
আমাদের বাসায় ঘরের কাজের জন্য একজন মহিলা আছেন- তার নাম শাহানা। তাকে দেখলে ঠিক কাজের বুয়া মনে হয় না। বরং কথায় এবং কাজে বেশ এক্সপার্ট। চলা-ফেরায় একটা উচ্চ বংশীয় ব্যাপার আছে। প্রায় চার বছর ধরে আমাদের বাসায় কাজ করছে। শাহানা'র হাতের রান্না অতি চমৎকার। তার ব্যাক্তিত্বের কারনে মহিলাটাকে আমি মায়ের মতোই সম্মান করি। আমাকেও সে খুব ভালো পায়।
শাহনা'র দু'টো ছেলে-মেয়ে আছে। দেখতে ভারি মিষ্টি। আমাদের বাসায় কোনো অনুষ্ঠান হলে- ছেলে মেয়ে দুটো প্রায়'ই আসে। বড় মেয়ে এবার ইন্টারমিডিয়েট পাশ করলো। ছোট ছেলে আগামী বছর ইন্টারমিডিয়েট পরীক্ষা দিবে। দুজনেই লেখা পড়ায় খুব ভালো। শাহনা আমাদের বাসায় কাজ করে ৫ হাজার টাকা বেতন পায়। তার গ্রামের বাড়ি বিক্রমপুর-মুন্সিগঞ্জ। আমাদের গ্রামের বাড়িও মুন্সিগঞ্জ।
শাহনা'র স্বামী আজ চার বছর ধরে নিখোঁজ। কথা নেই, বার্তা নেই- হুট করে লোকটা নিখোঁজ হয়ে গেল। যে লোক সংসার ছাড়া কিছু বুঝতো না। ছেলে-মেয়েদের একবেলা না দেখলে অস্থির হয়ে যেত, সেই লোক আজ চার বছর ধরে কোনো খোজ খবর নেই। তাকে খোজার জন্য সব রকম চেষ্টা করা হয়েছে। নানান মানুষ নানা কথা বলে। কেউ বলে বিয়ে করে অন্য কোথাও ঘর সংসার পেতেছে। কেউ বলে ইন্ডিয়া চলে গেছে। আবার কেউ বলে হয়তো মরে গেছে।
দু'টো ছেলে মেয়ে নিয়ে টিকে থাকার জন্য শাহানা অন্যের বাসায় কাজ করতে বাধ্য হয়। খুব কষ্টে ছেলে মেয়েদের তিনবেলা খাইয়ে লেখা পড়া শিখাচ্ছে। আমার মা শাহানা'র ঘটনা জানার পর তার বেতন ডবল করে দিল। এবং ছেলে মেয়েদের জন্য প্রতিদিন ভাত তরকারি দিয়ে দেয়। ধীরে ধীরে শাহানা আমাদের পরিবারের একজন হয়ে উঠলো। আমরাও তাকে পেয়ে অনেক খুশি।
সবাইকে অবাক করে দিয়ে দীর্ঘ চার বছর পর শাহানা'র স্বামী ফিরে এসেছে। এসেই ছেলে মেয়ে দুটোকে বুকে জড়িয়ে ধরে খুব কান্না। শাহানা'র হাত ধরে খুব কান্না। ছেলে মেয়ে দু'টাও বাবাকে জড়িয়ে ধরে কান্না। শাহানা'র স্বামী কথা দিয়েছে আর কোথাও যাবে না। শাহানা'র পরিবারের আনন্দ দেখে- আমরাও সবাই খুশি। এই চার বছরে শাহানা'র স্বামী দাড়ি কামায়নি, মাথার চুল কাটেনি। গায়ের রঙ হয়ে গেছে কুচকুচে কালো।
শাহানা'র স্বামী বাউল হতে চেয়েছিল, দরবেশ হতে চেয়েছিল, সন্মাসী হতে চেয়েছিল। কে বা কার বুদ্ধিতে এই লোক এই পথ বেছে নিয়েছিল আমি জানি না। চারটা বছর শাহানা'র কি সীমা কষ্ট করতে হয়েছে স্বামীকে ছাড়া। আর এই লোক বউ বাচ্চার কথা ভুলে গিয়ে মাজাতে-মাজারে ঘুরে বেড়িয়েছে। শাহানা'র স্বামীর সাথে আমার নানির মিল আছে। আমার নানি শেষ বয়সে মাজারে মাজারে ঘুরতো। বড় ডেকে খিচুরি রান্না করে- মাজারে নিয়ে গিয়ে সবাইকে নিজের হাতে বেড়ে খাওয়াতো। চুল আচড়াতো না। চুলে ঝট ধরে গিয়েছিল।
একসময় মাসের পর মাস গিয়ে আজমী শরীফে পড়ে থাকতো। আমার নানী বড় ব্যবসায়ী ছিলেন। ইন্ডিয়াতে তার একটা অফিস ছিল। মাজারে মাজারে ঘুরার ফলে তার ব্যবসা ধস নামে।
একদিন শাহানা তার স্বামীকে আমার কাছে নিয়ে আসলো। আমি যেন তাকে বুঝিয়ে দেই- সে যেন আর কোথাও না যায়। আমি আমার সমস্ত ভালোত্ব দিয়ে, সমস্ত মেধা দিয়ে শাহানা'র স্বামীকে বুঝালাম। সে আমার সব কথা খুব আগ্রহ নিয়ে শুনলো। সবচেয়ে বড় কথা আমার সমস্ত কথা, সমস্ত যুক্তি হাসি মুখে মেনে নিল। এবং আমাকে কথা দিল, সে আর কোথাও যাবে না স্ত্রী আর ছেলে মেয়েকে ফেলে। শাহানা'র স্বামী আমার হাত ধরে কাঁদতে কাঁদতে আমাকে জড়িয়ে ধরলো। শাহানাও কাঁদলো। শাহানা আমার দিকে তাকালো। তার চোখে মুখে এক আকাশ মুগ্ধতা আর কৃতজ্ঞতা দেখলাম।
কিছুক্ষন আগে বাসা থেকে মা ফোন করে জানালো শাহানা'র স্বামী আবার নিরুদ্দেশ হয়েছে। শাহানা'র ছেলে মেয়ে দুটো খুব কাঁদছে। শাহানাও কাঁদছে। আমার খুব খারাপ লাগছে। কষ্টও হচ্ছে। আসলে, কিছু কিছু মানূষকে এক আকাশ ভালোবাসা দিয়ে ধরে রাখা যায় না। এটাই বোধ হয় প্রকৃতি চায়।
সর্বশেষ এডিট : ৩০ শে জুলাই, ২০১৭ বিকাল ৪:৪৪

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।



