
তুমি যদি রজনীগন্ধা ফুল হতে,
তবে আমার জানালার পাশে রেখে দিতাম
সারারাত তুমি গন্ধ ছড়াতে, আমি ঘুমিয়ে পরতাম
তবুও তুমি গন্ধ ছড়াতে।
হিমির সাথে আমার শেষ দেখা হয়েছিল বিশ বছর আগে।
গত কিছু দিন ধরে হিমির কথা খুব মনে পড়ছে। হিমি খুব সুন্দর মেয়ে ছিলো। হাসিটা ভীষন মায়া-মায়া। মাথা ভর্তি চুল ছিল। সহজ সরল একটি মেয়ে হিমি। চোখে কাজল দিলে এত সুন্দর লাগতো যে মনে হতো হিমি এই পৃথিবীর কেউ না। অন্য কোনো ভুবন থেকে এসেছে। এই মেয়েটার সাথে টানা এক বছর আমার খুব মধুর সম্পর্ক ছিলো। সেই সময় আমার জীবনের শ্রেষ্ঠ সময়। আজও আমি হিমিকে খুব মিস করি। ইদানিং হিমির কথা খুব বেশি মনে পড়ছে।
সুদীপ স্যারের কাছে ফিজিক্স পড়তে গিয়েই হিমির সাথে পরিচয়।
সপ্তাহে দুই দিন সুদীপ স্যারের বাসায় আমরা পড়তে যেতাম। আমি খুব সহজ সরল ছিলাম। দুষ্ট ছেলেদের সাথে মিশতাম না। দুষ্ট ছেলেদের সাথে মিশতে আমাকে আমার মা মানা করে নি। নিজের থেকেই মিশতাম না। সমস্ত মন্দ থেকেই দূরে থাকতে চাইতাম। মেয়েদের দিকে হা করে তাকিয়ে থাকতাম না। মন দিয়ে পড়তাম। অবশ্য সে সময় আমি প্রেম ভালোবাসা বুঝতাম না। এমন কি প্রেম ভালোবাসা শব্দটা উচ্চারন পর্যন্ত করতাম না। হিমির সাথে আমার সম্পর্কটা প্রেম ভালোবাসা টাইপ না। তবে তার চেয়ে বেশি। তার চেয়ে বড়। স্বচ্ছ পবিত্র সম্পর্ক।
হিমির কথা লিখতে গিয়ে অনুভব করছি আমার ভালো লাগছে।
কেমন এক অজানা, অচেনা আনন্দ পাচ্ছি। অন্য রকম এক ভালো লাগায় মনটা ভরে যাচ্ছে। এই লেখা হয়তো কোনো দিন হিমির চোখে পড়বে না। হিমি তার সংসার নিয়ে আজ ভীষন ব্যস্ত। স্বামী আর দুইটা ছেলে নিয়ে হিমির খুব সুন্দর সাজানো গুছানো সংসার। এই তো কিছু দিন আগে হিমির স্বামী নতুন একটা গাড়ি কিনলো। ঘটনা চক্রে সেদিন এক পুরোনো বন্ধুর সাথে দেখা। বন্ধুর নাম রফিক। রফিকও আমাদের সাথে পড়তো। সে এখন অস্ট্রেলিয়া থাকে। ছুটিতে দেশে এসেছে। তার কাছ থেকেই হিমির সমস্ত খবর পেলাম। হিমির ছবি দেখলাম। এরপর থেকেই হিমির কথা বারে বারে মনে পড়ছে।
একদিন হিমি সকালে আমার বাসায় এসেছিলো।
তখন আমি গভীর ঘুমে। হিমি এসে আমাকে ঘুম থেকে ডেকে তুললো। বলল, উঠো পড়তে যাবে না? ঘুম থেকে উঠেই সেদিন হিমিকে দেখে এত আনন্দ লাগলো। ইচ্ছা করলো হিমিকে জড়িয়ে ধরি। ইচ্ছাটা হয়তো অন্যায় ইচ্ছা। কিন্তু আমার এই ইচ্ছার মধ্যে কোনো মন্দ কিছু ছিলো না। পবিত্র একটা ইচ্ছা। মা নাস্তা দিলো। আমরা দু'জনে নাস্তা খেয়ে তাড়াতাড়ি পড়তে চলে গেলাম। স্যার আমাদের এক ঘন্টা পড়াতেন। কিন্তু আমার ইচ্ছা হতো স্যার আমাদের সারাদিন পড়াক। তাহলে হিমির সাথে থাকতে পারবো। হিমির সাথে থাকতে আমার ভালো লাগতো।
একদিন দুপুরবেলা হিমির বাসায় গেলাম।
খুব সুন্দর সাজানো গুছানো বাসা ওদের। ওর মা-বাবা, ভাই-বোনরা সবাই খুব ভালো মানুষ। সেদিন হিমির বাসায় গিয়ে আমি অবাক। হিমি খুব সুন্দর একটা জামা পরেছে। মাথা ভর্তি চুল গুলো খোলা। খুব সুন্দর লাগছিল। আমি এক আকাশ অবাক চোখে তাকিয়ে ছিলাম। হিমি বলল, এভাবে তাকিয়ে আছে কেন? আমি বললাম, তোমার চুল গুলো একটু ছুঁয়ে দেখি? হিমি হাসলো। খুব সুন্দর হাসি। এরকম হাসি দেখে-দেখে একটা জীবন পার করে দেওয়া সম্ভব। আর কোনোদিন কি সুযোগ হবে হিমির চুল ছুঁয়ে দেখার?
হিমির একটা ছবি দীর্ঘদিন আমার ম্যানিব্যাগে ছিল।
আমার খুব মন খারাপ হলে আমি ছবিটা বের করে দেখতাম। শাড়ি পড়া ছবি। চোখে মোটা করে কাজল দেওয়া। কপালে একটা টিপ আর দুই হাত ভর্তি কাঁচের চুড়ি। ছবিটা দেখলেই মনে হতো হিমি আমার দিকে তাকিয়ে আছে। আমাকে দেখছে। তাই আমি কোনো মন্দ কাজ করতে পারবো না। মন্দ কাজ করলেই হিমি ভীষন কষ্ট পাবে। হিমিকে তো আমি কষ্ট দিতে পারি না। সেই সময় আমার দুনিয়াতে হিমি এবং আমার লেখাপড়া ছাড়া আর কিছুই ছিলো না। বারবার মনে হতো হিমির জন্য হলেও আমাকে ভালো করে লেখাপড়া করতে হবে। ভালো রেজাল্ট করতে হবে। তাতে হিমি খুশি হবে।
একদিন বাসায় আমি একা।
আকাশ ভরা মেঘ। বিকেলবেলা। হুট করে হিমি এসে হাজির। অপ্রাত্যাশিত আনন্দ! এই রকম সময়ে হিমি আগে কখনও আমাদের বাসায় আসেনি। হিমিকে দেখে আমি ভীষন অবাক। তবে প্রচন্ড খুশি। তখন মোবাইল ফোন ছিলো না। তবে টিএনটি ফোন ছিলো। তবে আমাদের ফোনে খুব একটা কথা হতো না। কারন প্রায় প্রতিদিনই নানান উছিলায় আমাদের দেখা হতো। যাই হোক, হিমিকে নিয়ে আমি বেলকনিতে বসলাম। সাথে সাথে ঝুম বৃষ্টি শুরু হলো। আমরা নানান বিষয় নিয়ে গল্প করলাম। হিমি চার লাইন গান গেয়ে শুনালো রবীন্দ্রনাথের। গান শেষে হিমির চোখে জল দেখলাম।
আমার বেলা যে যায় সাঁঝ-বেলাতে
তোমার সুরে সুরে সুর মেলাতে।
একতারাটির একটি তারে গানের বেদন বইতে নারে
তোমার সাথে বারে বারে হার মেনেছি এই খেলাতে
তোমার সুরে সুরে সুর মেলাতে।
সর্বশেষ এডিট : ১৯ শে ডিসেম্বর, ২০১৯ বিকাল ৪:৫৮

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।


