
মওলানা আবদুল হামিদ খান ভাসানী’র সততা, দেশপ্রেম ও দূরদর্শিতাসম্পন্ন ক্ষমতা কারো অজানা নয়। দূরদর্শিতাসম্পন্ন ক্ষমতার বলেই হয়তো তিনি পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার এক দশক পর এবং স্বাধীনতা যুদ্ধের ১৪ বছর পূর্বেই ঐতিহাসিক কাগমারী সম্মেলনে ১৯৫৭ সালের ৮ ফেব্রুয়ারী সর্বপ্রথম পাকিস্তানকে “আসসালামু আলাইকুম” জানিয়ে দিয়েছিলেন যার অর্থই ছিলো, পূর্ব বাংলা থেকে বিদায় হও। এ বাক্যের মাধ্যমেই সেদিন তিনি স্বাধীনতার বীজ বপন করে দিয়েছিলেন স্বাধীনতাকামী প্রতিটি বাঙালীর মনে। সময় গড়ানোর সাথে সাথে সেই বীজ বৃক্ষে পরিণত হলো, ডালপালা ছড়ালো, ফল দিতে শুরু করলো ’৭০-’৭১ এ।
১৯৭০ সালের ১২ নভেম্বর দেশের দক্ষিণাঞ্চলে প্রলয়ঙ্করী ঘূর্ণিঝড় ও জ্বলোচ্ছ্বাসে লক্ষ লক্ষ মানুষ মারা যাওয়ার পরও দুর্গত এলাকায় ত্রাণ না পৌঁছায় মওলানা ভাসানী বিক্ষুদ্ধ হয়ে ফেটে পড়েন এবং ২৩ নভেম্বর পল্টনে জনসভায় তিনি ভাষন দেন। ভাষনের এক পর্যায়ে হৃদয়বিদারক কন্ঠে তিনি পাকিস্তান শাসকগোষ্ঠীকে উদ্দেশ্য করে বলেন, 'ওরা কেউ আসে নাই'। এরপর তার মুখ থেকে বেরিয়ে আসলো সেই ঐতিহাসিক ঘোষণা, 'আজ থেকে ১৩ বছর পূর্বেই ষড়যন্ত্র, অত্যাচার, শোষণ আর বিশ্বাসঘাতকতার নাগপাশ হইতে মুক্তি লাভের জন্য দ্ব্যর্থহীন কন্ঠে 'আসসালামু আলাইকুম' বলিয়াছিলাম।
সংখ্যাগরিষ্ঠদের ভোটে নির্বাচিত বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে ক্ষমতা হস্তান্তর নিয়ে তালবাহানা চলাকালীন সময়ে বঙ্গবন্ধু যখন তাদের সাথে আলোচনা করছিলেন তখন ৯ ই জানুয়ারী ১৯৭১ সালে পল্টন ময়দানে বিরাট জনসভায় মওলানা ভাসানী শেখ মুজিবকে উদ্দেশ্য করে বলেন, 'আলোচনায় কিচ্ছু হবে না, ওদের আসসালামু আলাইকুম জানিয়ে দাও'।
যুদ্ধ শুরু হবার পর ৪ এপ্রিল পাকসেনারা মওলানা ভাসানীকে হত্যা অথবা গ্রেফতাদের উদ্দেশ্যে সন্তোষে এসে তাকে খুঁজতে থাকে এবং জিজ্ঞেস করে, 'কাফের ভাসানী কোথায়'? তাকে না পেয়ে তার বাড়িঘর আগুন দিয়ে জ্বালিয়ে দেয়। পাকবাহিনীর দৃষ্টি এড়িয়ে নানা কৌশলে মওলানা ভাসানী পাড়ি জমান ভারতে। ভারতে প্রবেশের পরদিন আনন্দবাজার পত্রিকার কলাম জুড়ে ছাপা হয়, 'সীমান্তের এপার ভাসানী– সজল চোখে সাহায্য প্রার্থনা'। সেখানে লেখা হয়- 'বাংলাদেশের জনগণের উপর পাকিস্তানি জঙ্গি ফৌজের নির্যাতন বন্ধের জন্য তিনি করজোড়ে ও সজল চোখে ভারত সরকারের কাছে নৈতিক সমর্থন ও সাহায্য প্রার্থনা করেন'।
মওলানা ভাসানী আমেরিকার প্রেসিডেন্ট রিচার্ড নিক্সনের কাছে ব্যক্তিগত বার্তা পাঠিয়ে বাংলাদেশে গণহত্যার ভয়াবহতা সম্পর্কে অবহিত করেন এবং পাকিস্তানকে অস্ত্র সরবরাহ বন্ধের দাবি জানান। পত্রপত্রিকাতে ফলাও করে প্রচারিত হয় 'আর অস্ত্র দেবেন না' – মওলানা ভাসানী।
স্বাধীন বাংলার বিরোধী এবং স্বৈরাচারী ইয়াহিয়ার মদদদাতা পরাক্রমশালী আমেরিকার প্রেসিডেন্টকে তিনি পশ্চিম পাকিস্তানিদের দ্বারা বাংলাদেশে লুটতরাজ, অগ্নিসংযোগ, গুন্ডামী, গণহত্যা ও নারী নির্যাতনের প্রকৃতি তুলে ধরার জন্য বিদেশী সাংবাদিকদেরকে বাংলাদেশে পরিভ্রমণের ব্যবস্থা গ্রহণও করতে বলেন ।
চীনের চেয়ারম্যান মাও সে তুঙ এবং প্রধানমন্ত্রী চৌএন লই কে তিনি তাদের সরবরাহ করা আধুনিক যুদ্ধাস্রের সাহায্যে বাংলাদেশে যে নিষ্ঠুর ও নৃশংসভাবে নির্যাতন চালানো হয়েছে তার বর্ননা দিয়ে সনির্বন্ধ অনুরোধ করেন, 'বাংলাদেশের স্বাধীন গণতান্ত্রিক সরকারকে আপনি সমর্থন করুন, স্বীকৃতি দিন ও সর্বপ্রকারের সাহায্য করুন'।
একের পর এক বিবৃতি দিয়ে ভাসানী মুক্তিযোদ্ধাদের উদ্বুদ্ধ ও উজ্জীবিত করেন যার ফলে মুক্তিযুদ্ধের গতিবেগ আরো ত্বরান্বিত হয়। ভারতের প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধী মওলানা ভাসানীর সঙ্গে দেখা করতে এলে মওলানা ভাসানী তাকে স্বাধীনতা যুদ্ধে বাংলাদেশকে সাহায্য সহযোগিতা ও শরনার্থীদেরকে আশ্রয় দেয়ায় জন্য কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেন এবং মুক্তিযুদ্ধকালীন সময়ে তাকে মেহমানদারির জন্য ধন্যবাদ জানান সেই সাথে বাংলাদেশকে স্বীকৃতি প্রদানের অনুরোধ জানান।
বঙ্গবন্ধুর অবর্তমানে বাংলাদেশ সরকার পরিচালনা ও মুক্তিযুদ্ধ চালিয়ে নেয়ার জন্য সর্বদলীয় উপদেষ্টা কমিটির সভাপতি হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন স্বাধীনতার স্বপ্নদ্রষ্ট্রা মওলানা ভাসানী। ভাসানীর নেতৃত্বে চারটি প্রগতিশীল দলের প্রতিনিধি (তাজউদ্দিন আহমেদ, খন্দকার মোশতাক আহমদ, কমরেড মনি সিং, শ্রী মনোরঞ্জন ধর, অধ্যাপক মোজাফফর আহমেদ) নিয়ে কমিটি গঠন করা হয়। কমিটি গঠন করা হলেও তাদের মধ্যে ঐক্যের যথেষ্ট অভাব ছিলো।
স্বাধীনতাকামী পরিচয় দিয়ে গোপনে আঁতাত করে যারা সমঝোতা করতে চেয়েছিলেন তাদের উদ্দেশ্যে ভাসানী বিবৃতি দিলেন। মওলানা ভাসানী সাহসীকতা ও বিচক্ষণতার সাথে এ ষড়যন্ত্রকে প্রতিহত করে স্বাধীনতা সংগ্রামকে আরো শক্তিশালী ও গতিশীল করে বিজয়ের পথে নিয়ে যায়। সেজন্যই ১৬ ডিসেম্বর দেশ স্বাধীন হওয়া স্বত্বেও মওলানা ভাসানী স্বাধীন দেশে পা রাখেন পাকিস্তানে কারাবন্দী বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের দেশে ফেরার ১২ দিন পর। ভাসানী বলতেন, আমি হিন্দুস্থানের সাহায্য-সহযোগিতা চাই কিন্তু তাদের উপর নির্ভরশীল হতে চাই না'।
তথ্যসুত্রঃ
১। আমেল মুক্তিযোদ্ধার খোঁজে, লেখক- শাকের হোসাইন শিবলি
২। স্বাধীনতা ভাসানী ভারত, লেখক- সাইফুল ইসলাম
৩। মওলানা ভাসানীঃ রাজনৈতিক জীবন ও সংগ্রাম, লেখক- শাহরিয়ার কবির
সর্বশেষ এডিট : ২৮ শে মার্চ, ২০২১ দুপুর ২:১৭

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।




