
এদেশের মানুষ গুলো নিয়ে শাহেদ অনেক আশাবাদী ছিল। দিনদিন মানুষ গুলোকে নিয়ে শাহেদ অত্যন্ত হতাশ বোধ করছে। রবীন্দ্রনাথ বলেছিলেন, কোনো প্রতিষ্ঠানের ওপরে তার কোনো আস্থা নেই। কিন্তু সেই মানুষ গুলোর ওপর তার আস্থা আছে, যাদের মধ্যে অন্তত তিনটি গুণ আছে। যারা সঠিকভাবে চিন্তা করতে পারে, মহান অনুভব যাদের চিত্তে সব সময় থাকে এবং জগৎ ও জীবনের স্বার্থে যারা সঠিক কর্ম সম্পাদন করতে পারে। এ তিনটি গুণ সম্বলিত মানুষ সমাজের জন্যে সম্পদ, দেশের জন্যে সম্পদ। অন্যথায় সে মানুষ নিজের জন্যে বোঝা, সমাজের জন্যে হুমকি, দেশের জন্যে ভয়ংকর চ্যালেঞ্জ। অর্থাৎ শেষ কথাটি হচ্ছে মানুষ চাই। নিজে মানুষ হলে সমাজটা মানুষ হয়, দেশও মানুষ হয়। দিনবদল হয়।
গত দুই দিন বাস বন্ধ। সমস্ত ঢাকা শহরে ভয়াবহ অবস্থা। মানুষের সীমাহীন কষ্ট। ময়লার গাড়িতে পর্যন্ত মানুষ জীবিকার তাগিদে উঠেছে গন্তব্যে যাওয়ার জন্য। এটা জাতি হিসেবে আমাদের জন্য অনেক লজ্জার। এই লজ্জা আমাদের জন্য আরও বাড়লো যখন কিছু লোক প্রাইভেট গাড়ির চালকদের মুখে কালি মেখে দিল। যারা এই কাজ করেছে তাদের কঠিন শাস্তি হওয়া উচিত। আমার বিশ্বাস শেখ হাসিনা এদের বিরুদ্ধে অবশ্যই ব্যবস্থা নিবেন। শ্রমিক নেতাদের উপর আমার কোনো আস্থা নেই। এখন শাহেদের কথা একটু বলে নিই। শাহদের ইন্টারভিউ ছিল উত্তরাতে। সে সকালবেলা বাসা থেকে বের হয়ে দেখে বাস নেই। তার মাথায় আকাশ ভেঙ্গে পড়লো। তার কাছে কোনো টাকা পয়সা ছিল না। হাত একদম খালি। সে তার মার কাছ থেকে অনেক বলে-কয়ে দুই শ' টাকা নিয়ে বের হয়েছে। মাকে বলেছে, মা চাকরি পেলে এই দুই শ' টাকার বদলে তোমাকে দুই হাজার টাকা দিব।
সকাল এগারোটায় শাহেদের ইন্টারভিউ। পাঠাও তেও করে যাওয়া যাবে না উত্তরাতে। তিন শ' টাকার উপরে ভাড়া আসবে। সত্যি সত্যি শাহদের চোখে ভিজে উঠলো। একটা চাকরি তার ভীষন দরকার। শাহদে টানা দুই ঘন্টা হেঁটে বনানী চেয়ারম্যান বাড়ি এসে থামলো। রোদ নেই কিন্তু সে ঘেমে-টেমে একাকার। সে হাপাচ্ছে। একটা চায়ের দোকানে বসে এক কাপ চা আর কেক খেলো। তারপর একটা সিগারেট। সিগারেট শেষ করে সে আবার হাঁটা শুরু করলো। হাঁটতে-হাঁটতে খিলক্ষেত এসে থামলো। তার পা আর চলছে না। তার মনে হচ্ছে সে মাথা ঘুরিয়ে পড়ে যাবে। এগারোটায় ইন্টারভিউ, অলরেডি সাড়ে এগারোটা বেজে গেছে। তারপর ভাগ্য ভালো খিলক্ষেত বাস স্ট্যান্ডে একটা প্রাইভেট কার পেলো। সেই গাড়ি উত্তরা যাবে। শাহেদ লাফ দিয়ে গাড়িতে উঠে বসলো। কারন অসংখ্য মানুষ এই গাড়িতে উঠার জন্য প্রস্ততি নিচ্ছিল। খিলক্ষেত থেকে উত্তরা ভাড়া নিল পঞ্চাশ টাকা। বাস থাকলে বড়জোর দশ/পনের টাকা নিত।
শাহেদ বারোটা পয়তাল্লিশ এ অফিসে গিয়ে পৌছালো। তখন জোহরের আযান দিচ্ছিল। রিসিপশন থেকে জানলো ইন্টারভিউ নেওয়া শেষ। ইন্টারভিউ দেওয়ার মতো আর কোনো সময়-সুযোগ নেই। শাহদের প্রচন্ড মন খারাপ হলো। সে গতকাল তিনটা পর্যন্ত পড়াশোনা করেছে। সেপ্টেম্বর মাসের কারেন্ট অ্যাফেয়ার্স পুরো মুখস্ত করে ফেলেছে। শাহেদ রিসিপশনে অসহায় মানুষের মতোন বসে আছে। রিসিপশনের মেয়েটির হয়তো তাকে দেখে মায়া লাগলো। সে এক গ্লাস পানি আর এক কাপ লাল চা দিল। মেয়েটির মহানুভবতায় শাহেদের চোখে পানি চলে এলো। সব মানুষ এখনও পুরোপুরি নিষ্ঠুর হয়ে যায়নি। শাহেদ পানি খেল। এসি রুমে বসে আরাম করে বসে চা খেল। মেয়েটিকে একটা ধন্যবাদ দিয়ে অফিস থেকে বের হয়ে এলো। নিচে নেমেই সে একটা সিগারেট ধরালো। সিগারেটে লম্বা একটা টান দিয়ে সিদ্ধান্ত নিলো সে আর একটাও ইন্টাইভিউ দিবে না। নো নেভার। মনে মনে বলল- চাকরির মায়রে বাপ।
শাহেদ সারাদিন রাস্তায় এলোমেলো অনেক হাঁটলো। তার বউ নীলা বেশ কয়েকবার ফোন করলো। সে ফোন ধরেনি। শাহেদ একজন পরাজিত মানুষ। আজ যদি তার বাপের লক্ষ কোটি টাকা থাকতো। অনেক জমিজমা থাকতো। তাহলে তার এত কষ্ট করতে হতো না। একটা চাকরির জন্য দ্বারে দ্বারে ঘুরতো হতো না। শাহেদের তার বাপের উপর অনেক রাগ হলো। সে তার বাপকে ফোন দিল। চিৎকার করে বলল- আব্বা তোমার টাকা পয়সা নাই কেন? তোমার কেন ক্ষমতাবান আত্মীয় স্বজন নাই? আজ তোমার জন্য আমার এই অবস্থা। শাহেদের বাবা কিছু বলতে যাচ্ছিল তার আগেই শাহেদ ফোন কেটে দিল। শাহেদের জীবনটা এমন হবার কথা ছিল না। আনন্দময় একটা জীবন কি শাহদের হতে পারতো না। এর জন্য দায়ীকে? আচ্ছা, এই শহরে কত লক্ষ শাহদ আছে? দেশ উন্নয়নের মহাসড়কে চলে গেছে তাহলে শাহেদদের কোনো পরিবর্তন হয় না কেন?
সর্বশেষ এডিট : ২৯ শে অক্টোবর, ২০১৮ রাত ৯:১১

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।


