

আমরা একটু ব্যর্থতার দেখা পেলেই হতাশ হয়ে পড়ি। কিন্তু আমরা কি আসলেই কিছু করতে পারবো কি পারবো না সেই কথা ভেবে দেখেছি। আমাদের কি নেই? হাত, পা, মেধা, পারিপার্শ্বিক সহযোগিতা সব কিছুই আছে আমাদের। শুধু যে জিনিসটার অভাব সেটা হচ্ছে আমাদের ইচ্ছা শক্তি। শুধু ইচ্ছা শক্তির জোরে হাত-পা বিহীন একজন মানুষ পৃথিবী জয় করে ফেলেছেন। সেই মানুষটারই গল্প শোনাবো আজকে।
নিক ভুজিসিক। হাত-পা বিহীন একজন মানুষ। নিক ভুজিসিক এর পুরো নাম নিকোলাস জেমস ভুজিসিক। তিনি জন্মসূত্রে সার্বিয়ান অস্ট্রেলিয়ান। বাবা বেরিস ভুজিসিক ও মা ডুসকা ভুজিসিক এর ঘরে নিক এর জন্ম হয় ৪ ডিসেম্বর ১৯৮২ সালে। জন্মের পর সন্তানের হাত-পা বিহীন এরূপ আকৃতি দেখে নিক এর মা তাকে দেখতে ও কোলে নিতে অস্বীকার করেন। পরবর্তীতে অবশ্য স্বামী-স্ত্রী দুজনেই তাকে ঈশ্বরের ইচ্ছা হিসেবে বিবেচনা করে মেনে নেন। পৃথিবীতে এসেই এই মানুষটা নিজের পরিবার দ্বারা প্রথমেই নিজের সীমাবদ্ধতার জন্য উপেক্ষিত হয়েছিলেন।
বিরল টেট্রা-আমেলিয়া সিনড্রোম (Tetra-amelia syndrome) এর কারণে চার হাত-পায়ের অনুপস্থিতিতে তাঁর জন্ম হয়। নিকের এই শারীরিক প্রতিবন্ধিতার ব্যাখ্যা চিকিৎসা বিজ্ঞানের কাছে এখনো দিতে পারেনি। স্বাভাবিকভাবেই এতে শিশুকাল থেকেই তাঁকে মানসিক ও দৈহিকভাবে সংগ্রাম করতে হয়। মাত্র দুইটি আঙ্গুল থাকা সত্বেও উনি এতটা দ্রুত টাইপ করতে পারেন যা অনেক স্বাভাবিক মানুষও পারে না। মিনিটে উনি প্রায় ৪৭টি শব্দ টাইপ করতে পারেন। দাঁড়ানো, এমনকি বলে লাথিও দিতে পারেন তিনি। এছাড়া তার আছে অ্যাড্রেনাল হরমোন জনিত সমস্যা। এটা তিনি স্বীকার করেছেন কোন রকম সঙ্কোচ না করেই, তবে তিনি এতে কেয়ার করেন না। নিয়মিত সাঁতার এবং দুঃসাহসিক স্কাই ডাইভিংও করেন নিক।
জন্ম থেকেই তার কোনো হাত-পা নেই। শুধু উরুর কাছ থেকে ছোট্ট পায়ের মতো একটি অঙ্গ বেরিয়ে গেছে যা তার শরীরের ভারসাম্য বজায় রাখতে সাহায্য করে। ছোটবেলা থেকেই বাস্তব জীবনের নানা তিক্ত অভিজ্ঞতার মধ্যে দিয়ে তাকে যেতে হয়েছে। মেলবোর্ন শহরে বেড়ে ওঠা নিক বাল্যকাল থেকেই চরম বিষণ্ণতায় ভুগতেন। সবাই এমনকি স্কুলের সহপাঠীরা তাকে নিয়ে হাসাহাসি করতো। এই পরিস্থিতিতে মাত্র ১০ বছর বয়সে তিনি আত্মহত্যার চেষ্টা করেন। পরে ফিরে আসেন সে পথ থেকে। এটা তার জীবনে নিঃসন্দেহে সবচেয়ে বড় সিদ্ধান্ত ছিল।

উইকিপিডিয়ায় এটাই লেখা ছিল নিক ভুজিসিকের বায়ো
সকল প্রতিবন্ধকতা জয় করে এখন তিনি প্রেরণাদানকারী এক সম্মোহনী ক্ষমতাধর বক্তা। শরীরে অঙ্গের স্বল্পতা থাকলেও আছে অফুরন্ত প্রাণশক্তি। এই ক্যারিশমাটিক ব্যক্তি এখন সারা দুনিয়া ভ্রমণ করছেন আর প্রেরণাদায়ী বক্তৃতা দিয়ে হাজার হাজার মানুষকে অভিভূত করছেন, অনেককে দিচ্ছেন নতুন করে বেঁচে থাকার প্রেরণা, নতুন দৃষ্টিভঙ্গি। বিশাল বিশাল হলরুম ভর্তি মানুষ এখন তার কথা শোনার জন্য জড়ো হয়। যাওয়ার সময় সঞ্চয় হিসেবে নিয়ে যায় লড়াই করে বেঁচে থাকার প্রেরণা।
অথচ শুরুর দিকের গল্পটা একেবারেই অনুকূল ছিল না নিকের। মাধ্যমিক শেষ করার আগেই অনুপ্রেরণামূলক বক্তব্য দেয়া শুরু করেন নিক। ১৭ বছর বয়সে তার হাইস্কুলের এক দারোয়ান তাকে জনসমক্ষে বক্তৃতা করার জন্য উৎসাহিত করেন কিন্তু ৫৩ বার প্রত্যাখিত হওয়ার পর নিক যখন প্রথম মঞ্চে উঠলেন বক্তব্য দেয়ার জন্য তখন দর্শক সারি প্রায় পুরোটাই খালি হয়ে গিয়েছিলো। কিন্তু তাতেও হতাশ হননি তিনি। কণ্ঠ দিয়েই বিশ্ব জয় করেছেন। প্রায় ৫৭ টির মত দেশে হাজারেরও বেশি বক্তৃতা দিয়েছেন। তাঁর বক্তব্যে বয়সন্ধিকালিন সময়ের সমস্যা বারবার উঠে এসেছে। তিনি পাঁচ উপমহাদেশ ঘুরে প্রায় ত্রিশ লাখ মানুষের কাছে নিজের বক্তব্য পৌঁছে দেন। ধীরে ধীরে মানুষের কাছে উনি এতটাই জনপ্রিয় হয়ে উঠেন যে ঘন্টায় এক হাজার আটশত লোককে বুকে জড়িয়ে ধরার জন্য গিনেজ বুকেও তার নাম উঠেছে।
নিজের প্রতিবন্ধীতাকে জয় করে মাত্র ১৭ বছর বয়সে ব্রিসবেন, অস্ট্রেলিয়া, লস এঞ্জেলস, ক্যালির্ফোনিয়া সহ বিভিন্ন যায়গায় নিক “লাইফ উইদাউট লাইম্বস” নামের একটি অলাভজনক প্রতিষ্ঠান প্রতিষ্ঠা করেন। এবং তার “Attitude is Altitude” নামের একটি সংগঠনও রয়েছে যা প্রণোদনামূলক বক্তৃতা এবং দুর্বলদের ঠাট্টাবিদ্রুপ না করার জন্য প্রচারণা চালায়। ২০০৫ সালে নিজের দৈনন্দিন জীবনযাত্রার উপর ভিত্তি করে তিনি “Life's Greater Purpose” নামে একটি ডক্যুমেন্টারি বাজারে ছাড়েন। এছাড়াও যুব সমাজকে লক্ষ্য করে "No Arms, No Legs, No Worries!" নামের একটি ডিভিডি প্রকাশ করেন।
মানুষ সাধারণত একবার স্নাতক সম্পন্ন করতেই হিমশিম খেয়ে যায় সেখানে দুই আঙুল দিয়েই ফিন্যান্সিয়াল প্ল্যানিং ও অ্যাকাউন্টিং এর মত বিষয় নিয়ে মাত্র ২১ বছর বয়সে দুইবার স্নাতক সম্পন্ন করেছেন গ্রিফিথ বিশ্ববিদ্যালয় থেকে। পরবর্তীতে অনুপ্রেরণামূলুক বক্তব্য দিতে পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে ভ্রমণ করেন। নিক নিজের কাজ টিভি শো এবং নিজের লেখার মাধ্যমে জনসাধারণের কাছে পৌঁছে দেন। ২০১০ সালে তাঁর রচিত প্রথম বই "Life Without Limits: Inspiration for a Ridiculously Good Life" প্রকাশিত হয়। এটি প্রায় ৩০ টি ভাষায় অনুদিত হয়েছে। তাছাড়াও আন্তর্জাতিকভাবে বেস্ট সেলার খেতাব অর্জন করেছে। এটি ছাড়াও এখন পর্যন্ত উনি আরও পাঁচটি বই লিখেছেন। যেগুলোও প্রায় সমান জনপ্রিয়তা অর্জন করেছে।
নিকের আত্মজীবনীমূলক বই “Love Without Limits” ও প্রকাশিত হয়েছে।
নিজের প্রসঙ্গে নিক বলেন, টেট্রা-অ্যামেলিয়া সিনড্রোম ছাড়াও অ্যাড্রেনাল হরমোন জনিত সমস্যা কোনো সমস্যাকেই আমি পাত্তা দেয় না । দাঁড়ানো, টাইপ করা, বল খেলা, নিয়মিত সাঁতার এবং দুঃসাহসিক স্কাই ডাইভিং করে থাকি আমি।
তিনি বলেছেন, “আমি উঠে দাড়াবার জন্য শতবার চেষ্টা করবো, যদি এর শতগুনও ব্যর্থ হই তবুও ব্যার্থতা মেনে নিয়ে এটা ছেড়ে উঠবো না। আমি চেষ্টা করতেই থাকবো এবং বলবো, এটাই শেষ নয়”, এবং সত্যি সত্যিই তিনি যা বলেছেন তা করে দেখিয়েছেন।
দ্যা বাটারফ্লাই সার্কাস নামের একটি চলচ্চিত্রে "নিক ভুইয়টসিক" অভিনয় করেছেন। চলচ্চিত্রটি ২০০৯ সালে "Doorpost Film Project's" এ প্রথম পুরস্কার অর্জন করে। "দ্যা বাটারফ্লাই সার্কাস" চলচ্চিত্রটিতে "উইল" চরিত্রে অনবদ্য অভিনয় করার জন্য ২০১০ সালে "নিক ভুইয়টসিক" "Method Fest Independent Film Festival" এ সেরা অভিনেতা পদক লাভ করেন। ২০০৫ সালে যুব অস্ট্রেলিয়ান অব দ্যা ইয়ার পুরষ্কারের জন্য তিনি মনোনয়ন লাভ করেন।
২০১২ সালে নিক ভুজিসিক বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হন কানায়ে মিয়াহারার সাথে। অবাক করা বিষয় এই যে, এই বিয়ে ছিলো লাভ ম্যারেজ। মিয়াহারা কে একবার জিজ্ঞেস করা হয়েছিলো আপনার সন্তান যদি নিক এর মত হয় তাহলে আপনি কি করবেন? উত্তরে তিনি বলেছিলেন আমি তাকে আরেকজন নিক ভুজিসিক তৈরি করবো। দাম্পত্য জীবনে তাদের দুটি ছেলে সন্তান রয়েছে। ২০১৩ সালে প্রথম পুত্র কিয়োশি ও ২০১৫ সালে দ্বিতীয় পুত্র দিজান এর জন্ম হয়। বর্তমানে নিক যুক্তরাষ্ট্রের ক্যালিফোর্নিয়াতে স্ত্রী ও সন্তানদের নিয়ে সুখে বসবাসও করছেন। সহ্যক্ষমতা, উন্নত জীবন দর্শন, বোধবুদ্ধি অনেক দূর এগিয়ে নিয়ে গেছে তাকে। শত বাধা পেরিয়ে স্বাভাবিক জীবন সংসারের আনন্দ-বেদনার সঙ্গী হতে পেরেছেন আরেকজনের। তাদের ফুটফুটে ছোট্ট সন্তান দুটি যেন ঘরটিকে আরও আলোকিত করে দিয়েছে।
জীবন কখনো থেমে থাকে না। যত বাঁধাই আসুক জীবন সামনে এগিয়ে যাবেই। জীবনের লক্ষ্যই যে মৃত্যু। তবে নিজের একটু খানি কষ্ট করার ইচ্ছা, পরিশ্রম করার মানসিকতা, একাগ্রতা, পজিটিভ ধ্যান-ধারণাই পারে খুব সুন্দর ভাবে আমাদের জীবনকে সামনের দিকে এগিয়ে নিয়ে যেতে।
আসুন নিজের জীবনকে ভালোবাসি। নিজের জন্য অন্তত ভালো কিছু করার চেষ্টা করি। যতই বাঁধা আসুক, কষ্ট করে নিজেদের প্রতিষ্ঠিত করি সকলের মাঝে।




ছবি ও সূত্রঃ ইন্টারনেট
©রায়হানুল ফেরদৌস রাজ
ঝিনাই-কুঁড়ির পাড়
পঞ্চগড়।
সর্বশেষ এডিট : ০৬ ই সেপ্টেম্বর, ২০১৭ রাত ১২:২১

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।



