
ছবিঃ ইন্টারনেট।
বালাসুর বাজারের পেছনে একটা মসজিদ আছে।
আমি যদি ভুল না করে থাকি তাহলে মসজিদের নাম- 'আল মুকাদ্দেস'। এই মসজিদটি তৈরি করে দিয়েছেন আমার দাদার চাচাতো ভাই। মসজিদ তৈরি করার কারন হলো- আল্লাহ বলেছেন, 'দুনিয়াতে যে মসজিদ বানাবে বেহেশতে আমি তার জন্য ঘর বানাবো'। আমার দাদার চাচা এই জন্য অনেক টাকা খরচ করে মসজিদ বানিয়েছেন। আমি জানি না, আমার দাদার চাচা এখন কোথায় আছেন। বেহেশতে আছেন না দোজকে আছেন। হিসাব অনুযায়ী আমার দাদার চাচা এখন বেহেশত বা দোজকে নাই। কারন, কেয়ামত হবে। হাশরের ময়দানে বিচার হবে। তারপর বেহোশত বা দোজক নির্ধারন হবে।
যাই হোক, এটা ধর্মীয় পোষ্ট নয়। তবে আমার দাদার চাচা যদি মসজিদ না বানিয়ে অসহায় মানুষদের জন্য একটা বাড়ি বানাতেন তাহলে খুব ভালো হতো। কারন, আমাদের এলাকা হলো নদী ভাঙ্গন এলাকা। প্রতিবছর অসংখ্য মানুষের ঘরবাড়ি পদ্মা নদী খেয়ে ফেলে। তখন তাঁরা খোলা আকাশের নীচে ঘুমায়।
আল মুকাদ্দেস মসজিদের সামনে একটা বাচ্চা মেয়ে বসে আছে।
সে কাঁদছে। দেখেই বুঝা যায়- অসহায় ও দরিদ্র একটি মেয়ে। আমার দাদা আছরের নামজ শেষ করে বাসায় ফেরার পথে মেয়েটিকে জিজ্ঞেস করলেন কাদছো কেন গো মা? মেয়েটি কিছু বলে না। শুধু কেঁদেই যাচ্ছে। মেয়েটির হাতে একটা পোটলা। মেয়েটির বয়স ৬/৭ বছর হবে। দাদা মেয়েটিকে বাড়ি নিয়ে আসেন। সময় তখন ১৯৮৫ সাল। তখনও আমি পৃথিবীতে আসি নি। তবে আসি আসি করছি। যাই হোক, দাদী বললেন, আমার পাঁচ মেয়ে আল্লাহ দিয়েছেন। এখন মেয়ের সংখ্যা হলো ছয়। দাদী বললেন, তোমার কি নাম আমি জানি না। জানতে চাইও না। কোথা থেকে এসেছো তাও জানতে চাই না। আজ থেকে তোমার নাম জরিনা। তুমি আমাদের সাথে থাকবে। কোনো কিছু নিয়েই তোমাকে আর চিন্তা করতে হবে না।
জরিনাকে স্কুলে ভর্তি করিয়ে দেওয়া হলো।
জরিনা স্পষ্ট করে বলল, লেখাপড়া ভালো লাগে না। করবো না। আমি ঘরের কাজ করবো। এরপর জরিনা সারাক্ষণ দাদীর সাথে রান্না ঘরে থাকে। দাদীকে রান্নার কাছে সহযোগিতা করে। উঠান ঝাড়ূ দেয়। কল থেকে পানি তুলে দেয়। দেখা গেল জরিনা খুব কর্মঠ মেয়ে। মেয়েটা কোথা থেকে এসেছে, এবং বাবা মায়ের নাম কিছুই বলতে পারেনি। মেয়েটা আমাদের গ্রামের বাড়িতে পাঁচ বছর পার করে ফেলেছে। কেউ তাকে নিতে আসেনি। এমন কি কেউ তার খোজও করেনি। বার্ষিক পরীক্ষা শেষে আমি আব্বার সাথে গ্রামের বাড়িতে যাই। তখন প্রথম জরিনাকে দেখি। জরিনা আমাকে পুকুরে কিভাবে মাছ ধরতে হয় শিখিয়েছে। আর কিছুদিন থাকলে সাঁতারটাও শিখিয়ে দিতো। আমার চোখে বাসে কালো করে একটা মেয়ে। ফ্লক পরা। মাথায় দুটা বেনী। স্বাস্থ্য ভালো।
দেখতে দেখতে জরিনার ২৫ বছর হয়েও গেলো।
একদিন দাদী বললেন, জরিনা আমার শরীরের অবস্থা ভালো না। আমি বেঁচে থাকতেই তোমার বিয়ে দিয়ে যেতে চাই। আব্বা জরিনার জন্য একটা ভালো ছেলে খুঁজে বের করলো। বিয়ের সমস্ত খরচ আব্বা দিলো। গ্রামে ধূমধাম করে বিয়ে হয়ে গেলো। বিয়ের পর জরিনা তার স্বামীর সাথে ঢাকা চলে এলো। তার নতুন সংসার জীবন শুরু হলো। জরিনা সব সময় দাদা দাদী থেকে শুরু করে আমাদের পরিবারের সবার খোঁজ খবর রাখতো। একদিন দাদা দাদী মারা গেলেন। জরিনা খবর পেয়ে ছুটে এলো। মাটিতে গড়াগড়ি করে খুব কান্না করলো। এই কিছুদিন আগে আব্বা মারা গেলো জরিনা এসে খুব কান্না করলো। জরিনার স্বামী একটা অফিসের পিয়ন ছিলো। হঠাত তার চাকরী চলে যায়। তখন আব্বা জরিনার স্বামীকে একটা চায়ের দোকান দিয়ে দেয়। পিয়নের চাকরিটাও আব্বাই দিয়েছিলো। পল্টন তার চায়ের দোকান। আমি মাঝে মাঝে সেই চায়ের দোকানে যাই।
জরিনার বর্তমান অবস্থা এই রকমঃ
জরিনা ঢাকা শান্তিনগর থাকে। তার স্বামী চায়ের দোকান থেকে বেশ ভালৈ ইনকাম করছে। তাদের তিন কন্যা। তিনজনই স্কুলে পড়ছে। জরিনার বড় মেয়ে ক্লাশ নাইনে পড়ছে। জরিনা আর্থিক সমস্যায় পড়লে আমাদের বাসা আছে। আমার মা যা পারে দিয়ে দেয়। করোনার সময় মা জরিনাকে ডেকে কিছু সাহায্য করেছিলো। আমাদের বাসায় যখন কোনো অনুষ্ঠান হয়, জরিনা চলে আসে। রান্না বান্নায় সে সাহায্য করে। জরিনার সাথে আমার পারিবারিক অনুষ্ঠানে প্রায়ই দেখা হয়। কিন্তু কথা হয় না। কয়েকদিন আগে পরীর জন্মদিনে জরিনা এসেছিলো। আমি বললাম, কেমন আছো? কি খবর? জরিনা বলল, আপনাদের দোয়ায় স্বামী সন্তান দিয়ে খুব ভালো আছি। দোয়া করবেন ভাই। প্রতি ঈদে আমি জরিনাকে একটা শাড়ি দেই। গত দুই বছর জরিনাকে কিছুই দেওয়া হয়নি।
সর্বশেষ এডিট : ১৯ শে নভেম্বর, ২০২১ দুপুর ২:৩১

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।




