
শাহেদের মৃত্যুর তিন বছর পরে আমি তার একখানা ডায়েরী পাই। তার ডায়েরীর লেখা দিয়েই আমার আজকের পোষ্ট। শাহেদ এলোমেলো ভাবে নানান রকম কথাবার্তা তার ডায়েরীতে লিখেছে। শাহেদ আমার বন্ধু ছিল। খুব ভালো বন্ধু। মধ্যবিত্ত পরিবারের অর্থনীতিতে মাস্টার্স পাশ একটি ছেলে। আমরা একই সাথে স্কুল পর্যন্ত লেখাপড়া করেছি। কলেজে উঠে দুইজন দুই কলেজে ভর্তি হই। কিন্তু আমরা এক পাড়ায় থাকতাম। রোজ আমাদের দেখা হতো। আড্ডা হতো। শাহেদ খুব বই পড়তো। আর আমি দেখতাম মুভি। লেখাপড়া শেষ করে চার বছর বেকার থাকার পর শাহেদ একটা ব্যাংকে চাকরি পেয়ে যায়। পরিবারের চাপে বিয়ে করে তারপর। কিন্তু তার কোনো দিনও বিয়ে করার ইচ্ছা ছিল না। তার বউ নীলা খুবই বুদ্ধিমতি একটা মেয়ে। আমি বাসায় গেলেই আমাকে নুডুলস আর চা খাওয়াতো। চোখ মুখ বড় বড় করে, দুই হাত নেড়ে নানান বিষয় নিয়ে গল্প করতো।
বকবক না করে শাহেদ তার ডায়েরীতে কি কি লিখেছে তা বলি- মানুষের জীবন একটা চক্রের মতোন। যুগ যুগ ধরে এই চক্র অবিরাম চলছে। আমি এই চক্রের মধ্যে নিজেকে জড়াবো না। তবু পরিবারের চাপে আমাকে বিয়ে করতে হলো। অর্থাত আমাকে আমার ইচ্ছার বিরুদ্ধে চক্রে ঢুকানো হলো। মানব জীবনের চক্রটা এইভাবে শুরু হয়- তোমার জন্য হয়েছে, এখন তোমার বাবা মা তোমাকে আদর ভালোবাসা দিয়ে বড় করবে। তুমি অসুস্থ হলে তোমার বাবা মা রাত জেগে তোমার পাশে বসে থাকবে। নানান ধরনের খেলনা তোমাকে কিনে দিবে। হাটতে শিখলে, কথা বলা শিখলে বই কিনে দিবে। তাপর একদিন স্কুলে ভর্তি করিয়ে দিবে। দিনের পর দিন স্কুলে যাবে- আসবে। একসময় স্কুল পাশ করে কলেজে ভর্তি হতে হবে, কলেজ পাশ করে ইউনিভার্সিটিতে ভর্তি। তারপর লেখা পড়া শেষ করে চাকরির পেছনে ছুটো। চাকরি পেতে-পেতে জীবন তেজ পাতা। চাকরি পাওয়ার পর পরিবার থেকে বলবে এবার বিয়ে কোর। বিয়ের পর বলবে এখন বাচ্চা নাও। বাচ্চা নেওয়ার পর শুরু হবে এই বাচ্চাকে মানূষ করা। অসুস্থ হলে চিকিৎসা করাও। স্কুলে ভর্তি করাও। ভালো স্কুলে ভর্তি করাতে হবে।
এইভাবেই একটা মানুষের জীবন চক্র চলতেই থাকে। যুগের পর যুগ একই অবস্থা। একই নিয়ম। এই নিয়ম গুলো আমি কিছুতেই মন থেকে মেনে নিতে পারি না। লেখাপড়া শিখতে গিয়ে কষ্ট। চাকরি পাওয়ার জন্য সীমাহীন কষ্ট। বিয়ের পর আসে আরো নানাবিদ ঝামেলা একের পর এক। সব কিছুর মোকাবেলা করতে হয়। চারপাশে আছে নানান ঝক্কি ঝামেলা। এইসব নিয়ে মোকাবেলা করতে-করতে একদিন জীবনটাই শেষ হয়ে যায়। দরিদ্র দেশে জন্মানোর কারনে দুঃখ কষ্টের পরিমান আরও বেড়ে যায়। আর যদি মধ্যবিত্ত পরিবারে জন্ম হয় তাহলে তো দুঃখের কষ্টের শেষ নেই। আচ্ছা, আমি শাহেদ আমাকে কেন এই নোংরা পৃথিবীতে আনা হলো। জন্মের সময় যদি আমাকে জিজ্ঞেস করা হতো- তুমি কি পৃথিবীতে যেতে চাও? আমি চিৎকার করে বলতাম, না। নো নেভার। পৃথিবীতে এসে এবং দরিদ্র একটা দেশে জন্ম গ্রহন করে আমাকে সীমাহীন কষ্ট করতে হবে প্রতিনিয়ত। যদি আমাকে পৃথিবীতে না আনা হতো তাহলে এই অপ্রত্যাশিত কষ্ট গুলো পেতে হতো না।
জ্ঞান বুদ্ধি হবার পর থেকেই আমি চেয়েছি স্বাধীনভাবে জীবন যাপন করতে। তা আমি পারিনি কখনও। মানব জীবন তো একটাই। অথচ আমাকে আমার ইচ্ছে মতোন কিছুই করতে দেওয়া হয়নি। শুধু শুনতে হয়েছে, ওখানে যেও না, এটা করো না, ওটা করো না, পড়তে বসো। প্রতিটা মুহূর্ত অভাবের সাথে যুদ্ধ করতে হয়েছে। খেয়ে না খেয়ে জীবন যাপন করতে হয়েছে। কেন পৃথিবীতে আমাকে এত কষ্ট করতে হলো? এর জন্য দায়ী কে? ঈশ্বর না আমার বাবা মা? যেই'ই হোক তাকে আমি ক্ষমা করবো না। নো নেভার। তাদের কোনো রাইট নেই, আমাকে দুনিয়াতে এনে কষ্টের সাগরে ফেলে দেওয়া। আমাকে আমার বাবা মা জন্ম দিয়ে কঠিন এই পৃথিবীতে এনে তারা বিদায় নিয়েছেন। এখন আমি আবার দুই একটাকে জন্ম দিয়ে এই নোংরা পৃথিবীতে এনে তাদেরকে রেখে যাবো সীমাহীন কষ্ট করার জন্য? এই চক্রটা যুগ যুগ ধরে চলছে। চলেই যাচ্ছে। চক্রটা কেউ ভাঙ্গছে না কেন? আমি শাহেদ এখন আর এই চক্রের মধ্যে থাকবো না। আমি এই চক্র থেকে বের হবো।
আর বিয়ের পর বাচ্চা নিতেই হবে কেন? না নিলে সমস্যা কি? এই সমাজে একটা বাচ্চা জন্ম দিয়ে সীমাহীন কষ্ট দেওয়ার কোনো মানে হয় না। এই সমাজে যারা খারাপ কাজ করে, যারা চুরী, ছিনতাই, ডাকাতি, দুর্নীতি, দালালি, ধর্ষণ, মাদকসেবী বা মাদক বিক্রেতা হয় তারাও তো কারো না কারো সন্তান। তারা যখন ছোট ছিল তাদের বাবা মাও স্বপ্ন দেখেছিল তাদের সন্তান বড় হয়ে ডাক্তার হবে, পাইলট হবে, ইঞ্জিনিয়ার হবে। কিন্তু হয় না। ভবিষ্যতে যেসব বাবা মা সন্তান জন্ম দিবে সেইসব বাচ্চা যে একসময় বড় হয়ে ধর্ষক হবে না, দালাল হবে না, দুর্নীতিবাজ হবে না, জঙ্গী হবে না তার নিশ্চয়তা কোথায়? দুষ্ট গরুর চেয়ে শূন্য গোয়াল অনেক ভালো। আর বাংলাদেশে জনসংখ্যা এত হয়ে গেছে যে আগামী ১৫/২০ বছর কোনো দম্পতি বাচ্চা না নিলেও কোনো সমস্যা নাই। বাচ্চা না নিলেই বরং দেশের উপকার হবে। অনেকে হয়তো বলবেন, যদি বাচ্চা'ই না নিই তাহলে বিয়ে করার দরকার কি? ঠিক আছে তাহলে বিয়ে করবেন না। আর যদি শারীরিক চাহিদা চাগাড় দিয়ে উঠে তাহলে আপনি আপনার প্রিয় মানুষের কাছে যাবেন অথবা ব্রোথেল হাউজের তো অভাব নেই।

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।

