
একটি ঘটনা দিয়ে লেখাটি শুরু করি-
আজ থেকে বত্রিশ বছর আগে-একজন তরুণী মেয়ে মুন্সিগঞ্জ-বিক্রমপুর যাচ্ছে, তার স্বামীর খোঁজে। স্বামীর তিন মাস ধরে কোনো খোঁজ খবর নেই। এই তিন মাস বাচ্চাদের খরচ চালিয়েছে নানা-নানী। কিন্তু অসুস্থাতার কারনে নানা-নানী মারা জান।
তরুনী মেয়েটির কোলে তার তেরো মাসের বাচ্চা। আর দুই বছরের ছেলেটাকে ইদ্দিস আলী কোলে নিয়ে হাঁটছেন। তাদের নিয়ে যাচ্ছে- মেয়েটির দূরসম্পর্কের এক ভাই ইদ্দীস আলী। ইদ্দিস আলী বিআরটিসি বাস চালায়। এখন বিক্রমপুর যেতে সময় লাগে এক ঘন্টা। কিন্তু তখন সময় লাগতো- আট থেকে বারো ঘন্টা।
পদ্মা নদী পাড় হয়ে নৌকা থেকে যখন তারা নামলো- তখন ভর সন্ধ্যা। হঠাত শুরু হলো কাল বৈশাখী ঝড়। তরুনী মেয়েটি কোলের বাচ্চাটিকে শাড়ির আঁচল দিয়ে ভালো করে ঢেকে নিল কিন্তু বৃষ্টি থেকে বাঁচাতে পারল না। গ্রামের রাস্তা কাঁদা মাটির, কাঁদা মাটিতে পা ডেবে যাছে। হাঁটতে খুব কষ্ট হয়ে। ঝড়ের কারনে ঠিক ভাবে হাঁটা যাচ্ছে না। গাছের ঢাল ভেঙ্গে পড়ছে। ইদ্দীস আলী তার বোনের বড় ছেলেটিকে কোলে নিয়ে হাঁটছেন।
দীর্ঘ দুই ঘন্টা ঝড়ের সাথে যুদ্ধ করে- মেয়েটি তার স্বামীর বাড়ীর সন্ধান পায়। জানা যায়- স্বামীটি গ্রামে আরেকটি বিয়ে করেছে। মেয়েটি সেই রাতেই কাঁদতে কাঁদতে ঢাকা চলে আসে। এই তরুনী মেয়েটি হচ্ছে আমার ছোট খালা। যে ঝড়ের মধ্যে এক মুহূর্তের জন্যও তার ছেলেকে কোলে থেকে নামান নি। বুকের মধ্যে ঝাপটে ধরে রেখেছিলেন। বড় ছেলেটির নিমোনিয়া হয়ে গিয়েছিল। সেই নিমোনিয়া থেকে হয়ে যায় হাপানী, যা আজও ভালো হয়নি। এটা হচ্ছে আমার মায়ের গল্প। খুবই দুঃখময় ইতিহাস। যাই হোক, মূল লেখায় যাই, এই ব্যাপারে অন্য কোনো লেখায় বিস্তারিত লিখব। ইদ্দীস মামা গত বছর মারা যান। কোন এক সময় মামাকে নিয়ে অবশ্যই একটা লেখা লিখব।
শুক্র বার। সকাল এগারোটা।
আমি একটি হোটেলে নাস্তা খেতে যাই। শুক্র বার বলেই হোটেলটি ফাঁকা। আমি নাস্তা খাচ্ছি, গরুর মাংস কালো ভূনা আর নান রুটি। আমার পাশের টেবিলে খুব সুদর্শন একটি ছেলে বসে নাস্তা খাচ্ছে। হঠাত শুনি ছেলেটা ফোনে কোনো মেয়েকে বিচ্ছিরি ভাষায় গালাগালি করছে। খ - ম দিয়ে একটা বকা আছে না, ওই বাজে বকা টা বার বার দিচ্ছে। খুবই বাজে ব্যবহার এবং খুবই নোংরা সব কথা বার্তা। মেয়েটি কি করে সহ্য করছিল- কে জানে! আমার নিজেরই মেজাজ খারাপ হয়ে যাচ্ছিল।
আরেকটি ঘটনা বলি- একদিন দেখি- রাস্তায় একজন লোক তার বৌকে খুব মারছে। আশে পাশে অনেক মানুষ দাঁড়িয়ে দেখছে। এবং তাদের সবার মতামত হচ্ছে- বৌটার দোষ। ঠিকই আছে, মারছে- এটা ভালোই করছে। বৌকে কিভাবে মারছিল বলি- চুলের মুঠি ধরে টানছিল, সব শক্তি দিয়ে হাতের আঙ্গুল উলটো দিকে ধরেছিল। বুকের মধ্যে, পেটের মধ্যে লাথথি মারছিল। এইসব দেখা আমার পক্ষে সম্ভব না। আমি সাহায্যের জন্য গিয়েছিলাম- কিন্তু আমাকে যেতে দেওয়া হয়নি। স্বামী স্ত্রীর ব্যাপারে আমি বাইরের মানুষ যেতে পারি না, তারা বলেছিল।
এইবার বলি- আমাদের ভাড়াটিয়ার কথা। অল্প বয়সী দুইটি ছেলে থাকে। তারা বিয়ে করে ফেলেছে। কিন্তু বিয়ের কথা ছেলে বা মেয়ের বাসার কেউ জানে না। মেয়ে দু'টা বোরকা পড়ে নিয়মিত বাসায় আসে- দুই তিন ঘন্টা থাকে। তারপর চলে যায়। মেয়ে দু'টা লেখা-পড়া করছে প্রাইভেট ভার্সিটিতে। তারা বিয়ে করেছে দুই বছর হয়ে গেছে। একদিন আমি ছেলে দু'টার ঘরে গিয়ে দেখি- তাদের ঘরে অসংখ্য কনডমের প্যাকেট চারদিকে ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে। এতে ছেলে দু'টোর কোনো লজ্জাবোধ নেই। দু'টা ছেলের সাথে কথা বলে আমি জানতে পারি- তারা গোপনে বিয়ে করেছে-, কিন্তু তাদের সাথে কোনো দিনই তারা ঘর সংসার করবে না। যথা সময়ে তারা মেয়ে দু'টাকে ফাঁকি দিয়ে অন্য কোথাও চলে যাবে। মেয়ে দু'জন তাদের গ্রামের ঠিকানা জানে না। কয়েকদিন কান্না কাটি করে ঠিক হয়ে যাবে। কিন্তু বোকা মেয়ে দু'টা তাদের চালাকি ধরতে পারেনি। বরং মেয়ে দু'টা এমন পাগল হয়েছে- তারা মায়ের গয়না চুরী করে নিয়ে এসে ছেলেটার হাতে দেয়। সেই গয়না বিক্রি করে- তারা বিলাসিতা করে। এক ছেলে বলল- আমি সুযোগে আছি- ব্যবস্থা হয়ে গেলেই বিদেশে চলে যাবো। বিদেশ গিয়ে মেয়েটাকে ফোন করে বলব- যাও, এবার কলা খাও। এতদিন প্রেম ভালোবাসার অভিনয় করেছি স্রেফ শরীরের আনন্দের জন্য। এই সমস্ত ব্যাপার আমি দেখার পর কান টা ধরে তাদেরকে বাসা থেকে বের করে দেই।
এরকম অসংখ্য ঘটনা প্রতিদিন এই সমাজে ঘটছে। তারপরও মেয়েদের হুশ হয় না। তারা একের পর ভুল করেই যাছে। এই সমাজে কাউকে বিশ্বাস করতে নেই। বিশ্বাস করলেই ঠকতে হবে-কাদতে হবে। সারা জীবন ধরে কাঁদতে হবে। পনের বছর থেকে ষাট বছরের বুড়া পর্যন্ত প্রেম ট্রেম করে। কুষ্টিয়ার স্কুল শিক্ষকের কথা তো সবাই জেনেছেন। এই রকম স্কুল শিক্ষকের মতন লোকের অভাব নেই আমাদের সমাজে।
খুব অল্প সংখ্যক ছেলে সত্যিকারের সত্য প্রেম করে। যার সাথে প্রেম করে তাকেই বিয়ে করে। বিয়ের পর স্ত্রীকে সুখে রাখতে চেষ্টা করে। অনেক ছেলে-মেয়েকে দেখা যায় প্রেম ভালোবাসার নাম দিয়ে রিকশার মধ্যে চুমাচুমি করে। বোকা মেয়ে গুলো বুঝে না- ছেলেটা যদি তাকে সত্যিকারের ভালোবাসতো- তাহলে তাকে সম্মান করতো। চলতি রিকশার মধ্যে চুমু দিত না। কোমড়ে বা বুকে সুযোগ পেলেই হাত রাখত না। এই ধরনের ছেলে মেয়ে গুলো খুবই অসভ্য হয়- কেউ কেউ এমন ভাব করে- যেন এটাই আধুনিকতা। আমি এক সময় ভাবতাম এই রকম শুধু গার্মেন্সের ছেলে-মেয়েরাই করে থাকে কিন্তু ঘটনা তা নয় শিক্ষিত পরিবারের স্কুল-কলেজের ছেলে মেয়েরাই এমন করে। এখন তো মনে হচ্ছে- তাদের চেয়ে গার্মেন্সের মেয়েরা অনেক ভালো।
বিয়ের পরও তো কত ঘটনা ঘটে। যে স্বামী এক আকাশ ভালোবাসা নিয়ে আপনাকে গালে চুমু পর চুমু খেয়েছে, মুখ দিয়ে হাজার হাজার ভালোবাসার কথা বলেছে- সেই স্বামী আপনার চুমু খাওয়া গালে জুতা দিয়ে মারতে একটু চিন্তা করবে না, যে মুখ দিয়ে হাজার হাজার ভালোবাসার কথা বলেছে- সেই মুখ দিয়ে অকথ্য ভাষায় বিনা দ্বিধায় গালাগালি করবে। কেউ যদি আমার কথায় অবিশ্বাস করেন- তাহলে আপনার এলাকার সিটি কর্পোরেশন অফিস গিয়ে দেখতে পারেন- প্রতিদিন কতগুলো করে তালাক হচ্ছে। থানায় গিয়ে খোঁজ করতে পারেন- প্রতিদিন কত নারী কাঁদতে কাঁদতে থানায় গিয়ে স্বামীর নামে জিডি করছে। মামলা করছে।
আমার নিজের চোখে দেখা একটা ঘটনা বলি- এলাকায় ছোট ভাইয়ের বন্ধুকে পুলিশ ধরে নিয়ে গিয়েছে- তাকে ছাড়িয়ে আনতে থানায় যাই। তখন রাত বারোটা। ডিউটি অফিসারের সাথে কথা বলছি- তখন দেখি পঁচিশ বছরের একটি মেয়ে কাঁদতে কাঁদতে থানায় আসছে; ঠিক ভাবে হাঁটতে পারছে না। শাড়ি এলোমেলো, সারা শরীরের মারের চিহ্ন । দেখলাম- থানার সব গুলো পুলিশ মেয়েটাকে চোখ দিয়ে চাটছে। একটা পুলিশ তো কোমরে হাত দিয়ে বলল- হুম অনেক মেরেছে- এই যে কোমরে কালচে দাগ হয়ে আছে।
আমার কথা হলো- আমি আমার দেশকে অনেক ভালোবাসি। আমি চাই এই ছোট্র বাংলাদেশে সবাই মিলেমিশে থাক। স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে থাক এক আকাশ স্বচ্ছ ভালোবাসা। প্রেম-ভালোবাসার মধ্যে থাক সৌন্দর্য এবং পবিত্রতা। বিয়ের আগে প্রেম ভালোবাসা করুন- কোনো সমস্যা নাই। কিন্তু সেখানে যেন প্রতারনা না থাকে। একজনকে ভালোবাসুন। এক আকাশ ভালোবাসা নিয়ে সারা জীবন একজনের সাথেই থাকুন। দেখবেন, অনুভব করতে পারবেন জীবন অনেক সুন্দর। শারীরিক সম্পর্কই জীবনের সব নয়। আমি মনে করি- আপনি আপনার প্রিয় মানুষের সাথে এক আকাশ ভালোবাসা নিয়ে হাত ধরে সমুদ্রের পাড়ে হাঁটলেন, আপনার প্রিয় মানুষটি নীল একটা শাড়ি পড়েছে- সাথে নীল কাঁচের চুড়ী এবং কপালে বড় একটা নীল টিপ, বাতাসে তার চুল উড়ে এসে আপনার চোখে মুখে পড়ছে- এটা অনেক আনন্দময় একটা ব্যাপার। তা না করে যদি একটা বন্ধ ঘরে চুদুর বুদুর করেন- সেটা ভালো ব্যাপার নয়। সবাই ভালো থাকুন- সুন্দর থাকুন। হয়তো কেউ দেখেনি- কেউ জানে না কিন্তু যদি খারাপ কিছু করে থাকেন তার শাস্তি আপনাকে পেতেই হবে।
সর্বশেষ এডিট : ৩১ শে জুলাই, ২০১৭ সকাল ১১:২৫

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।



