
আজ সারাদিন বৃষ্টি।
ভুল বললাম, বৃষ্টি না। মেঘলা। আকশ ভরা মেঘ। কিন্তু ঝুমঝুম বৃষ্টি হয়নি। তবে একআধবার অতি সামান্য গুড়িগুড়ি বৃষ্টি হয়েছে। টিভিতে খবরে বললো- আগামী দু'দিনও নাকি বৃষ্টি হবে। বৃষ্টির কারনে শাহেদ আজ বাইরে যেতে পারে নি। সারাদিন ঘরে বন্ধী। শাহেদ জামাল সারাদিন বাসায় শুয়ে বসে থেকেছে। পুরোনো ম্যাগাজিন পড়েছে। দুপুরে ভাবী খেতে ডেকেছেন। লক্ষ্মী ছেলের মতোন টেবিলে বসে খেয়ে নিয়েছে। ভাবী আজ খিচুড়ি রান্না করেছেন। খেতে চমৎকার হয়েছে। মুগ আর মসুরের ডাল দিয়ে রান্না করেছেন। সাথে ইলিশ মাছ ভাজা এবং দেশী মূরগী ভূনা। তিন রকমের আচার ছিলো, সালাদ ছিলো। সব মিলিয়ে দুপুরের খাওয়াটা সেই রকম হয়েছে। সকাল থেকেই শাহেদ জামালের আজ খিচুড়ি খেতে ইচ্ছা করছিলো। কিন্তু সে কাউকে বলেনি। অথচ তার খিচুড়ি খাওয়ার ইচ্ছাটা পূরন হয়ে গেল! আসলে মাঝে মাঝে মানুষের জীবনে কাকতালীয় ব্যাপার গুলো ঘটে বলেই জীবনকে এত সুন্দর বলে মনে হয়।
ঘরের মধ্যে সিগারেট খাওয়া সম্পূর্ন নিষেধ।
তাই শাহেদ জামাল ছাদে গেলো। ছাদে গিয়ে আরামে সিগারেট খাবে। ধোঁয়ায় কারো কোনো সমস্যা হবে না। হেব্বি খাওয়া দাওয়ার পর আরাম করে একটা সিগারেট না খাওয়া পর্যন্ত অস্থির লাগে। শাহেদ ছাদে গিয়েই অদ্ভুত সুন্দর দু'টা দৃশ্য দেখলো। এই দৃশ্য শাহেদ জামালের অনেক দিন মনে থাকবে। ছাদে অসংখ্য ফড়িং। একসাথে এত ফড়িং শাহেদ আগে কখনও দেখে নি। ভনভন করে এলোমেলো ভাবে উড়ছে। কয়েকটা ফড়িং শাহেদ জামালের কপাল আর গাল ঘেষে গেলো যেন। নীলাকে জিজ্ঞেস করে জেনে নিতে হবে ছাদে এত ফড়িং কেন? ফড়িং গুলো কোথা থেকে এলো? শাহেদ সিগারেট ধরালো। সিগারেটে লম্বা একটা টান দিতেই তার চোখ পড়লো পাশের বাড়ির ছাদে। সেখানে খুব সুন্দর একটা মেয়ে। ছাদে কাপড় মেলতে আসছে। মেয়েটা মাত্রই গোছল শেষ করেছে। তার চুল ভেজা। দুই হাত ভর্তি কাঁচের চুড়ি। শাহেদ মুগ্ধ হয়ে তাকিয়ে আছে!
দুপুর আড়াইটা।
আকাশ মেঘলা। সকাল থেকেই বৃষ্টি হবে হবে করছে কিন্তু বৃষ্টি হয়নি। শাহেদ জামালদের ছাদটা ছোট্র কিন্তু সুন্দর। টিনের ড্রামে বেশ কয়েকটা গাছ আছে। গাছ গুলো বেশ ভালোই বড় হয়েছে। এই গাছ গুলোই ছাদের সৌন্দর্য অনেকখানি বাড়িয়ে দিয়েছে। শাহেদদের বাড়ির চার পাশেই চারটা বাড়ি। প্রতিটা বাড়ির ছাদ গুলো একটা সাথে আরেকটা লাগানো। শাহেদদের বাম দিকের বাড়িটার ছাদে একটা মেয়ে ভেজা কাপড় মেলে দিচ্ছে। শাহেদ মুগ্ধ হয়ে মেয়েটাকে দেখছে। মেয়েটাকে চেনা চেনা মনে হচ্ছে। মুখটা ভীষন মিষ্টি। মাথার ভেজা চুল গুলো খোলা। ভেজা চুল থেকে পানি চুইয়ে চুইয়ে পড়ে কোমরের কাছে অনেকখানি ভিজে গেছে। শাহেদ মেয়েটাকে বেশ কয়েকদিন ধরেই দেখছে। সম্ভবত নতুন ভাড়া এসেছে। শাহেদ এর সাথে এখনও মেয়েটার কোনো কথা হয়নি। তবে চোখাচোখি হয়েছে অনেকবার। শাহেদ ঠিক করেছে আজ মেয়েটার সাথে কথা বলবে। বলবেই। শাহেদ জিজ্ঞেস করলো- তোমার নাম কি? মেয়েটা কোনো জবার দিলো না। তবে একটু হাসলো। শাহেদ বলল, এটা আমাদের বাড়ি। মেয়েটা হাসলো।
মেয়েটা কথা বলছে না কেন?
কিছু জিজ্ঞেস করলেই শুধু হাসে। হাসিটা অনেক সুন্দর। একদম বুকে এসে লাগে। শাহেদ বলল, তুমি কথা বলছো না কেন? প্লীজ কথা বলো? আমি দুষ্টলোক নই। তাছাড়া আমি তোমার সাথে প্রেমট্রেমও করবো না। আমার প্রেমিকা আছে। তার নাম নীলা। সে নাখালপাড়া থাকে। কিছু দিনের মধ্যেই আমার একটা চাকরি হবে। তারপর আমি নীলাকে বিয়ে করবো। সব ঠিকঠাক। কাজেই তুমি নিশ্চিন্ত থাকতে পারো। আমি তোমাকে কোনো বিরক্ত করবো না। আমার স্বভাব এরকম না। আমি ভালো লোক। মেয়েটা হাত আর ঠোঁট নেড়ে বুঝিয়ে দিলো সে বোবা। সে কথা বলতে পারে না। শাহেদ ভীষন চমকে গেলো। এত সুন্দর একটা মেয়ে অথচ কথা বলতে পারে না! শাহেদ মনে মনে বলল, হে আল্লাহ এটা তুমি মেয়েটাকে কেমন শাস্তি দিলে! কথা না বলে মানুষ থাকতে পারে! শাহেদ মেয়েটাকে আরো কিছু জিজ্ঞেস করতো, কিন্তু মেয়েটা হাসি মুখে বিদায় নিয়ে চলে গেলো। মেয়েটার জন্য শাহেদ খুব কষ্ট হতে লাগলো।
শাহেদ জানে এই মেয়েটার সাথে অসংখ্যবার দেখা হবে।
এবং মেয়েটার সাথে তার ভালো একটা সম্পর্ক হবে। সম্পর্কের প্রাথমিক ধাপ হচ্ছে বন্ধুত্ব। বন্ধুত্বের পরেই আসে বিশ্বাস এবং নির্ভরশীলতা। মেয়েটা অবশ্যই শাহেদ জামালকে বিশ্বাস করবে। শাহেদ জামালকে তার নানী বলেছিলেন, যারা কথা বলতে পারে না, তারা কানেও শুনতে পায় না। কানে না শোনার কারণেই তারা কথা বলতে পারে না। মেয়েটা কি কানেও শুনতে পায় না! শাহেদ মনে মনে ভাবলো, যে বোবা সে কখনো কাউকে গালি দেয়নি, মিথ্যা সাক্ষ্য দেয়নি, গীবত করেনি। জন্ম থেকেই যারা অন্ধ, বোবা তাঁরা তো সবচেয়ে সৌভাগ্যবান। তাঁরা জান্নাতের উঁচু স্থানগুলোতে এমনসব জিনিস অনন্তকাল ধরে দেখবে এবং শুনবে যা কোনো হৃদয় কখনো কল্পনা করেনি। শাহেদ ঠিক করলো নীলার সাথে মেয়েটার পরিচয় করিয়ে দেবে।
সর্বশেষ এডিট : ২৩ শে সেপ্টেম্বর, ২০২০ রাত ২:৩৫

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।



