
কাঁকড়া বহু মানুষ আগ্রহ নিয়ে খায়।
কাকড়ায় আছে অনেক ভিটামিন। আমাদের সুন্দরবনের কাঁকড়া বিশ্ববাজারে ব্যাপক চাহিদা। চীন, মীয়ানমার, জাপান, যুক্তরাষ্ট্র, মালেয়শিয়া, শ্রীলংকা, কোরিয়া, সিঙ্গাপুর, তাইওয়ান, হংকংসহ বিভিন্ন দেশে। সুন্দরবন সংলগ্ন এলাকার সহস্রাধিক জেলে বনবিভাগ থেকে নির্দিষ্ট রাজস্বের বিনিময়ে পারমিট সংগ্রহ করে সুন্দরবনে কাঁকড়া সংগ্রহ করতে যান। সুন্দরবন এলাকায় বারো প্রজাতির কাকড়া পাওয়া যায়। কাকড়াদের নাম গুলো বড় অদ্ভুত- মাইলা, হাব্বা, সিলা, মায়া ও সেটরা। কাঁকড়া ধরা সুন্দরবনের বহু মানুষের পেশা। একবার আমি কাঁকড়া শিকারিদের সাথে সুন্দরবন গিয়েছিলাম। সেই গল্প আজ বলব।
চিংড়ি মাছের চেয়ে কাঁকড়া চাষ সহজ।
কাঁকড়া নদী বা খালে বেড়ে উঠলেও এর প্রজনন হয় সাগরের মুখে বা গভীর সাগরে। পথিবীর সব সাগরেই কাঁকড়া পাওয়া যায়। চিন-সহ বেশ কিছু দেশ করোনাভাইরাসের আতঙ্কে আপাতত কাঁকড়া আমদানি বন্ধ রেখেছে। ক্ষতির সম্মুখীন হয়েছেন কাঁকড়া-ব্যবসায়ীরা। যে কাঁকড়া ১৫০০ টাকা কেজি দরে বিক্রি হত, বর্তমানে সেই কাঁকড়া ৩০০ টাকা কেজিতেও কিনতে চাইছেন না রফতানির সঙ্গে যুক্ত কারবারিরা। তবে আমাদের দেশে কোনো এক বিশেষ কারনে মুসলমানেরা কাঁকড়া খুব কম খায়। কিন্তু হিন্দুরা কাঁকড়া বেশি খায়। ঢাকা শহরে বেশির ভাগ মন্দিরের সামনে কাঁকড়া বিক্রি করতে দেখা যায়। কক্সবাজারে গেলে অনেকেই আগ্রহ নিয়ে কাঁকড়া খেতে দেখা যায়। কাকড়া ফ্রাই খেতে খুব সুস্বাদু।
মুসলমানদের চিন্তার কোনো কারন নেই-
কাঁকড়া খাওয়া জায়েজ। যদি কারো খেতে রুচি হয়, তিনি খেতে পারবেন। যেহেতু নবী সাঃ হাদিসের মধ্যে বলেছেন, ‘সমুদ্রের অথবা নদীর যেই মৃত প্রাণী আছে, সেগুলো সবটাই হালাল।’ এর মধ্যে কাঁকড়াও অন্তর্ভুক্ত হবে এবং কাঁকড়া খাওয়াও হালাল হবে। গরু বা মূরগীর মাংসে যে পরিমান প্রোটিন থাকে কাঁকড়াতেও একই পরিমান প্রোটিন থাকে। সব সামুদ্রিক মাছেই সেলেনিয়াম থাকে, কিন্তু কাঁকড়ায় সেলেনিয়াম থাকে পরিমানে আরো বেশি বেশি। সেলেনিয়াম আমাদের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়ায় ও থাইরয়েড হরমোন ঠিক রাখে। নুডুলস, বার্গার বা স্যুপের সাথে মাশরুম যদি খেতে পারেন কাঁকড়া খাবেন না কেন?
কাঁকড়ার একটা রেসিপি দিয়ে দিলামঃ
কাঁকড়া কেটে ভালভাবে পরিষ্কার করে ধুয়ে নিন। গোল মরিচ গুড়া, কাঁচা মরিচ বাটা, হলুদ গুড়া এবং লবণ পরিমান মতো দিয়ে ভাল করে মেখে কমপক্ষে ২০ মিনিট রেখে দিন। তারপর কড়াইতে সয়াবিন তেল দিন। তেল গরম হলে কাঁকড়া ঢেলে দিয়ে কিছুক্ষণ ভাজুন। কাঁকড়া লাল রং হয়ে আসলে তুলে নিন।
অন্য একটি পাত্রে সয়াবিন তেল দিন। তেল গরম হলে পেঁয়াজ কুচি, কাঁচা মরিচ ফালি, লবণ, দারচিনি, লবঙ্গ, এলাচ দিয়ে কষিয়ে আদা বাটা, রসুন বাটা দিয়ে ভাল করে কষিয়ে নিন। ছোট একটা বাটিতে পানির সাথে শুকনা মরিচ গুড়া, বাকি হলুদ গুড়া, জিরা গুড়া, ধনে গুড়া, গোলমরিচ গুড়া গুলে নিয়ে মশলায় দিন। ভাল করে কষিয়ে কাঁকড়া ও লবণ দিন। একটু কষিয়ে পানি দিয়ে অল্প আঁচে ঢেকে রাখুন ১০ থেকে ১২ মিনিট (যতক্ষণ না কাঁকড়ার মধ্যে মসলা ঢুকছে)। এরপর টমেটো কুঁচি দিয়ে কিছুক্ষণ অল্প আঁচে রেখে দিন। টমেটো কুচি নরম হয়ে আসলে ধনেপাতা কুচি দিয়ে নামিয়ে নিন।
একবার সুন্দরবনের কাছে এক গ্রামে গিয়েছি।
প্রায় ত্রিশ জন মিলে সুন্দরবন যাচ্ছেন কাঁকড়া ধরতে। এটাই তাদের পেশা। আমি অনেক বলে-কয়ে তাদের সাথে চলে গেলাম। জায়গাটার নাম সম্ভবত ফিরিঙ্গি বা কালির চর এর দিকে। ইঞ্জিনওয়ালা নৌকা করে গেলাম। জোয়ারের সময় কাঁকড়া ধরতে হয়। জোয়ারের পানি বিকেলের দিকে নামতে থাকে। জোয়ারের সময় অসংখ্যা কাঁকড়া ভেসে আসে। লম্বা একটা দড়িতে, এক হাত সমান দূরে দূরে লইট্রা বা কাইকা মাছ বাঁধা থাকে। কাইকা মাছ খেতে এসেই কাঁকড়া আটকা পড়ে যায়। তখন শিকারী ঝাল দিয়ে কাঁকড়া ধরে ফেলে। তার সাথে বড় একটা পাতিল থাকে। সেই পাতিলে কাঁকড়া দিয়ে ভরে যায়। প্রায় তিন ঘন্টার মধ্যে পাতিল ভরে যায়।
আমি যতক্ষন তাদের সাথে ছিলাম-
বেশ ভয়ে-ভয়ে ছিলাম। যে কোনো সময় বাঘ চলে আসতে পারে। কুমির থাকতে পারে, সাপ থাকতে পারে, থাকতে পারে নানান রকম বিষাক্ত জীবজন্তু। ওদের মধ্যে কোনো ভয়ডর দেখলাম না। আপন মনে কাঁকড়া ধরে যাচ্ছে। সবাই কাজে ব্যস্ত। কেউ কোনো কথা বলছে না। আর এদিকে আমি ভয়ে জমে গেছি। জোয়ারের পানি হাটু পর্যন্ত হয়ে যায়। আরাম করে পা ফেলে হাটাও যায় না। মাটি থেকে এক ধরনের 'হাল' বের হয়ে থাকে। যার মাথা থাকে চোকক্ষা। খুব হিসাব করে পা ফেলতে হয়। আমার প্রচন্ড ক্ষুধা পেয়েছিলো। ওদের সাথে কোনো খাবার ছিলো না। ছিলো শুধু এক বোতল পানি। তাও সেটা অনেক আগেই শেষ হয়ে গিয়েছিলো। কত রকম পেশা যে দুনিয়াতে আছে! কত কষ্ট মানুষের। সুন্দরবনে আসে কাঁকড়া ধরতে অথচ তাদের নেই কোনো নিরাপত্তা!
সর্বশেষ এডিট : ১৩ ই জুলাই, ২০২০ রাত ১১:৪৯

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।



