
মায়ের বয়স প্রায় ৫৬ বছর।
উনার চার ছেলে। কোনো মেয়ে নাই। তার সব ছেলেরাই চাকরি করছে। ঢাকা শহরে উনার নিজেদের পাঁচ তলা বাড়ি। বাড়ির দেখভাল উনিই করেন। দেখভাল মানে বিদ্যুৎ, পানি, গ্যাস বিল বা সিটি করপোরেশন ইত্যাদি উনিই দেখাশোনা করেন। উনার ছেলেরা চাইলেও উনি তাদের বাড়ির কাজে হাত বাড়াতে দেন না। উনার বড় ছেলে বলে- মা তুমি লাইনে দাঁড়িয়ে বিল দিতে যাও কেন? অনলাইনেই বিল দিয়ে দেওয়া যায়। কিন্তু মা নিজেই বিল দেন। বাড়ির সমস্ত হিসাব তার কাছে। এবং তিনি তা সুন্দরভাবে পালন করছেন। উনি মনে করেন উনার ছেলেরা বোকা।
এই মা একজন সুখী মানুষ।
অথচ উনি খুঁজে খুঁজে সমস্যা বের করেন। এই সমস্যা গুলো নিয়ে উনি ভীষন ব্যস্ত থাকেন। সমস্যা গুলো নিয়ে চিন্তা-চিন্তা করে টেনশন বাড়ান। শেষে ডাক্তারের কাছে যেতে হয়। উনি সব সময় সরকারী হাসপাতালে যান। অথচ উনি চিকিৎসার জন্য দেশের সেরা হাসপাতালে যেতে পারেন। উন্নত হাসপাতালে চিকিৎসা নেওয়ার জন্য তার টাকাও খরচ হবে না। বড় ছেলের অফিস থেকে সমস্ত খরচ দিবে। তবুও উনি সরকারী হাসপাতালে যান। নিয়মিত যান। সরকারী হাসপাতাল তার কাছে ভালো লাগে। উনি জানেন ঢাকা শহরে কোথায় কোন হাসপাতালে কোন অসুখের জন্য যেতে হবে। তার ছেলে বলে, বাইরে গেলে গাড়ি নিয়ে যেও। কিন্তু উনি গাড়ি নিবেন না। উনি বাসেই যাবেন।
উনার ছেলেদের উনি বলেন, বাপের বাড়ি যাই।
বাপের বাড়ি মানে? মায়ের কাছে বাপের বাড়ি হলো সরকারী হাসপাতাল। হাসপাতালের নিয়ম কানুন উনার সব জানা। এমনকি হাসপালাতের ডাক্তার, নার্স, ওয়ার্ড বয় সবাই উনাকে চিনেন। উনার শরীর খারাপ না হলেও উনি রোগ খুঁজে খুঁজে বের করেন। তারপর হাসপাতালে যান। উনার কোনো ওষুধ টাকা দিয়ে কিনতেও হয় না। সরকারী হাসপাতাল থেকেই উনি ফ্রি ওষুধ পান। প্রতিমাসে নানান রকম টেস্ট করান সরকারী হাসপাতালে। গত ত্রিশ বছর ধরে উনি নিয়মিত ওষুধ খেয়েই যাচ্ছেন। বাসায় মানুষ এলে যদি উনাকে জিজ্ঞেস করেন, কেমন আছেন? তখন উনি উনার ওষুধের বাক্স বের করে দেখান। দেখেন আমি কত অসুস্থ। প্রতিদিন এত গুলো করে ওষুধ খেতে হয়। তখন তার চোখে মুখে একটা তৃপ্তির ভাব থাকে।
উনার স্বামী উনার সাথে থাকেন না।
গত তের বছর ধরে স্বামী আলাদা থাকেন। স্বামী বলেন, এই মহিলার সাথে থাকা আমার পক্ষে সম্ভব না। উনার সাথে থাকার চেয়ে জঙ্গলে গিয়ে থাকাও অনেক ভালো। তবে ছেলেরা বাপের সাথে সম্পর্ক বজায় রেখেছে। বাবার সাথে গিয়ে দেখা করে আসে। নিয়মিত মোবাইলে কথাবার্তা বলছে। এই মা তার চার সন্তানকে সমান চোখে দেখেন না। যে ছেলে বেশি ইনকাম করে এবং যে ছেলে তাকে বেশি টাকা দেয় তাকে উনি বেশি ভালোবাসেন। অবশ্য উনি দাবী করেন উনি তার চার সন্তানকেই সমান চোখে দেখেন। এই মা সারাদিন শুয়ে বসে মুভি, নাটক, ক্রাইম পেট্রোল ইত্যাদি দেখেন। তার রান্না করার কোনো চিন্তা নাই। তার ছেলের বউরা তিনবেলা যথাসময়ে তাকে খাবার দিয়ে যান।
এই মাকে তার ছেলের বউরা দুই চক্ষে দেখতে পারে না।
এবং উনিও উনার ছেলের বউদের দুই চক্ষে দেখতে পারেন না। মা সুযোগ পেলেই বাইরের মানুষদের কাছে তার ছেলের বউদের বদনাম করতেই থাকে। কারো সাথে উনি গল্প করা মানে বউদের বদনাম করা। অথচ উনার শরীর খারাপ হলে এই বউরাই দৌড়ে আসেন। কেউ পা টিপে দেয়, কেউ মাথা,অথবা কেউ স্যুপ তৈরি করে দেয়। এই মায়ের তার চার সন্তান ছাড়া দুনিয়াতে আর কেউ নেই। সন্তানরা মাকে অনেক ভালোবাসেন। মা একটু অসুস্থ হলেই সন্তানরা অস্থির হয়ে যায়। প্রতিদিন ছেলেরা সকালে অফিসে যাওয়ার পথে এবং রাতে বাসায় ফিরে মায়ের সাথে দেখা করে যায়।
সর্বশেষ এডিট : ২০ শে ডিসেম্বর, ২০১৯ বিকাল ৪:৫৮

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।


