
ইতিহাস কি শুধু তাদেরকেই মনে রাখে যারা মহান সব কীর্তির মাধ্যমে নিজেদের অমর করে রেখে গেছেন? নাকি শুধু তারাই মহাকালের পথে নিজেদের চিহ্ন রেখে গেছেন যাদের হৃদয় ছিলো আলো দিয়ে ভরা? আমরা স্বীকার করতে না চাইলেও এটাই সত্যি যে ইতিহাসের আলোকিত দিকের পাশাপাশি রয়েছে একটি অন্ধকারাচ্ছন্ন ছায়াও। নিজেদের “কুকীর্তির” মাধ্যমে স্মরণীয় হয়ে আছেন এমন মানুষের সংখ্যাও পৃথিবীতে কম নয়। এমনকি কেউ আছেন যাদের কুখ্যাতিই তাদের করে রেখেছে কিংবদন্তি। পুতিন দাবি করতেন, তার কাছে রোগ সারানোর ক্ষমতা রয়েছে এবং তিনি ভবিষ্যদ্বাণীও করতে পারেন।
রাসপুতিন একজন রুশ সন্ন্যাসী এবং জার ২য় নিকোলাস এর দরবারের একজন প্রভাবশালী ব্যক্তিত্ব। অনেকে তাকে চরিত্রহীন লম্পট এবং সে সময়ের রুশ রাজনীতিতে নানা ধরণের দুষ্কর্মের হোতা বলে মনে করেন। রাসপুটিনের জন্ম হয় তুরা নদীর তীরে সাইবেরিয়ার ছোট্ট একটি গ্রামে । রাসপুতিনের বাবা ঘোড়ার ব্যবসা করতেন। একবার তার কয়েকটা ঘোড়া চুরি হল- বালক রাসপুতিন নাকি ঘোড়া চোরের নাম বলে দিয়েছিল। গ্রামে লোক বলাবলি করল ছেলে তো খ্রিস্টের আর্শীবাদ পেয়েছে। ১৮ বছর বয়সে রাসপুটিনের মধ্যে ধর্মীয় পরিবর্তন আসে। তখন তিনি তিন মাস কাটান ভার্কোটারি মনাস্ট্রিতে। এরপর তিনি যখন নিজ শহরে ফিরে আসেন, তখন তিনি এক পরিবর্তিত মানুষ।
১৮৮৯ সালে রাসপুতিন বিয়ে করে। কনের নাম প্রাসকোভিয়া ফিয়োদরোনভা। তিনটি বাচ্চা হল এদের- দিমিত্রি, মারিয়া ও ভারভারা। কিন্তু সংসারে মন বসল না। ঘুরে ঘুরে বেড়াতে লাগল । অন্য এক নারীর সংসর্গে তার আরও একটি সন্তান ছিল। প্রথম বিশ্বযুদ্ধের সময় জার্মানির প্রতি সহানুভূতিশীল থাকায় রাজদরবারের লোকের হাতে তিনি গুপ্তহত্যার শিকার হন। তার জন্ম ১৮৬৯ সালের ২২ জানুয়ারি। রাসপুতিনের বড় এক ভাই ও ছোট এক বোন ছিল। মৃগী রোগে আক্রান্ত বোনটি নদীতে ডুবে মারা যায়। আরেকবার বড় ভাইও পুকুরে ডুবে যায়। পরে তিনি নিউমোনিয়ায় মারা যান। এ দুটি ঘটনা রাসপুতিনের জীবনে প্রবল প্রভাব বিস্তার করে।
১৯১৬ সালে রাশিয়ার এই প্রভাবশালীসন্যাসীকে বরফের নিচে পানিতে মৃতঅবস্থায় উদ্ধার করা হয় । যদিও পানিতে ডুবে তার মৃত্যুকে একটি নিছক দুর্ঘটনা বলে অপপ্রচার করা হয় কিন্তু তার মৃত্যু যে একটি পরিকল্পিত হত্যা সেটি পরবর্তিতে সন্দেহাতীতভাবে প্রমানিত হয়। রাসপুতিন এর দেহ নদীতে জমাট বরফ কেটে গর্ত করে পানিতে নামানোর আগে তার শরীরে বিষ প্রয়োগ করা হয়, এরপর তাকে পুরুষত্বহীন অর্থাৎ খাসি করানো হয় । তাছাড়া তার মাথায়, ফুসফুস ও কলিজাতেও আঘাতের চিহ্ন পাওয়া যায়।
বিংশ শতাব্দীর ডাক্তারদের ধারণা, রাসপুটিন হিপনোটাইজিং জানতো। উছ্বংখল জীবন-যাপন পদ্ধতি, অতিরিক্ত মাত্রায় এলকোহল সেবন, নারীদের প্রতি অশালীন আচরন প্রভৃতি কারণে রাসপুটিনের প্রচুর শত্রু তৈরী হয়। রাসপুটিনকে ১৯১৬ সালের ১৬ই ডিসেম্বর (গ্রেগরিয়ান ক্যালেন্ডার অনুযায়ী ২৯শে ডিসেম্বর) সেন্ট পিটার্সবার্গে তার বাড়িতে নিমন্ত্রণ জানায়। সেখানে প্রথমে রাসপুটিনকে সায়ানাইড মিশ্রিত মদ আর কেক খাওয়ানো হয়, কিন্তু রাসপুটিন মারা যায়নি। এরপর ফেলিক্স রাসপুটিনের বুকে গুলি করেন, এমনকি আরেকজন ষড়যন্ত্রকারী আরো দুইবার গুলি করে, কিন্তু তখনো রাসপুটিন মারা যায়নি। আহত রাসপুটিনকে পরে পেট্রোভস্কি দ্বীপের ব্রিজ থেকে নেভা নদীতে ফেলা দেওয়া হয়। কিছুদিন পর তার লাশ পাওয়া যায়।
মৃত্যুর পূর্বে রাসপুটিন জার নিকোলাসের কাছে এক অদ্ভুত ভবিষ্যতবানী করে যানঃ “যদি আমি সাধারণ জনগনের হাতে মারা যাই, তুমি, রাশিয়ার জার, তোমার সন্তানদের জন্য কোনো চিন্তা করো না, তারা আরো শত শত বছর রাশিয়া শাসন করবে।……আর যদি আমার মৃত্যুর কারণ হয় তোমার আত্মীয়দের মধ্যে কেউ, তাহলে শুনে রাখো, তোমার পরিবারের সবাই আগামী দুই বছরের মধ্যে খুন হবে, খুন হবে রাশিয়ার জনগনের হাতে………”
রোমানভ পরিবারের সদস্যের হাতে রাসপুটিনের খুন হওয়ার তিন মাস পর ১৯১৭ সালের মার্চ মাসে নিকোলাস দ্বিতীয় ক্ষমতা ছাড়তে বাধ্য হোন, এবং দুই বছরেরও কম সময়ের মধ্যে নিকোলাসের পরিবারের সবাই নিহত হোন, রাশিয়ার জনগনের নেতাদের হাতে!
সব রাশিয়ান বিশ্বাস করে না যে, রাসপুটিন ও জারিনা প্রেমিক-প্রেমিকা ছিলেন এবং তারা জার্মানদের সাথে আলাদা শান্তি প্রতিষ্ঠা করতে চেয়েছিলেন। উল্লেখ্য, প্রথম বিশ্বযুদ্ধের সময় রাশিয়া ও জার্মানি ছিল পরস্পরের শত্রু।
সর্বশেষ এডিট : ০৬ ই জানুয়ারি, ২০১৫ দুপুর ২:০২

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।


