
মেয়েটার নাম তাইয়্যেবা।
তাইয়্যেবার বয়স আজ দেড় মাস হলো। তাইয়্যেবা রোজ আমাদের বাসায় আসে। সারাদিন থাকে। তাইয়্যেবাকে পেয়ে আমরা সবাই ভীষন খুশি। পরী তাইয়্যেবাকে পেয়ে ভীষন খুশি। তার খুশির শেষ নেই। জীবন্ত একটা খেলনা পেয়েছে যেন! সে স্কুল থেকে এসেই সারাক্ষন তাইয়্যেবাকে নিয়ে থাকে। এখন সে দুপুরে ঘুমায়ও না, তাইয়্যেবাকেও ঘুমাতে দেয় না। সন্ধ্যায় তাইয়্যেবার বাব-মা এসে তাইয়্যেবাকে নিয়ে যায়। তাইয়্যেবার বাবা মা দুই'জনই চাকরী করে। তাইয়্যেবার মা দুপুরে লাঞ্চ টাইমে এসে একবার দুধ খাইয়ে যায়। আর ছোট বোতলে দুধ রেখে যায়। আমরা একটু পরপর তাইয়্যেবাকে ছোট বোতল থেকে দুধ খাওয়াই। তাইয়্যেবা অন্য সব বাচ্চাদের মতো সারাক্ষণ কান্না করে না। এমন কি গোসল করানোর সময়ও কান্না করে না। বরং সবার দিকে চেয়ে মিষ্টি করে হাসি দেয়। এবং বুঝিয়ে দেয় গোছলটা আমি উপভোগ করছি।
তাইয়্যেবা আমাদের আত্মীয়।
লতায় পাতায় দূরের আত্মীয়। আমি বুঝি না- এত ছোট বাচ্চাকে রেখে চাকরি করার দরকারটা কি? তাইয়্যেবার বাবা ভালো চাকরি করে। আর্থিক সমস্যা নেই। দুধের বাচ্চা রেখে একজন মা কিভাবে চাকরি করে? বাচ্চাটা এতই ছোট যে তাকে মার বুকের দুধ ছাড়া অন্য কিছু খাওয়ানো যাবে না। এই মা কিভাবে পারে এত ছোট বাচ্চাকে রেখে চাকরি করতে? বাচ্চাটা একটু বড় হোক তারপর চাকরি করুক। আমি বাচ্চাদের খুব ভালোবাসি। প্রচন্ড ভালোবাসি। তাইয়্যেবা যখন হাসে আমার খুব আনন্দ নয়। ইচ্ছা করে পৃথিবীর সমস্ত আনন্দ গুলো ওর হাতে তুলে দেই। আর পৃথিবীর সমস্ত খারাপ গুলো থেকে বাচ্চাদের আগলে রাখি। ছোট ছোট বাচ্চাদের জন্যই এই নোংরা পৃথিবীতে আমার অনেকদিন বেঁচে থাকতে ইচ্ছা করে।
সুরভি এবং আমার ভাবী তাইয়্যেবার যথেষ্ঠ খেয়াল রাখে।
গোছল করিয়ে দেয়। কোলে করে ঘুম পাড়ায়। খাওয়ায়। আমি ঘুমন্ত তাইয়্যেবার পাশে চুপ করে বসে থাকি। ঘুমের মধ্যে তাইয়্যেবা মাঝে মাঝে হাসে। ঘুমন্ত তাইয়্যেবার হাসি একদম আমার বুকে এসে লাগে। যেন দেবশিশু হাসছে! মনে হয় এরকম সুন্দর দৃশ্য দুনিয়াতে আর নেই। ঘুমের মধ্যেই মাঝে মাঝে তাইয়্যেবা কান্নার মতো মুখ করে- তখন আমার কষ্ট হয়। ঘুমের মধ্যে দুধের বোতল তাইয়্যেবার মুখে ধরলে সে দুধ খায়। ঘুম এবং খাওয়া একসাথে! মুখ থেকে দুধের বোতল সরিয়ে নিলে- মন খারাপ করে। তাইয়্যেবা বেশ চালাক মেয়ে। দুধের বোতল তার মুখ থেকে সরিয়ে চুসনি দিলে সঙ্গে সঙ্গে সে বুঝে যায়। সে মুখ থেকে চুসনি ফেলে দেয়। এবং দুধের বোতলের বদলে চুসনি দেওয়াতে সে রাগ করে, বিরক্ত হয়।
আজকের ঘটনা।
বিকেলে তাইয়্যেবার ছোট বোতলের দুধ শেষ। অথচ দুধ শেষ হওয়ার কথা সন্ধ্যায়। তখন তার মা-ও আসে। সন্ধ্যা ছয়টায় তাইয়্যেবার ঘুম ভেঙ্গেছে। সে সিস দিয়েছে, পটি করেছে। ঘুম থেকে উঠার পর তাইয়্যেবার ক্ষুধা পেয়েছে। ক্ষুধায় বাচ্চাটা কাঁদছে। খুব কাঁদছে। এদিকে বোতলের দুধ শেষ। তাইয়্যেবা সমানে কেঁদেই যাচ্ছে। এত ছোট বাচ্চা ক্ষুধা সহ্য করতে পারে? আমি নিজেই তো ক্ষুধা সহ্য করতে পারি না। আমি সাথে সাথে তাইয়্যেবার মাকে ফোন দিলাম। বললাম, তাইয়্যেবার দুধ শেষ। ক্ষুধায় কাঁদছে। তাইয়্যেবার মা বলল, আমি আসছি ভাইয়া। এক ঘন্টা পার হয়ে যায় তাইয়্যেবার মা আসে না। বাবাও আসে না। ক্ষুধার জ্বালায় মেয়েটা সমানে কেঁদেই যাচ্ছে। তাইয়্যেবার কান্না বন্ধ করার জন্য তার মুখে চুসনি দেই, সে মুখ থেকে চুসনি ফেলে দেয়। এদিকে আজ বাসায় সুরভি নেই। ভয়াবহ অবস্থা। বাসায় শুধু আমি আর পরী।
দেড় ঘন্টা পার হয়ে গেছে।
তাইয়্যেবার মাকে আবার ফোন দিলাম। বলল, রাস্তায় জ্যামে পড়েছি ভাইয়া। কিছুক্ষনের মধ্যে চলে আসবে। এদিকে তাইয়্যেবা প্রচন্ড কেঁদে যাচ্ছে। ক্ষুধায় ছটফট করছে। তাইয়্যেবার কষ্ট দেখে আমার বুকের ভিতরটা দুমড়ে মুচড়ে যাচ্ছে। ৪৫ দিনের একটা শিশু বাচ্চা ক্ষুধায় কষ্ট করছে এটা কি সহ্য করা যায়? কারো পক্ষে সম্ভব? বাধ্য হয়ে আমি দুধের বোতলে পানি দিয়ে তাইয়্যেবাকে পানি খাওয়ালাম। বেচারি পাগলের মতো সবটুকু পানি খেয়ে নিলো। ঘরে তো খাবারের অভাব নেই। কিন্তু এই ছোট বাচ্চার জন্য কোনো খাবার নেই। গতকাল বাসায় মেহমান এসেছিলো। সুরভি নানান পদের খাবার রান্না করেছে। অথচ আমি তাইয়্যেবাকে কিছুই খাওয়াতে পারছি না। একবার মনে হলো ডানো দুধ গরম করে খাইয়ে দেই। পরীকে জিজ্ঞেস করলাম, কি করি বল তো? পরী বলল, একটু সাদা ভাত লবন দিয়ে মেখে খাইয়ে দাও বিসমিল্লাহ বলে।
তাইয়্যেবা পানি খেয়ে কাঁদতে কাঁদতে ঘুমিয়ে পরেছে।
রাত সাড়ে নয়টায় তাইয়্যেবার বাবা মা এসেছে। আমার প্রচন্ড রাগ লাগছে। ইচ্ছা করছে দুইটাকে ধরে কিছুক্ষন পিটাই। আমি বললাম, মেয়েটার আজ ভীষন কষ্ট হয়েছে। ক্ষুধায় কাঁদতে কাঁদতে মেয়েটা ঘুমিয়ে গেছে। আপনি চাকরিটা ছেড়ে দেন। মেয়েটা বড় হোক, তারপর চাকরি করবেন। এমন না যে আপনার সংসারে অভাব। চাকরি না করে উপায় নাই। তাইয়্যেবার মা আমার কথায় খুব রাগ করলো। বলল, আপনাদের বাসায় আমার বাচ্চা আর রাখব না। গত কয়েদিনে তাইয়্যেবার উপর খুব মায়া পড়ে গেছে। ভাবতেই কষ্ট হচ্ছে, আগামীকাল মেয়েটা আমাদের বাসায় আসবে না। কোলে নিতে পারনো না। তাইয়্যেবার পবিত্র হাসি মুখ দেখতে পাবো না! বুকে জড়িয়ে ধরতে পারবো না। ভীষন কষ্ট লাগছে। ভীষন।
আমার প্রার্থনা একটাই-
পৃথিবীর সমস্ত তাইয়্যেবারা ভালো থাকুক। সুস্থ থাকুক। বাবা-মাকে কাছে পাক। ক্ষুধার সময় যেন দুধ পায়। পানি যেন না খেতে হয়। হে প্রভু, হে মঙ্গলময় মহান প্রভু পৃথিবীর সমস্ত শিশুদের তুমি কষ্ট দিও না। ভালো রাখো। আনন্দ রাখে।

সর্বশেষ এডিট : ০৫ ই মার্চ, ২০২০ রাত ১১:৪৬

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।



