
বাংলাদেশে আমেরিকান দূতাবাসের এক বৈঠকের ফাঁস হওয়া অডিও রেকর্ডিং থেকে জানা যায়, আমেরিকা বাংলাদেশে একসময়ের নিষিদ্ধ জামাতের সঙ্গে বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক গড়তে আগ্রহী। সেখানে উল্লেখ আছে, সামনের নির্বাচনে জামাত ইতিহাসের সবচেয়ে ভালো ফল করতে পারে।
এই প্রশ্নটা দিয়েই শুরু করা যায় - বাংলাদেশে আমেরিকান কূটনীতিকদের প্রধান কাজটা কী?
এই প্রশ্নের উত্তরে আপনি হয়তো বড় বড় সব কথা নিয়ে আসবেন। যুক্তরাষ্ট্রের কূটনৈতিক স্বার্থ রক্ষা, ভূরাজনীতি, ইন্দো-প্যাসিফিক কৌশলের সঙ্গে বাংলাদেশকে যুক্ত রাখা, রাজনৈতিক স্বার্থ দেখা ইত্যাদি। এই উত্তরগুলো পুরোপুরি ভুল নয়। কিন্তু এগুলোর মধ্যে আসল কাজটির কথাই বাদ পড়ে গেছে।
খুব সম্ভব, কৌশলগত বড় সিদ্ধান্তগুলো বাংলাদেশে বসে নেওয়া হয় না। সেগুলো ওয়াশিংটন বা আঞ্চলিক সদর দপ্তরের বিষয়। বাংলাদেশে যে ডিপ্লোম্যাটরা বসে আছেন, তাদের বাস্তব দায়িত্ব একটাই - বাংলাদেশে কার্যরত মার্কিন কোম্পানিগুলোর বিনিয়োগ সুরক্ষা করা। সোজা ভাষায় বললে, মাস শেষে মার্কিন কোম্পানিগুলো যে ইনভয়েস বা চালানগুলো দেয়, গ্রাহকরা সেটা ঠিকমতো পরিশোধ করছে কি না, সেটা দেখা তাদের কাজ। বাংলাদেশে মার্কিন কোম্পানিগুলোর সবচেয়ে বড় গ্রাহক বাংলাদেশে সরকার নিজেই। আর এই পাওনা পরিশোধ হয় ডলারে। ফলে প্রথমেই আসে বৈদেশিক মুদ্রার প্রশ্ন। এখন ভেবে দেখুন কেন এই কূটনীতিক প্রথমেই রেমিট্যান্সের প্রসঙ্গটা তুললেন।
এরপর পরের প্রশ্ন: কোন রাজনৈতিক শক্তি সরকারে এলে দেনা-পাওনা নির্বিঘ্ন হয়? দুর্নীতির প্রশ্ন এখানে পুরোপুরি তাদের স্বার্থ কেন্দ্রিক, আমাদের নয়। বিএনপি ক্ষমতায় এলে তারা কি সময়মতো ডলারে বিল পরিশোধ করতে পারবে? কার সঙ্গে লেনদেনে সুবিধা হবে? যদি কোনো সরকার দুর্নীতিগ্রস্ত হয়, কিন্তু পাওনা ঠিকঠাক দেয়, তাহলে ছাতা ধরা হবে সেদিকেই। গণতন্ত্র, শরিয়া, মানবাধিকার এসব কাজের কথার ফাকে ফাকে একটু সুন্দর প্রসঙ্গ মাত্র।
আপনি যদি কখনো কারও কাছে নিজের পাওনা টাকা চাইতে যান, তাহলে আগে খোঁজ নেন, পাওনাদারের সব খবব ভালো কি না। পরিবার, সন্তানেরা কেমন আছে - এটা দিয়েই কথাবার্তা শুরু হয়। এখানেও তেমনই। পার্থক্য শুধু এক জায়গায়: টাকা না পেলে আপনি হয়তো ভদ্র মানুষ হিসেবে চুপ করে যান, কিন্তু তাদের ক্ষেত্রে সেই সম্ভাবনা খুব ক্ষীণ।
তাদের এই চরিত্রটা নতুন নয়। মার্কিন নীতির এটা ঐতিহাসিক বৈশিষ্ট্য। এর বীজ রয়েছে আমেরিকার ফাউন্ডিং ফাদারদের চিন্তার মধ্যেই। জেমস ম্যাডিসনের সেই বিখ্যাত ধারণা এখানে মনে রাখা দরকার: "সরকারের প্রধান দায়িত্ব হলো সম্পদশালী সংখ্যালঘুকে সংখ্যাগরিষ্ঠ জনগণের হাত থেকে রক্ষা করা।" এই দর্শন শুধু পররাষ্ট্র নীতিতে নয়, পুরো আমেরিকান রাষ্ট্রব্যবস্থার ভেতরেই প্রোথিত। শুরু থেকেই যুক্তরাষ্ট্রের গণতন্ত্র ছিল সীমাবদ্ধ গণতন্ত্র, যেখানে জনগণের অংশগ্রহণ এমনভাবে নিয়ন্ত্রিত, যাতে তা কখনো ধনী বা কর্পোরেট শ্রেণির স্বার্থের জন্য হুমকি হয়ে না দাঁড়ায়। এই তত্ত্বই পরে আন্তর্জাতিক পরিসরে সম্প্রসারিত হয়ে বাংলাদেশের মতো দেশে হাজির হয়েছে।
কিন্তু এই ভয়ঙ্কর লোভ ও স্বার্থসিদ্ধির বিষয়টা আমাদের মাথায়ই আসে না। আমরা গরিব বলেই আসেনা। গরিবেরা সচরাচর অমানবিক হয়না। মার্কিন ডিপ্লোম্যাটদের প্রধান কাজ যে আসলে নিজেদের দেশের কোম্পানিগুলোর পাওনা আদায় নিশ্চিত করা, এই কথাটা আমরা ভাবতেই পারি না।
সর্বশেষ এডিট : ২৩ শে জানুয়ারি, ২০২৬ রাত ১১:০৫

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।




