুমি আমি জেগে একলা
আমি বলি প্রেম, তুমি বল বন্ধুত্ব এটা
গল্প চলে এগিয়ে, এইতো আছি বেশ
ভাবছিনা কেউ আজ, হলে হোক তা শেষ
মেলে না, আজ কিছু মেলে না
ভালবাসা বাচঁতে চাওয়া ছাড়া
এ দুটোই মিলে যায়, বসে একা ভাবি তাই
এই কি বেশি না, এই কি বেশি না
বল এই কি বেশি না, আজ এই কি বেশি না
আমি চাই রোদ্দুর, আমি চাই আকাশ মেঘলা
খুঁজি পূর্ণিমা, বলি চাঁদ ডুবে যাক না
ছুঁটে চলি বহু দূরে, আমার ইচ্ছে করে না
দুজনেই দুজনাকে চাই,তবুও নিজেদের আজ কেউ চাই না
মেলে না, আজ কিছু মেলে না
ভালবাসা বাচঁতে চাওয়া ছাড়া
এ দুটোই মিলে যায়, বসে একা ভাবি তাই
এই কি বেশি না, এই কি বেশি না
বল এই কি বেশি না, আজ এই কি বেশি না”
৫।
হা আবার মূল আলোচনায় আসি।গতকাল ফেসবুকে ঢুকবার পর দেখি আমার এক বন্ধু স্বাধীনতা যুদ্ধে পাকিস্তানিদের মূল আত্মসমর্পন দলিলের একটা কপি শেয়ার করেছে।পাকিস্তানের পক্ষে সই করেছিলেন লে.জেনারেল নিয়াজি এবং মিত্র বাহিনীর পক্ষে লে.জেনারেল জগজিৎ সিং অরোরা। আত্মসমর্পন দলিল ইংরেজিতেই লিখা হয়েছিল।এর ভাষ্য আমি হুবুহু তুলে দিচ্ছি। বাংলা ভাবানুবাদে আপাতত আর গেলাম না।
Instrument of Surrender
The PAKISTAN Eastern Command agree to surrender all PAKISTAN Armed Forces in BANGLA DESH to Lieutenant-General JAGJIT SINGH AURORA, General Officer Commanding in Chief of the Indian and BANGLA DESH forces in the Eastern Theatre. This surrender includes all PAKISTAN land, air and naval forces as also all para-military forces and civil armed forces. These forces will lay down their arms and surrender at the places where they are currently located to the nearest regular troops under the command of Lieutenant-General JAGJIT SINGH AURORA.
The PAKISTAN Eastern Command shall come under the orders of Lieutenant-General JAGJIT SINGH AURORA as soon as the instrument has been signed. Disobedience of orders will be regarded as a breach of the surrender terms and will be dealt with in accordance with the accepted laws and usages of war. The decision of Lieutenant-General JAGJIT SINGH AURORA will be final, should any doubt arise as to the meaning or interpretation of the surrender terms.
Lieutenant-General JAGJIT SINGH AURORA gives a solemn assurance that personnel who surrender shall be treated with dignity and respect that soldiers are entitled to in accordance with provisions of the GENEVA Convention and guarantees the safety and well-being of all PAKISTAN military and para-military forces who surrender. Protection will be provided to foreign nationals, ethnic minorities and personnel of WEST PAKISTAN origin by the forces under the command of Lieutenant- General JAGJIT SINGH AURORA."
৬।
যেই কৃষক একাত্তরের আগে কোনোদিন লাঙ্গল বাদে রাইফেল ছুঁয়ে দেখেনি, যেই মাঝি কোনোদিন বৈঠা বৈ মেশিনগান দেখেনি, যেই জেলে কোনোদিন তার জাল ভিন্ন গ্রেনেড ছুঁড়ে মারেনি, এই রকম শত শত সাধারন মানুষ, ছাত্র-শিক্ষক হাতে অস্ত্র তুলে নিয়েছিল।ইপিআর রুখে দাঁড়িয়েছল।পুলিশ বাহিনী রুখে দাঁড়িয়েছিল, বাঙালি সৈনিকেরা রুখে দাঁড়িয়েছিল। পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী তো ছিল-ই সাথে ছিল এদের দেশীয় দোসর রাজাকার-আলবদর-আলশামস। প্রতিনিয়ত তাদের সাথে যুদ্ধ করতে হয়েছে।ভারত আমাদের সমর্থন করেছে সত্য কিন্তু মূল যুদ্ধক্ষেত্রে ছিলাম আমরাই।পাকিস্তানিদের দীর্ঘ ৯ মাস ঠেকিয়ে রেখেছিলাম আমরাই। অধিকাংশ এলাকা শত্রু মুক্ত ও করে ফেলেছিলাম। ভারত তো সরাসরি যুদ্ধে অংশ নিল ডিসেম্বর এর ৩ তারিখ এর পর। অথচ আত্মসমর্পনের এই দলিলে আমার দেশের মাটির সেইসব বীরযোদ্ধা, সূর্যসন্তানদের মূল্যায়ন বুঝিবা সেই ভাবে হয়নি! তাদের কথাই আসেনি।
৭।
এবার চলে যাই আমার শুরুর দিকের উদ্ধৃতিতে-
“My grandfather once told me that there were two kinds of people: those who do the work and those who take the credit. He told me to try to be in the first group; there was much less competition.”- Indira Gandhi
মতিলাল নেহেরু , ইন্দিরা গান্ধি কে বলেছিলেন (ইন্দিরা গান্ধির ভাষ্যমতে)- কাজ করে যেতে কাজের বাহবার দিকে না তাকাতে।
ইন্দিরা গান্ধি তখন প্রধানমন্ত্রি। ৭১-এ লে.জেনারেল নিয়াজির নেতৃত্বে পাকিস্তান বাহিনির পরাজয় এবং আত্মসমর্পনের সম্পূর্ন এবং আনুষ্ঠানিক বাহবা নিয়ে নিল তার সরকার আর তার অধীনের ভারতীয় সেনাবাহিনি (অন্তত আত্মসমর্পনের লিখিত দলিল তাই বলে)।
ইয়াত্রি ব্যাণ্ড এর তপুর সেই গানের একটি লাইন এখন খুব বেশি মনে পড়ছে...
"মেলে না আজ কিছু মেলে না............"


অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।



