
কিছু মানুষের অঙ্কের প্রতি ভালবাসা থাকে।
আমি নিজে অঙ্ক কম বুঝি। কিন্তু অঙ্ক আমার প্রিয় বিষয় গুলোর একটা। আজ আপানদের 'শকুন্তলা দেবী'র গল্প বলব। তিনি কম্পিউটারের থেকে ১২ সেকেন্ড আগে সমাধান করেছিলেন জটিল সব অঙ্ক। যদিও ছোটবেলায় কোনও দিন স্কুলে পর্যন্ত যাননি তিনি। মুখে মুখেই যোগ-বিয়োগ, গুণ-ভাগ ঝটাপট করে ফেলতে পারে পাঁচ বছর বয়সেই। বাবা মেয়েকে আদর করে ডাকেন ‘ক্যালকুলেটর।’ শৈশবে বাবার দেওয়া সেই নামই পরবর্তী কালে একবাক্যে মেনে নেয় গোটা বিশ্ব। নিজের শিক্ষক নিজেই ছিলেন তিনি। পাশে পেয়েছিলেন বাবাকে। দেশের বিভিন্ন জায়গায় মেয়েকে নিয়ে ‘রোড শো’ করেছিলেন বাবা। পয়সা রোজগারের জন্য নয়, শকুন্তলার প্রতিভাকে পরিচিতি দিতে। প্রচন্ড প্রভাবান ছিলেন শকুন্তলা দেবী।
শকুন্তলা দেবী আজ আর বেঁচে নেই।
দেশের গর্ব নারী-শক্তির অনন্য প্রতীক শকুন্তলা দেবীর মৃত্যু হয়েছে ২০১৩ সালে। আজও তাঁর জন্মদিন ৪ নভেম্বরকে বিশেষ সম্মান দেয় গুগল ডুডল। সম্প্রতি তাঁর জীবনী নিয়েই সিনেমা বানিয়েছেন পরিচালক অনু মেনন। সিনেমার নাম- 'শকুন্তলা দেবী'। মুভিটা আমি দেখলাম। চমৎকার মুভি। আমার ধারনা, অঙ্কবিদ রামানুজন থেকেও এই মহিলার ক্ষমতা বেশী। তার অঙ্ক করার স্টাইল দেখে মনে হবে তার অলৌকিক ক্ষমতা আছে। তার বাবা যখন তাসের ম্যাজিক দেখাতেন, প্রতিটা তাসের নম্বর তাঁর মুখস্থ হয়ে যেত। একটা সময় বাবা আবিষ্কার করেছিলেন, মেয়েকে তাসের খেলায় হারানো দুষ্কর। পিচ্চি মেয়ে স্মরণ ক্ষমতায় টেক্কা দিয়েছে তার বাবাকেও। পাঁচ বছরের মেয়ের ব্যতিক্রমী মেধার কথা চাপা থাকে না। ছড়িয়ে পড়ে গোটা বেঙ্গালুরুতে। ১৯২৯ সালে বেঙ্গালুরুর গোঁড়া হিন্দু ব্রাহ্মণ পরিবারে জন্ম শকুন্তলার। বাবা ছিলেন ধর্মের আস্ফালনের বিরুদ্ধে গর্জে ওঠা এক বিপ্লবী।

ছবিতে শকুন্তলা দেবী এবং তার স্বামী।
মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, হংকং, জাপান, শ্রীলঙ্কা, ইতালি, কানাডা, রাশিয়া, ফ্রান্স, স্পেন, মরিশাস, ইন্দোনেশিয়া এবং মালয়েশিয়ার বিভিন্ন স্কুল ও বিশ্ববিদ্যালয়ে ঘুরে নিজের স্কিল দেখিয়ে দিলেন শকুন্তলা। অবাক হলেন নামী দামি বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক-গবেষকরা। ১৯৭৭ সাল। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ডালাসে ‘সাদার্ন মেথোডিস্ট ইউনিভার্সিটি’তে ডাক পড়ল শকুন্তলার। ততদিনে তাঁর নাম ছড়িয়ে পড়েছে গোটা মার্কিন মুলুকে। ২০১ ডিজিটের নম্বরের ২৩ তম রুট করতে বলা হলো তাঁকে। শকুন্তলা কষে দিলেন ৫০ সেকেন্ডে।
শকুন্তলা দেবীর মনস্তত্ত্ব নিয়ে গবেষণা চালিয়েছিলেন ক্যালিফোর্নিয়া ইউনিভার্সিটির সাইকোলজির অধ্যাপক আর্থার জেসন। নানা রকম জটিল অঙ্কের সমস্যা দিয়ে তিনি নিশ্চিত হন, এই মেয়ের ব্রেন কাজ করে অসামান্য ক্ষিপ্রতায়।
শকুন্তলার বাবার একটি সার্কাস কোম্পানি ছিল।
সেই সার্কাস কোম্পানি বন্ধ করে তখন তিনি মেয়েকে নিয়ে রোড শো শুরু করেন। শকুন্তলা দেবী 'হিউম্যান কম্পিউটার' হিসেবে পরিচিত ছিলেন। কিন্তু এই খেতাব শকুন্তলা দেবীর মোটেই পছন্দ ছিল না। এক সাক্ষাৎকারে তিনি বলেছিলেন, কম্পিউটারের থেকে মানুষের মস্তিষ্ক অনেক বেশি ক্ষমতা রাখে। তাই কম্পিউটারের সঙ্গে তাঁর তুলনা পছন্দ ছিল না।
কলকাতার আইএএস অফিসার পরিতোষ বন্দ্যোপাধ্যায়ের সঙ্গে বিয়ে হয়েছিল শকুন্তলা দেবীর। সেটা ১৯৬০ সালের মাঝামাঝি। বাঙালি পরিবারের বউ শকুন্তলা সব আদব কায়দাই রপ্ত করেছিলেন। জীবনও চলছিল চেনা ছন্দেই। তাল কাটে কয়েক বছর পরে। শকুন্তলা বুঝতে পারেন, তাঁর স্বামী আদতে সমকামী। স্বামীর সাথে ছাড়াছাড়ি হয়ে গেল!

সমকামিদের মানসিকতা নিয়ে বিস্তর পড়াশোনা শুরু করেন শকুন্তলা। এই গবেষণার ফসল হলো তাঁর প্রথম বই ‘দ্য ওয়ার্ল্ড অব হোমোসেক্সুয়ালস।’ সমকামিতা যে অপরাধ নয়, সমকামীদের যাপন-পদ্ধতি শুধু আলাদা, এই বইয়ের প্রতি পাতায় সেটাই বুঝিয়েছিলেন শকুন্তলা দেবী। এছাড়াও জ্যোতিষশাস্ত্র নিয়েও তাঁর লেখা কয়েকটি বই রয়েছে। রান্না সম্পর্কেও তিনি কয়েকটি বই লিখেছিলেন। তাঁর লেখা কয়েকটি বইয়ের নাম ‘ফান উইদ নাম্বার’, ‘নাম্বারস অ্যান্ড পাজলস টু পাজল ইউ’, ‘অ্যাস্ট্রোলজি ফর ইউ’, ‘পারফেক্ট মার্ডার’ ইত্যাদি। শকুন্তলা দেবীর বিবাহিত জীবনের প্রাপ্তি এক কন্যা। নাম অনুপমা ব্যানার্জি।
ক্যালিফোর্নিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের এক সাইকোলজির প্রফেসর শকুন্তলা দেবীর কাছে গণিতের পাঠ নিয়েছিলেন। শকুন্তলা তীব্র মনোবল ও সাহস নিয়ে ভারতের লোকসভা নির্বাচনে লড়েছিলেন। তিনি মুম্বাই ও তেলেঙ্গানায় ইন্দিরা গান্ধীর প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেব নির্বাচন করেছিলেন। নির্বাচনে হেরে গিয়েছিলেন। শকুন্তলা দেবী বিশ্বের ৫০টিরও অধিক দেশ ভ্রমণ করে তার গণিতের প্রতিভা ছড়িয়েছিলেন। অনেক শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ও নাট্যমঞ্চে তার গণিতের প্রতিভা প্রদর্শন করেন।
সমাজের অসহায় দুস্থ মানুষদের জন্য শকুন্তলার মন প্রতিনিয়ত কাঁদত। যে কোনো দানের কাজে সর্বাগ্রে শকুন্তলার নাম থাকত। বিশেষ করে বস্তি এলাকার শিশুদের জন্য তার সাহায্যের হাত সবসময়ই খোলা থাকত। এছাড়াও গরিব পরিবারের মেয়েদের নানাভাবে সাহায্য করতেন।
সর্বশেষ এডিট : ১৯ শে আগস্ট, ২০২০ রাত ৩:৩৯

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।



