
সুরভি বাসায় নাই। সে তার বাবার বাড়ি গিয়েছে।
করোনা ভাইরাস তাকে আটকে রাখতে পারেনি। তবে এবার সে অনেকদিন পর গেছে। প্রায় পাঁচ মাস পর। আমি বলেছি, যতদিন ভালো লাগে থাকো। আমাকে নিয়ে চিন্তা করো না, আমি ভালোই থাকবো। আজ পাঁচ দিন হয়ে গেলো সুরভি বাসায় নেই। আমি একা। সারাদিন ভালোই পার করি। রাতের বেলা কেমন দম বন্ধ লাগে! আজ সারাদিন রাস্তায় রাস্তায় ইছে মতোন ঘুরে বেড়িয়েছি। ক্লান্ত বিধ্বস্ত অবস্থায় ঘরে ঢুকে দেখি সুরভি নেই। মনে পড়ল, সুরভি গিয়েছে তার বাবার বাড়ি। মনটা খুব খারাপ হয়ে গেল। মন ভাল করতে গেলাম বাজারে। বাজারে গেলে আমার মন ভালো হয়ে যায়। বিশেষ করে মাছের বাজারে ঘোরাঘুরি করতে আমার খুব ভালো লাগে। একসময় প্রতিদিন কোন না কোনো মাছের বাজারে না গেলে ভাল লাগত না।
আমাদের এখানে সন্ধ্যার পর রেললাইনের পাশে বিশাল মাছের বাজার বসে। সেখানে কত রকমের যে মাছ পাওয়া যায়! বাজারে কোনো মাছের অভাব নেই। মাছ দেখেই মনটা খুশিতে ভরে উঠল। সুরভির কথা একেবারেই ভুলে গেলাম। কুচি কুচি করে কাটা বরফের উপরে কি সুন্দর করেই না ইলিশ মাছ গুলো সাজিয়ে রেখেছে। সাদা লাইটের আলোতে ইলিশ গুলো ঝকমক করছে। মনে হচ্ছে এই মাত্র নদী থেকে তুলে আনা হয়েছে। এবার বাজারে প্রচুর ইলিশ উঠেছে। সাইজেও বড় বড়। দাম তুলনামূলক সস্তা। আমি লক্ষ্য করে দেখেছি, ইলিশ মাছ বিক্রেতারা সব সময় খুব হাসিখুশি হয়। মাছের মতোন তাদের চেহারাও ঝকমক করে। একলোক দেখলাম কোনো দরদাম না করে চারটা ইলিশ কিনে নিল চার হাজার টাকা দিয়ে। আমি লোকটার পেছনে অনেকক্ষন ঘুরলাম, দেখার জন্য সে আর কি কি মাছ কিনেন। আজ অন্যান্য মাছের বিক্রীও খুব ভাল। ঘুরে-ঘুরে আমি মাছ দেখছি, মাছের বেচাকেনা দেখছি। খুব ভাল লাগছে।
আমার সবচেয়ে ভাল লাগে মাছ কাটা দেখতে।
কত বড় বড় মাছ মুহুর্তের মধ্যে কেটে ফেলে! আমি নিজেও মাছ কিনলে বাজার থেকেই কেটে নিয়ে যাই। রেললাইনের পাশে যে ছেলেটা মাছ কাটে তার নাম মকবুল। মকবুল আমার পূর্ব পরিচিত। আমি এক হাজার টাকা বাজি ধরে বলতে পারি সারা ঢাকা শহরে মকবুলের মতোন আর কেউ এত সুন্দর করে মাছ কাটতে পারবে না। মকবুল মাছের দিকে না তাকিয়ে খুব দ্রুত বড় বড় মাছ মুহূর্তের মধ্যে কেটে ফেলে। মকবুলের সাথে আমার পরিচয় দীর্ঘদিনের। মকবুলের বাসাতেও আমি গিয়েছি। ঢাকা শহরে আমাকে যেক'জন পছন্দ করে তাদের মধ্যে মকবুল থাকবে এক নম্বরে।
মকবুল আমাকে দেখে ইশারায় বসতে বলল।
সে ভীষন ব্যস্ত। পাগলের মতো সে মাছ কেটে যাচ্ছে। আগে থেকে তার মাছ কাটার স্প্রীড আরো বেড়েছে। মকবুল আমার উপরে খুব রাগ করে আছে। কারন অনেকদিন তার সাথে দেখা করিনি। রাগের কারন আমি বাজারে এসেছি কিন্তু তার সাথে দেখা করি নাই বলে। মকবুলের এসিস্ট্যান্ট আমাকে চা, সিগারেট এনে দিল। এসিস্ট্যান্টের কাজ হলো- জ্যান্ত মাছের মাথায় একটা বাড়ি দেয়া। জ্যান্ত লাফানো মাছ মুহূর্তের মধ্যে মরে যায়, তারপর সে আঁশ ফেলে ওস্তাদের (মকবুল) কাছে দেয়। সরকারী জাগায় বসে মাছ কাটে তবু মকবুলকে প্রতিদিন পাঁচ শ' টাকা করে দিতে হয়। এক ঘন্টা মকবুলের মাছ কাটা দেখে আমি মুগ্ধ হয়ে বাসায় ফিরলাম।
অনেকদিন আগে একটা বই পড়েছিলাম, আর্নেস্ট হেমিংওয়ের 'দ্যা ওল্ড ম্যান এন্ড দ্যা সি'। অত্যন্ত চমৎকার একটি উক্তি বুড়ো সান্তিয়াগোর মুখ দিয়ে হেমিংওয়ে আমাদের বলেনঃ ‘Man is not made for defeat. Man can be destroyed, but not defeated!' আসলেই, মানুষের জন্ম তো হার স্বীকারের জন্য নয়। মানুষ ধ্বংস হয়ে যেতে পারে, কিন্তু কখনো পরাজিত হয় না। শত প্রতিকূলতা, কুৎসিতের মুহূর্মুহু আক্রমণ, একে অপরের থেকে ক্রমাগত বিচ্ছিনতা, - এই চরম হতাশার মাঝেও তবু আমাদেরকে বেঁচে থাকতে হয়।
কোরিয়ান মুভি A Moment to Remember (২০০৪) নায়িকার ভুল মানুষের প্রেমে পড়া, পরিবারের সাপোর্টে আবার নতুন করে জীবন শুরু করা; নায়কের আত্মবিশ্বাস আর পরিশ্রম দিয়ে নিজের স্বপ্নকে সত্যি করা; একসময় দুজনের দেখা হওয়া, ভালবাসার বাঁধনে জড়িয়ে পড়া এভাবেই গল্প বয়ে চলে।
পারিবারিক বাঁধা কে জয় করে একসময় ওরা বিয়েও করে। কিন্তু তারপরেই নিয়তি দেয়াল হয়ে দাঁড়ায় দুজনের মাঝে।
যারা এখনো ছবিটি দেখেননি, আমি বলবো মিস করেছেন, ভয়াবহ মিস। ভালবাসা যে কত কষ্টের, কত সুখের আর কত পবিত্র, তা এই মুভি দেখে একবার হলেও অনুভব করবেন।

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।


