
সোলায়মান ইন্টারমিডিয়েট পরীক্ষা ফেল করে ঢাকায় এসেছে।
বাড়ি তার চাঁদপুর। ঢাকা শহর কিছুই চিনে না। জানে না। কাওরান বাজার এসে সবজি বিক্রি করে। পাশাপাশি বাসে বাসে পত্রিকা বিক্রি করে। এখন সে একটা দৈনিক পত্রিকার সার্কুলেশন ম্যানেজার। পাঁচ বছর পত্রিকায় সার্কুলেশন ম্যানেজার পদ থেকে- সে অসৎ পথে অনেক টাকার মালিক হয়ে গেছে। এই তো কিছু দিন আগে ৫ কাঠা জমি কিনেছে। চার লাখ টাকা দিয়ে একটা আন্ডারগ্রাউন্ড পত্রিকার উপদেষ্ঠা সম্পাদক হয়েছে। এখন তার ছেলের বড় রেস্টুরেন্টে জন্মদিন করে একশ' মানুষ দাওয়াত দিয়ে খাওয়ায়। বিরাট এক টিভি কিনেছে, ফ্রিজ কিনেছে। পত্রিকার সার্কুলেসন পদে থাকলে, অফিস যদি সঠিক খোঁজ খবর না নেয় তাহলে অবাধ টাকা পয়সা চুরী করা যায় সহজেই। এই সোলায়মানরা এক অফিসে বেশী দিন থাকে না। ধরা খাওয়ার ভয়ে বিভিন্ন হাউজে জয়েন করে।
একজন কাজু বেপারী।
সে গ্রাম থেকে লুঙ্গি পরে ঢাকা এসেছিলো। একটা মেসে থাকতো। মেস ভাড়া দিতে পারতো না। বাড়ি তার মাগুরা। এখন সে একটা দৈনিক পত্রিকার বিজ্ঞাপন ম্যানেজার। এই তো কিছু দিন আগে একটা ফ্লাট বুকিং দিলো। বাইক দিয়ে এই শহরের রাস্তায় ঘুরে বেড়ায়। তখন তার চোখে থাকে কালো সানগ্লাস। এখন সে অনেক টাকার মালিক হয়ে গেছে। বিশাল এক ফ্লাট নিয়ে পরিবার নিয়ে থাকে। পত্রিকা অফিসে সার্কুলেশন আর বিজ্ঞাপন বিভাগে টাকা চুরীর সুযোগ আছে। অসৎ লোকরা এই সুযোগ কাজে লাগায়। কাজু বেপারীর লুঙ্গি থেকে প্যান্ট পরা ব্যাপারটা আমি খুব ইঞ্জয় করেছি। চেষ্টা করে শুদ্ধ ভাষায় কথা বলতে অথচ আঞ্চলিক শব্দ তার এসেই যায়। এসে যাওয়াটাই স্বাভাবিক। সোলায়মান এবং কাজু বেপারী তারা তাদের মেধা দিয়েই এই শহরে জায়গা করে নিয়েছে। অজপাড়া গা থেকে উঠে এসে আজ তারা প্রতিষ্ঠিত নিজের যোগ্যতায়।
কলিমুল্লাহ আহাদ।
তার বাড়ি নোয়াখালি। কিন্তু সে মানুষকে বলে তার বাড়ি কুষ্টিয়া। নোয়াখলি বলতে সমস্যা কি? বুড়িগঙ্গা নদীর ওপারে মা ভাই বোন নিয়ে থাকতো। খুবই মানবেতর জীবনযাপন করেছে। কারন তার বাপ অন্য এক মহিলাকে বিয়ে করে আলাদা থাকে। সেই কলিমুল্লাহ আহাদ এখন একটা দৈনিক পত্রিকার চিফ রিপোর্টার। সাংবাদিকদের বিভিন্ন সংগঠনের সাথে জড়িত। এখন অনেক টাকার মালিক কলিমুল্লাহ। কিছু দিন আগে রাজশাহীতে একটা পাঁচ তলা বাড়ি বানিয়েছে। সকালবেলা বাথরুমে পত্রিকা নিয়ে না বসলে তার পটি হয় না। সকালে নাস্তার টেবিলে তিন রকমের জুস লাগে তার। অথচ এক সময় সকালে নাস্তা খেত মুড়ি। নিজের যোগ্যতায় কলিমুল্লাহ আজ সফল। এই শহরে সে জায়গা করে নিয়েছে। এখন অফিসে তার উপরে নির্ভর করে কার চাকরি থাকবে, কার থাকবে না। কার প্রমোশন হবে। কার হবে না। তাকে খুশি না রাখতে পারলে চাকরি টিকবে না।
আমার বন্ধু রাছেল।
একটা দৈনিক পত্রিকায় চাকরি করে। অনেক মাস ধরে তার সেলারি হয় না। সৎ জীবনযাপন করছে। বাড়িভাড়া দিতে পারে না। অথচ তাদের পত্রিকার মালিকের টাকার অভাব নেই। সে এসে মাঝে মাঝে আমার কাছ থেকে টাকা লোন নিয়ে যায়। পত্রিকা অফিসে ভালো মানুষদের জায়গা হয় না। চোর বাটপাররা পত্রিকা অফিসে ভালো করে। যে যত বড় অমানুষ হবে, সে তত পত্রিকা অফিসে ভালো করবে। এটাই অলিখিত নিয়ম। ভালো মানুষরা পত্রিকা অফিসে বেশী দিন টিকে থাকতে পারে না। সব অফিসেই পলিট্রিক্স হয়। তবে পত্রিকা অফিসে জঘন্য পলিট্রিক্স হয় সবচেয়ে বেশী। যেসব পত্রিকা অফিস দূর্নীতির টাকায় হয়েছে সেসব অফিসের অবস্থা ভয়াবহ হয়। বর্তমানে কোনো পত্রিকা অফিসের অবস্থা ভাল না। বেশীর ভাগ লোক চাকরি বাচাতেই ব্যস্ত। অনেকে সেলারি পায় না তবু চাকরি করে যাচ্ছে। অনেকে নানান রকম ধান্ধা করে টিকে আছে। যার ধান্ধা ভালো হয় সে গাড়ি বাড়ি করছে।
এক হাউজের খবর আরেক হাউজ জানে।
জেনে সবাই চুপ করে থাকছে। নিজেদের স্বার্থে। পত্রিকা কি করে উন্নত হবে সেটা নিয়ে কারো চিন্তা ভাবনা নেই। সবাই নিজের উন্নতি নিয়েই ব্যস্ত। এদিকে পত্রিকা অফিস দুই রকমের হয়। একটা পত্রিকা টিকে থাকার জন্য আপ্রান চেষ্টা করে, লড়াই করে। আরেকটা পত্রিকা কালো টাকা সাদা বানানোর জন্য এবং ক্ষমতার দাপট দেখানোর জন্য। বেশী ভাগ পত্রিকা অফিসই ধুমধাম করে শুরু হয়। বছর না যেতেই তাদের অবস্থা করুন হয়। গ্রাম থেকে এসেই মামা চাচার মাধ্যমে পত্রিকা অফিসে একটা চাকরি পেয়ে গেলেই, সে নিজেকে বড় সাংবাদিক বলে দাবি করে। অথচ আমাদের দেশে সৎ, নিষ্ঠাবান, পরিশ্রমী সাংবাদিক একজনও নেই। বেশীর ভাগই কপি পেস্ট সাংবাদিক। অনলাইন নিউজপোর্টাল গুলো দেশের সংবাদ পত্রের সবর্নাশ করেছে।
সর্বশেষ এডিট : ১০ ই মার্চ, ২০২১ বিকাল ৪:০৯

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।




