
সোমা বিয়ের তিন মাস পর জানতে পারে তার ক্যান্সার হয়েছে।
সোমা খুবই দুঃখী একটা মেয়ে। তার মা মারা গেছে প্রায় দশ বছর হয়ে গেছে। তখন সে ইন্টারমিডিয়েট পড়ে। তার বাবা ছোট চাকরি করে- বাড়ি ভাড়া দিয়ে সংসারের খরচ চালাতেই হিমসিম খেতে হয়। সোমা সম্পূর্ন নিজের যোগ্যতায় মার্স্টাস পাশ করেছে। অনেক গুলো টিউশনি করে সে তার লেখাপড়ার খরচ চালিয়েছে। মামা চাচা ছাড়া নিজের যোগ্যতায় মার্স্টাস শেষ করার আগেই সে একটা ভালো চাকরি পেয়ে যায়। বেতন ৪০ হাজার টাকা। দেখতে দেখতে সোমা'র অনেক টাকা জমে যায় ব্যাংকে। তারপর সে বিয়ে করে। বিয়েতে অনেক টাকা খরচ হয়। সব তার নিজের জমানো টাকা। বিয়ের পর সোমা শ্বশুর বাড়ি চলে আসে। তার বাবা চলে যায় গ্রামের বাড়ি।
সোমার স্বামী রাতুল ভালো চাকরি করে। সে মানুষ হিসেবেও খুব ভালো। রাতুলের বাবা, মানে সোমার শ্বশুর খুব ভালো মানুষ। বিয়ের পরপর'ই সোমার গলায় সমস্যা দেখা দেয়। এবং কাকতালীয়ভাবে সেদিনই সোমার স্বামীর চাকরি চলে যায়। এদিকে ঢাকা শহরের বড় ডাক্তার সোমার গলায় কি সমস্যা তা ঠিক করে ধরতে পারেনি। একেরজন একেক কথা বলে। শেষে সোমা চেন্নাই যায়। সেখানে তার রোগ ধরা পড়ে। এ পর্যন্ত তিনবার চেন্নাই যেতে হয়েছে। একবার অপারেশন হয়েছে। পানির মতোন টাকা খরচ যাচ্ছে। ঢাকার স্কয়ার হাসপাতালে দুই লাখ টাকা চেয়েছে অপারেশন করার জন্য। চেন্নাইতে খরচ লেগেছে এক লাখ টাকা। প্রচুর দামী দামী ওষুধ লাগছে। অনেক টাকা খরচ। এদিকে সোমার হাত খালি, তার স্বামীর চাকরি চলে গেছে।
এবার চেন্নাই থেকে আসার পর আমি গেলাম সোমাদের বাসায়। সোমা শুকিয়ে গেছে। কালো হয়ে গেছে। কেমন রুগ্ন হয়ে গেছে। সোমার স্বামী রাতুলের মনও প্রচন্ড খারাপ। বিয়ে হয়েছে এক বছরও হয়নি। বেচারার চাকরি গেল। বউ অসুস্থ। কিন্তু রাতুল একজন ভালো মানুষ। সে তার স্ত্রীকে প্রচন্ড ভালোবাসে। অবশ্য রাতুলের বাবা বলেছেন- টাকা পয়সা নিয়ে তোমরা চিন্তা করো না। প্রয়োজনে আমি আমার গ্রামের বাড়ির সমস্ত জমিজমা বিক্রি করে দিব। সোমা আমাকে চা বানিয়ে খাওয়ালো। চমৎকার চা। এরকম চা সুরভি ছাড়া আর কেউ বানাতে পারবে না এ শহরে। আমি সোমা আর রাতুলকে ভরসা দিলাম। সাহস দিলাম। রাতুলের চাকরির জন্য আমি আমার পরিচিত বেশ কয়েক জাগায় সিভি দিয়েছি কিন্তু তারা কেউ'ই রাতুলের একটা চাকরির ব্যবস্থা করে দিতে পারেনি। কিন্তু আলাপের সময় মুখে-মুখে কত ভাব দেখিয়েছে, যেন একটা চাকরি কোনো ব্যাপারই না।
সোমা আর রাতুলের আবার চেন্নাই যেতে হবে ফেরুয়ারী মাসে। অসুস্থ মানুষ ট্রেনে-বাসে করে এত দূর যাওয়া সম্ভব না। প্লেনে করে যাতায়াত করতে অনেক খরচ। প্রথমে কলকাতা তারপর কলকাতা থেকে চেন্নাই। চেন্নাই গেলে এই টেষ্ট, সেই টেষ্ট করাতে করাতে সব মিলিয়ে কমপক্ষে পনের দিনের ধাক্কা। থাকা- খাওয়া। ওষুধ, হাসপাতালের খরচ। কি ধুমধাম করেই না তারা বিয়ে করেছিল। প্রথম থেকে শেষ পর্যন্ত সেই বিয়েতে আমিও ছিলাম। রাতুলের চাকরি নাই। সে নতুন চাকরির চেষ্টাও করতে পারছে না- সোমাকে নিয়ে ব্যস্ত থাকার কারনে। এদিকে সোমার চাকরিও যাই-যাই করছে। গত ছয় মাসে তিনবার যেতে হয়েছে চেন্নাই। পনের দিন করে মোট ৪৫ দিন ছুটি কাটিয়েছে। বাংলাদেশের কোনো বেসরকারি অফিস এতদিনের ছুটি মানবে না।
মানুষের জীবন বড় অদ্ভুত! জীবনের গল্প গুলো আরও বেশি অদ্ভুত। কখন কি ঘটে যায় আগে থেকে কেউ জানে না। সামান্য একটা ঘটনা ঘটে জীবনের মানচিত্র'ই বদলে দেয়। হাসি খুশি মানুষের মুখে পড়ে চিন্তার গভীর ছাপ। সুন্দর একটা পরিবার তছনছ হয়ে যায়। আশেপাশে এত এত মানুষ অথচ কেউ দেখে না, কেউ টের পায় না। অথবা সবাই দেখেও না দেখার ভান করে। রাতুলের জন্য বড্ড মায়া লাগে। বেচারা বিয়ে করে একটা বছরও বউ নিয়ে সুখে কাটতে পারলো না। এদিকে সোমা তার জীবন নিয়ে কঠিন সংগ্রামে লিপ্ত হয়েছে ছোটবেলা থেকেই। মাকে হারিয়ে এবং দরিদ্র বাবার কারনে টিউশনি করে নিজের লেখাপড়ার খরচ চালিয়ে জীবন যাপন করতে হয়েছে। জীবন সংগ্রাম চালিয়ে এত দূর আসার পরও আরো সংগ্রাম অপেক্ষা করছে তাদের জন্য।

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।

