
(এই লেখাটি আমার নয়। এটা লিখেছেন আমার শ্বশুরমশাই। তার অনুমতি নিয়েই লেখাটি ব্লগে দিলাম।)
আমার জেল জীবনের কিছু ঘটনা বলা অপরিহার্য হওয়ায় আবার পিছনে ফিরে গেলাম। জেলখানায় যারা বিভিন্ন সেলে ভারবাঁশে বহন করে পানি সরবরাহ করত তাদের জেলের প্রচলিত ভাষায় জ্বলপরি বলা হত। আসলে শব্দটি ছিল জ্বলভরি। প্রত্যহ খুব সকালে তারা সেলসমুহে পানি সরবরাহ করত। ঐ পানি দিয়ে গোসল, বাথরুম, খাওয়া-দাওয়ার সকল কাজ করতে হতো। যদিও আমি আমার রুমমেটদের কল্যানে মিনারেল সুপিয় পানি পান করতাম।
একদা রাত আনুমানিক ১০ টায় আইজি প্রিজন লিয়াকত সাহেব তার ব্যক্তিগত মিয়াসাব (জেল পুলিশ) কে আমার কাছে এক টুকরো কাগজ ও কলম দিয়ে পাঠালেন। মিয়াসাব বলল, স্যার বলেছেন, আপনার কিছু লাগবে কি না বা কোন সমস্যা আছে কিনা লিখে দিতে।আমি ওকে বললাম, ধন্যবাদ। আমি ভাল আছি, আমার কিচ্ছু লাগবে না, আইজি সাহেবকে বলবে। মিয়াসাব নাছোড়বান্দা, সে বলল, এই কথাই লিখে দেন। নচেৎ আমার চাকুরী থাকবে না। অকথ্য বাধ্য হয়ে ওর স্বার্থে আমি দু' কলম লিখে দিলাম। পরে জানতে পারি জনাব মাহবুবুর রহমান (সাবেক মন্ত্রী, জাপা) এর ঘনিষ্ট বন্ধু ছিলেন আইজি প্রিজন। তার অনুরোধেই আমার খোঁজ নিয়েছেন তিনি।
কয়েকদিন পরের কথা- খুব সকালে জানা গেল আইজি প্রিজন সাহেব জেলখানা পরিদর্শন করবেন। সকল সেল সমুহ ও আশপাশ সুন্দর ভাবে পরিস্কার পরিচ্ছন্ন করা হলো। কাঁটায় কাঁটায় সকাল সাড়ে দশটায় পনের সেলের আমার কক্ষে হাজির হলেন জনাব আইজি প্রিজন, একে একে সকলের নাম জিজ্ঞেস করলেন। সর্বশেষ আমাকে নাম জিজ্ঞেস করার সাথে সাথে স্মিত হেসে বললেন, আপনি ভালো আছেন? কোন অসুবিধা নেই তো। আমি বললাম নাহ, কোন অসুবিধা নেই। প্রসঙ্গক্রমে উল্লেখ করা প্রয়োজন, আইজি প্রিজন যখন জেল ভিজিটে যান, তখন সকল বন্দী তটস্থ থাকে। কারন তিনি একটা বিশাল লাঠিয়াল বাহিনী সমেত তল্লাশি করেন। কেউ জেল কোড অনুসারে চলে কিনা, কারো কাছে টাকাপয়সা আছে কিনা ইত্যাদি, জেল কোডের বাহিরে কিছু পাওয়া গেলে সাথে সাথে শাস্তির ব্যবস্হা। কিন্তু আমার রুমমেটগন এ বিষয়ে যথেষ্ট সজাগ থাকায় সকলেই তাদের টাকাপয়সা আমার কাছে রাখলো এবং বলল, আপনাকে ওরা চেক করবে না। এর আগেই আমি বলেছি কারা আমার রুমমেট। তথাপিও পুনশ্চঃ লিখলাম, সুভ্রত বাইন, নাটকা বাবু ও মগবাজারের শীর্ষ সন্ত্রাসী টিক্কা। আমার কল্যানে সেদিন ওরা ঘর ও দেহ তল্লাশি হতে রক্ষা পেল এবং আইজি প্রিজন যাওয়ার পর আমাকে ওরা উচ্ছ্বসিত প্রসংশায় ভাসালো।
আগেই বলেছি, আমাদের বিরুদ্ধে দায়ের করা পাঁচটি মামলা মহামান্য হাইকোর্ট থেকে জামিন হওয়ায় জেল থেকে মুক্তির আর কোন আইনগত বাঁধা রইলো না। সেদিন ২২ শে সেপ্টেম্বর ১৯৯৯ সকালের ভোর আমাদের জীবনে নতুন সুর্যের উদয় হলো, সুনসান জেল নিরবতার মাঝেও আমার সহকর্মীরা তাদের মুক্তির সুসংবাদ পেলেও আমি সে সংবাদ থেকে বন্ঞ্চিত থাকি। দুপুরের জোহরের নামাজ আদায় করে খাওয়া দাওয়া শেষ করে বসে আছি এমন সময় একজন রাইটার এসে আমাকে বলল, আপনাকে ডেপুটি জেলার সাহেব তার অফিসে আপনাকে ছালাম দিয়েছে, চলুন। আমি রাইটারের সাথে অফিসে রওয়ানা হলাম, যাওয়ার সময় দেখলাম, ফরেন্ট ওয়ার্ডের কর্নারে আমার সহকর্মী মিজান, সরওয়ার, খলিল, নিজাম, শাহাবুদ্দিন, ওমর ফারুক সহ অন্যরা তাদের পুঁটলি সমেত দাড়িয়ে আছে। আমি তাদের জিজ্ঞেস করি কি ব্যাপার, তোমরা কোথায় যাচ্ছ? তারা বলল- আমাদের জামিন হয়েছে, আপনি জানেন না? আমি বললাম নাতো।
অতঃপর আমি জেল গেইটে অবস্হিত ডেপুটি জেলার ফরমান আলীর অফিসে হাজির হলে একজন মহিলা আমাকে বলল, ভাই আপনার জামিন হয়েছে। অনেক লোক জেল গেইটে আপনাকে রিসিভ করার জন্য অপেক্ষায় আছে। আমি তার পরিচয় জানতে চাইলে সে বলল, আমি গনপু্র্তের ঠিকাদার, সচিবালয়ে কাজ করি, আপনি আমাকে না চিনলেও আমি আপনাকে ভালো ভাবেই চিনি। ঐ ভদ্র মহিলা আমাকে চা-বিস্কুটে আপ্যায়িত করলেন। এর'ই মাঝে এসবি'র একজন অফিসার আমাকে পাশে ডেকে বললেন, বাহিরে অনেক লোক ও বহু মিডিয়ার লোক আপনার জন্য অপেক্ষা করছে, আমি যতদূর জানি ওখানে আপনি মুখ খুললে পুনরায় ৫৪ ধারায় গ্রেফতার করে থানায় নেওয়া হবে সুতরাং জেল থেকে বের হয়ে যেকোন গাড়িতে সোজা বাসায় চলে যাবেন, কারো ফুলের মালা বা তোরা নেয়া এবং সাংবাদিকদের সাথে কথা বলবেন না।
আমি এ অশণী সংকেত শুনে কিছুটা বিব্রত হই। অতঃপর আমার পিসিতে রাখা টাকা, ঘড়ি বুঝে নেই এবং সকল আনুষ্ঠানিকতা সম্পন্ন করে জেল গেইটে বেরিয়ে দেখি অনেক লোক আমার অপেক্ষায় দাঁড়িয়ে আছে। আমি আমার মন্ত্রণালয়ের নুরুমিয়ার সেদিনের আনন্দের উষ্ণতা কোনদিন ভুলবো না। আমি সোজা ছোট ভাই রফিকের গাড়িতে উঠে বললাম যত দ্রুত পার, এখান থেকে যেতে হবে। আমাদের গাড়ি ফলো করে অনেকগুলো গাড়ি ও বেশ কিছু সাংবাদিক আমার সরকারি বাসায় হাজির হলো। বৈঠকখানা কানায় কানায় ভর্তি লোকে লোকারণ্য। এরই মাঝে কয়েকটি দৈনিক পত্রিকার সাংবাদিক আমাকে বিভিন্ন প্রশ্ন করলে আমি তাদের বললাম,"সাগরে পেতেছি শয্যা শিশিরে কিসের ভয়"। এই শিরোনাম দিয়ে পরের দিনের দৈনিক দিনকাল পত্রিকা ক্যাপসন নিউজ ছাপালো যা ২৩ শে সেপ্টেম্বর ১৯৯৯ তারিখ প্রকাশিত হলো। আমি ৫২ দিন সরকারের মেহমান ছিলাম।
ইতিমধ্যে আমি জেলখানা থাকা অবস্থায় বিভাগীয় মামলার নোটিশ পেয়ে তার জবাব দেই এবং জবাবের শেষাংশে ব্যক্তিগত শুনানির আগ্রহ প্রকাশ করি। তৎমতে আমাকে ২৬ শে সেপ্টেম্বর ১৯৯৯ তারিখে আমার তদন্ত কর্মকর্তা উপসচিব (উঃ) জনাব এস এম, জহিরুল ইসলামের কক্ষে যাই। তিনি আমার ব্যক্তিগত শুনানীকালে বললেন- ভাই আমার কিছু করার নাই তবে আমি যে আদেশ দিব তাতে আদালতে সুফল পাবেন। মজার ব্যাপার তৎকালীন পানি সম্পদ সচিব পরে প্রধান নির্বাচন কমিশনার ডঃ এ টি এম শামসুল হুদা আমার চাকুরির বরখাস্তের নথিতে স্বাক্ষর করেননি যার ফলশ্রুতিতে প্রশাসনিক ট্রাইব্যানালে দায়েরকৃত মামলায় ভীষণ কাজে আসে। এখানে উল্লেখ্য যে, জনাব হুদা আমাকে অনেক স্নেহ ও ভালোবাসতেন। যাহোক আমাকে অর্ডিন্যান্স ১৯৭৯ এ চাকুরী থেকে বরখাস্ত করা হলো। আমার সাথে আরও ২১ জন চাকুরী হারালেন। পরে প্রশাসনিক ট্রাইবুনালের মামলায় চাকুরী ফেরৎ পাই।
উপসংহারে বলতে চাই, যদি ১৯৯৬ সালের ১৫ ই ফেব্রুয়ারীর নির্বাচন সরকারি কর্মচারীরা বয়কট না করত, যদি জীবনজীবিকার মায়া ত্যাগ করে ২৫ শে মার্চ, ১৯৯৬ তারিখে সরকারি কর্মচারীদের অবিসংবাদিত নেতা সৈয়দ মহীউদ্দীন এর সভাপতিত্বে কর্মকর্তা - কর্মচারীরা সরকারের বিরুদ্ধে অবস্হান নিয়ে আল্টিমেটাম দিয়ে সচিবালয়ে সমাবেশ না করত, যদি ২৮ শে মার্চ, ১৯৯৬ তারিখে সচিবালয়ে অবৈধ সরকারের মন্ত্রীদের ঢোকতে বাধা না দিত এবং সর্বশেষ সচিবালয়সহ সমগ্র ঢাকার কর্মচারীরা প্রেসক্লাবের চত্বরে মেয়র হানিফ নির্মিত "জনতা মঞ্চে না যেত তা হলে তত্বাবধায়ক সরকারের আন্দোলনের পরিনতি সহজেই অনুমেয়। এখানে উল্লেখ্য যে, সরকারের সচিবালয় হচ্ছে প্রশাসনের মূল কেন্দ্রস্হল। সেখান থেকে যখন সরকারকে গুডবাই বলা হয়, তখন সরকারের মরাল বিপর্যয় হয়ে যায়।
সরকারি কর্মচারীরা অফিস ছেড়ে রাজপথে নামায় ৩০ শে মার্চ, ১৯৯৬ তারিখ বেলা ৩ টার দিকে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী মহামান্য রাষ্ট্র পতির নিকট পদত্যাগপত্র প্রদান করেন। বিচারপতি হাবিবুর রহমানের নেতৃত্বে তত্বাবধায়ক সরকার গঠিত হয়, যা সকলের জানা।
সরকারি কর্মচারীরা আন্দোলন না করলে তত্বাবধায়ক সরকার হতো কিনা জানিনা এবং দীর্ঘ ২১ বছর অপেক্ষার পালা শেষ করে আওয়ামী লীগ সরকারে আসায় আমার খুবই ঘনিষ্ঠ বন্ধু আ ফ ম মুহিতুল ইসলাম বঙ্গবন্ধু হত্যার বিরুদ্ধে মামলা দায়ের করল। বঙ্গবন্ধুর আত্মস্বীকৃত খুনীদের বাংলার জমিনে বিচার হলো, জাতির ললাটে কলংকের তিলক মুছে গেল।
আমার সম্পর্কে যে যাই বলুক, আর ভাবুক আমি সরকারী কর্মচারীদের ১৯৯৬ সালের বীরোচিত আন্দোলনের জন্য সকলকে স্যালুট জানাই এবং বলবো আমার অস্তিত্ব বঙ্গবন্ধুতে, আমার আহংকার আমি ১৯৯৬ সালের আন্দোলনের একজন অকুতোভয় সৈনিক ছিলাম। আমার স্বপ্নে বঙ্গবন্ধুর বাংলাদেশের। খুদা- দারিদ্র্য মুক্ত বাংলাদেশ। জয় বাংলা।
সর্বশেষ এডিট : ০৭ ই জুলাই, ২০২০ রাত ৯:৪৪

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।



