
কিছু মানুষের মধ্যে কুসংস্কার আছে।
আমরা আধুনিক যুগে বাস করলেও এই যুগের সবাই আধুনিক নয়। অথচ সবার হাতে হাতে থাকে স্মার্ট ফোন। লক্ষী ও অলক্ষী শব্দ দু'টা সবাই ই জানেন। ছেলেদের ক্ষেত্রে সাধারনত লক্ষী ও অলক্ষী ব্যবহার হয় না। লক্ষী ও অলক্ষী শব্দ দুইটি শুধু মেয়েদের বেলায় ব্যবহার হয়। অনেকেই বলেন, তুমি একটা অলক্ষী। অলক্ষী মেয়ে। দোকানদাররা দোকানে পানি ছিটিয়ে বলেন, আয় আয় লক্ষী আয়। যে মেয়ে স্বামীর সংসার করতে পারে না তাকে অলক্ষী বলা হয়। বাচ্চা কাচ্চা না হলে অনেক আকথা কুথা শুনতে হয়। সব কিছুই মেয়েদের দোষ। দেশ সমাজ এইভাবেই চলছে। এদিকে ধর্মে পাওয়া যায় অলক্ষ্মী একজন হিন্দু দেবী। অলক্ষ্মী অমঙ্গল ও অশুভের প্রতীক। অলক্ষ্মীর যে রূপ পুরাণে বর্ণিত রয়েছে, তা মোটেই সুবিধের নয়। তিনি রীতিমতো কুরূপা। যেসব মেয়ের লক্ষ্য ঠিক থাকে এবং যারা ধার্মিক হয় তাদেরকে লক্ষী রূপে মানা হয়। কিন্তু যে সব মেয়েরা এর বিপরীত ভাবে চলে তাদেরকে অলক্ষী বলা হয়।
আজ বলব চানমনি আপার জীবনের গল্প।
চানমনি আপা আমাদের পাশের বাসায় থাকতেন। সা্রাদিন আপা টিউশনি করে বেড়াতেন। তার টাকাতেই তাদের সংসার চলতো। তার চার ভাই আছে। ভাইয়েরা কেউ কিছু করে না। চার ভাইয়ের মধ্যে দুই ভাই আবার নেশাপানি করে। চানমনি আপার বিয়ের বয়স পার হয়ে যাচ্ছে। অথচ তিনি সারাদিন বাড়ি বাড়ি টিউশনি করে বেড়ান। প্রচুর পরিশ্রম করেন। চানমনি আপা দেখতে সুন্দর না। কালো করে। চোখ মুখ রুক্ষ। নাক মোটা। কোনো ছেলে কোনোদিন তাকে প্রেম নিবেদন করে নাই। চানমনি আপাকে আমার ভালো লাগতো। রাস্তায় দেখা হলেই হাসি মুখে জানতে চাইতেন- আমি কেমন আছি। লেখাপড়া কেমন চলছে। মা কেমন আছে? চানমনি আপা কালো হলেও তার সিটা বেশ মিষ্টি। এখনও তার হাসি মুখ আমার মাঝে মাঝে মনে পড়ে। তার মতো আমার একটা বোনও থাকতে পারতো। আমার কোনো বোন নেই। আমরা চার ভাই।
একদিন চানমনি আপার বিয়ে ঠিক হলো।
বিয়ে ঠিক করলেন তার মামা। পাড়া প্রতিবেশিরা বেশ অবাক। যাই হোক, বিয়ের অনুষ্ঠানে আমি গিয়েছি। রান্না বেশ ভালো হয়েছে। আরাম করে খুব খেয়েছি। চানমনি আপাকে দেখলাম মুখে একগাদা পাউডার মেখে স্টেজে বসে আছেন। তাকে বেশ খুশি খুশি মনে হলো। তার স্বামীকেও দেখলাম। মধ্য বয়সের একজন লোক। আগে হয়তো একটা বিয়ে হয়েছে। চেহারার মধ্যে কোনো মায়ামমতা নেই। যাই হোক, চানমনি আপার বিয়ের এক বছর পার হয়ে গেলো। এর মধ্যে আমি দুই একবার চানমনি আপার শ্বশুর বাড়ি গিয়েছি। আমাকে বেশ খাতির করেছেন আপা। যেন আমি তার মার পেটের আপন ভাই। যদিও আপাকে দেখে মনে হলো- তিনি ভালো নেই। মোটেও ভালো নেই। এদিকে চানমনি আপা বিয়ে করে চলে যাবার পর তাদের সংসার কোনো রকমে চলছে। তার ভাইয়েরা বিয়ে করেছে। তারা কোনো রকমে খেয়ে পড়ে বেচে আছে।
একদিন কান্না করতে করতে চানমনি আপা তার বাপের বাড়ি ফিরে এলেন।
তার স্বামী তাকে চলে যেতে বলেছেন। তার সাথে আর বসবাস করবেন না। না, তার স্বামী তাকে মারে নি। বকেও নি। শুধু দুই হাত জোড় করে বলেছে- তুমি চলে যাও। তোমার সাথে থাকতে আমার ভালো লাগে না। প্লীজ তুমি চলে। এই যে আমি তোমার পায়ে ধরেছি। যাও যাও। তোমাকে আমার ভালো লাগে না। তারপর স্বামী বেচারা খুব কান্নাকাটি করলো। স্বামীকে বুঝাতে চানমনি আপা ব্যর্থ হয়েছেন। চানমনি আপা একদিন আমাদের বাসায় আসেন। আমার মায়ের সাথে তার অনেক কথা হয়। চানমনি আপা বললেন, ঘরসংসার করা আমার জীবনের সবচেয়ে বড় স্বপ্ন ছিলো। সেই ঘর সংসারই করতে পারলাম না। কত না চেষ্টা করলাম সংসারটা টিকিয়ে রাখতে কিন্তু পারলাম না। আমার স্বামী মানুষটা খারাপ না। একটা বছর তো খুব ভালো সংসার করলাম। জান জীবন দিয়ে সারাদিন সংসারের কাজ করতাম। স্বামীকে খুশি রাখতে চেষ্টা করতাম। সারাক্ষন মুগ্ধ চোখে স্বামীর দিকে তাকিয়ে থাকতাম। রাতে স্বামীর পা টিপে দিতাম। নিজের শাড়ির আচল দিয়ে জুতো মুছে দিতাম। এমন কি জুতো কালিও করে দিতাম। তবু মানুষটা আমাকে রাখলো না।
একদিন চানমনি আপার স্বামীর সাথে আমার দেখা।
উনি দেখে আমাকে চিনলেন, আমিও উনাকে চিনলাম। আমি কিছু বলার আগেই উনি বললেন, ছোট ভাই শোনো- চানমনিকে আমি খারাপ বলব না। বড্ড প্রানশক্তি মেয়েটার। সারাক্ষন তার একটাই চেষ্টা থাকতো আমাকে খূশি করার। তার কান্ডকারখানাতে আমি প্রচন্ড বিরক্ত হতাম। মনে মনে ওকে অসংখ্যবার কুৎসিত সব গালি দিতাম। ওর হাতের রান্না মজা না। ওর কামকাজ বড্ড এলোমেলো অগোছালো। এবং পুরা কুফা বা অলক্ষী একটা মেয়ে। আমি ওর সাথে একবছর থেকেছি আমি জানি ও কতটা অলক্ষী। সকালে ঘুম থেকে উঠে ওর মুখ দেখলে আমার দিনটাই মাটি যেত। বাচ্চা হয় না। দুইবার প্রেগনেন্ট হয়েছে দুইবারই মিস ক্যারেজ হয়েছে। অসুখ বিসুখ দিয়ে ভরা শরীরে। চিকিতসার পেছনে অনেক টাকা ব্যয় করেছি। ওর গায়ে বিছছিরি গন্ধ। এজন্য আমার সহবাসও করতে ইচ্ছা করতো না। কতদিন বলেছি তোমার গায়ে বাজে গন্ধ। এমনকি তোমার মুখেও গন্ধ। দাত ব্রাশ করো না? এরকম অসংখ্য দোষ ত্রুটি আছে যা বলে শেষ করা যাবে না। দেখো ছোট ভাই- আমি চানমনিকে ছেড়ে দিয়েছি কিন্তু আমি আরেকটা বিয়ে করি নি। আমি দুষ্টলোক হলে সাথে সাথে আরেকটা বিয়ে করে নিতাম। আমি বিয়ে করি নি। বিয়ের ঝামেলায় আমি আর যাবো না। আমার শিক্ষা হয়ে গেছে। একটা ভাত টিপলেই হাড়িত সব ভাতের খবর পাওয়া যায়।
আমি চানমনি আপাকে কিছুই বলি নাই।
তার স্বামীর সাথে দেখা হয়েছে। কি কি কথা হয়েছে। কিছুই বলি নাই। এগুলো বলা আমার পক্ষে সম্ভব না। অবশ্য তাকে বলার মতো সময়ও পাই নি। একদিন সকালে ঘুম থেকে উঠে শুনি চানমনি আপা মারা গেছেন। কি একটা অসুখ হয়েছে। তার ভাইয়েরা টাকার অভাবে চিকিতসা করাতে পারে নি। অনেকদিন রোগে ভূগে চানমনি আপা মারা গেলেন। আমি তাকে মাটি দিতে কবরস্থানে গিয়েছি। আসলে মানব জীবন এই রকমই কেউ কেউ জীবন এক ফোটা সুখও পায় না। দুঃখে কষ্টে জীবন পার করে। স্বামী অলক্ষী বলে ঘর থেকে বের করে দেয়। একটা মেয়ে সারাদিন ঘরের কাজ করলে গায়ে ঘামের গন্ধ হতেই পারে। সামান্য কাচা পেয়াজ খেলেও মুখে কেমন একটা গন্ধ হয়। এক মিনিট দাত ব্রাশ করলেই মুখে আর গন্ধ থাকে না। যে কোনো মানুষের অসুখ বিসুখ হতেই পারে। মিস ক্যারেজ হতেই পারে। এটা একটা স্বাভাবিক ঘটনা। একটা মানুষের রান্না সব সময় ভালো নাও হতে পারে। স্ত্রীর সাথে সহবাস করতে ইচ্ছা করে না- কার সাথে সহবাস করতে ইচ্ছা করে?

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।

