
একটা সত্য কথা বলি- ছোটবেলা থেকেই আমার নায়ক হওয়ার ইচ্ছা ছিল। খুব ইচ্ছা ছিল। আমি সত্যি সত্যি নায়কদের মতো চলাচল করতাম। চুল উলটো করে আচড়াতাম। কিন্তু কিছুক্ষন পর চুল গুলো সামনে এসে পড়তো। তাই পানি দিয়ে ভিজিয়ে উলটো করে আচড়াতাম। অনেকক্ষন আর সামনে আসতো না। একজন বুদ্ধি দিল চুল উলটে না আঁচড়িয়ে, চুল সামনে ঝুলে থাকলেই বেশি ভালো লাগে। তখন চুল আমার ইয়া বড় ছিল। ঝুটি করা যেত। বাতাসে উড়তো। লাল শার্ট আর জিন্স প্যান্ট পড়তাম। কেডস পড়তাম। হাতে থাকতো ঘড়ি। প্রচুর মুভি দেখতাম। নায়কদের ফলো করতাম। এফডিসি'তে গিয়ে ঘন্টার পর ঘন্টা শূটিং দেখতাম। কিন্তু কখনও কোনো পরিচালক বলেনি- এই ছেলে তুমি অভিনয় করবে?

যে আমলে নায়ক হতে চেয়েছিলাম। সেই আমলের ছবি।
গলির মোড়ে আড্ডা দিতাম। সেখানে নায়কদের মতো আচারন করতাম। কোনো মেয়ে রিকশা না পেলে দৌড়ে তাকে রিকশা খুঁজে দিতাম। কেউ রাস্তায় ময়লা ফেললে- কঠিন প্রতিবাদ করতাম। বিশেষ বিশেষ দিনে খিচুড়ির আয়োজন করতাম। যেমন ২১শে ফেব্রুয়ারীতে। ১৬ ডিসেম্বরে। ইংরেজী নববর্ষতে বোমা ফুটাতাম রাত ১২টার পর (যে গলির মোড়ে আমার আড্ডা ছিল)। সেখানে একটা পাচ তালা বাড়ির দোতালায় এক মেয়ে থাকতো। দারুন রুপসী। কিন্তু সমস্যা হলো মেয়ের বাপ হুজুর। মেয়েটা কখনও বেলকনিতে আসতো না। কিন্তু আমি জানি মেয়েটা বেশ কয়েকবার এসে আমাকে উঁকি দিয়ে দেখে যেত। আমি আমার এসিসটেন্ট দিয়ে মেয়েটার জন্য আইসক্রীম, চকলেট চিপস পাঠাতাম। ওর বাবার বদলি হয়ে গেল। ওরা চলে গেল রাজশাহী।

সেই সময় মাথার চুল অনেক লম্বা ছিল।
সেই সময় আমি দেখতে আসলেই নায়কদের মতোন ছিলাম। আমার চেহারা ছবি ভালো। অবশ্য আমাদের বংশে সবাই খুব সুন্দর। আমার বাপ চাচাদের সবার চেহারা-নকশা দুর্দান্ত। আমার নানী আমার আব্বাকে দেখেই বলেছিল এত সুন্দর ছেলে আমি কখনও দেখি নাই। একদম নায়ক। নায়কের চেয়ে সুন্দর। আল্লাহর রহমতে আমিও বেশ ভালো দেখতে। কিন্তু দুঃখের বিষয় এক বছর মার্কেটিং এ চাকরি করে আমি শেষ। আমার রুপ যৌবন, গায়ের রঙ সব শেষ। একেবারে শেষ। এখন কাইল্লা হয়ে গেছি। চোখ মূখ হয়ে গেছে রুক্ষ। চেহারার মধ্যে কোনো লাবন্য নেই। আমার মা মাঝে মাঝে দুঃখ করে বলে, আমার কি ছেলে- কি হয়ে গেছে। রাজপুত্তুর ছিল এখন রিকশাওয়ালাদের মতো হয়ে গেছে।
আমার এক বন্ধু একদিন বলল, তুই নায়ক হতে পারছি না। তোর উচ্চারণ ঠিক না। আমার মন প্রচন্ড খারাপ হলো। আসলেই কিছু কিছু শব্দ উচ্চারণ করতে পারি না। আরেক বন্ধু বলল, নায়ক হবার জন্য পয়সাওয়ালা মামা-চাচা লাগে। তোর তো এরকম কেউ নেই। চিন্তা করে দেখলাম আসলেই কেউ নেই। আর থাকলেও তারা আমাকে হেল্প করবে না। আমার এক চাচা বেশ কিছু সিনেমার প্রডিউসার ছিলেন। সে যাই হোক, এক আকাশ কষ্ট নিয়ে সিনেমার নায়ক হবার স্বাদ বাদ দিলাম। রঙ্গিন জগত থেকে ফিরে এলাম বাস্তব জগতে। মুভি দেখা বাদ দিলাম। নায়কদের স্টাইল নকল করা বাদ দিলাম। প্রবেশ করলাম বইয়ের জগতে। সেই জগত থেকে আজও বের হতে পারি নাই। আর বের হতে চাইও না।
আমাদের সামুর ব্লগার ''সোনাবীজ; অথবা ধুলোবালিছাই'' (খলিল মাহমুদ ভাই) সেদিন এক পোষ্টে আমার চেহারা নিয়ে পোস্টার করেছেন। তার এই পোস্টার দেখে খুব মজা পেয়েছি। সেই পোস্টারের সুবাদে আমি চলে গিয়েছি বহু বছর আগের যুগে। তার এক পোস্টার পুরোনো অনেক কথা মনে করিয়ে দিল। আজও তিনি আরেকটা পোস্টার করেছেন। এই পোস্টার দেখেও আমি মুগ্ধ! বেশ আনন্দ পাচ্ছি। নিজেকে মিথ্যামিথ্যি নায়ক ভাবতেও আমার ভালো লাগে। হয়তো অনেকে আমাকে ক্লাউন মনে করতে পারেন। অথবা আমাকে নিয়ে হাসাহাসি করতে পারেন। কিন্তু আমি যে আনন্দ পেয়েছি সেটা মিথ্যা নয়। আমি ''সোনাবীজ; অথবা ধুলোবালিছাই'' (খলিল মাহমুদ) ভাইকে আন্তরিক ধন্যবাদ জানাই। কিছুক্ষনের জন্য হলেও আমাকে আনন্দ দেওয়ার জন্য।

সর্বশেষ এডিট : ০৮ ই সেপ্টেম্বর, ২০১৮ রাত ৮:৪৯

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।



