somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

পোস্টটি যিনি লিখেছেন

রাজীব নুর
আমার নাম- রাজীব নূর খান। ভালো লাগে পড়তে- লিখতে আর বুদ্ধিমান লোকদের সাথে আড্ডা দিতে। কোনো কুসংস্কারে আমার বিশ্বাস নেই। নিজের দেশটাকে অত্যাধিক ভালোবাসি। সৎ ও পরিশ্রমী মানুষদের শ্রদ্ধা করি।

প্রজাপতি

১০ ই জুন, ২০২২ রাত ১২:৩৩
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :

ছবিঃ কালের কন্ঠ।

কয়েকদিন আগে একটা বিয়ের অনুষ্ঠানে যাই।
অস্টেলিয়া প্রবাসী ছেলেমেয়ের বিয়ে। তাঁরা বিয়ে করার জন্যই দেশে এসেছে। সুরভি বিয়েতে যায়নি। সে তার বান্ধবীদের সাথে বের হয়েছে। কমিউনিটি সেন্টারে বিয়ে। বিরাট আয়োজন। একপাশে গান বাজনার আয়োজন। সেন্টারে কমপক্ষে ৫ শ' মানুষ হবে। সবাই গল্প করছে। ছবি তুলছে। অকারনে হাসছে। কেউ কেউ মন দিয়ে গান শুনছেন। খাবার দিবে রাত সাড়ে ন'টায়। এখনও আধা ঘন্টা দেরী আছে। আমি হাতে কফি নিয়ে চারপাশ ঘুরে ঘুরে দেখছি। মেয়ে গুলো খুব সুন্দর করে সেজেছে। মনে হচ্ছে তাঁরা বেহেশতের হুর। মুগ্ধ হয়ে তাদের দিকে না তাকানোটাই অন্যায়। হঠাত একটা মেয়েকে দেখলাম। দেখে বুকের মধ্যে একটা গভীর ধাক্কা খেলাম। মেয়েটাকে আমি চিনি। খুব ভালো করেই চিনি। মেয়েটার নাম সাদিয়া।

সাদিয়ার সাথে আমার শেষ দেখা হয়েছিলো বিশ বছর আগে!
সাদিয়াকে দারুন সুন্দর দেখাচ্ছে! অথচ সে খুব সাজেনি। সাজ বলতে চোখে কাগল আর কপালে একটা টিপ। মুখটা কেমন বিষন্ন-বিষন্ন! তবে শাড়িটা পড়েছে খুব সুন্দর করে। পুরো হল জুড়ে অসংখ্য নারী পুরুষ। অথচ আমি তাকিয়ে আছি সাদিয়ার দিকে! সাদিয়া কি আমাকে চিনতে পারেনি? যেহেতু আমি তাকে চিনেছি, তাহলে সে আমাকে চিনবে না কেন? সে আমাকে নিজের হাতে চা বানিয়ে দিয়েছে। ভোর বেলা আমাকে ঘুম থেকে ডেকে তুলেছে। আম গাছে উঠে, আম পেরে খাইয়েছে। পুকুর ঘাটে বসে কত গল্প করেছি। কত সৃতি আমাদের! আমার জীবনে আমি প্রথম যে মেয়েটার হাত ধরি তার নাম সাদিয়া। যে মেয়েটাকে দেখে ভালো লাগতো তার নাম সাদিয়া। আমার বন্ধু মিজান সাদিয়াকে নিয়ে দুই শ' কবিতা লিখেছে। আমি কিচ্ছু ভুলিনি। সব আমার মনে আছে।

তখন আমার বয়স উনিশ।
অথচ চোখে মুখে একটা কিশোর ভাব। দাঁড়ি ভালো করে গজায়নি। কলেজে পড়ি। কলেজে আমার বন্ধু ছিলো- মিজান। মিজান গ্রাম থেকে এসেছে। মিজানের বাড়ি ফরিদপুর। রসুলপুর গ্রাম। কলেজে ম্যাগাজিনেড় লেখার জন্য লেখা সংগ্রহ করার দায়িত্ব পড়লো আমার উপর। মিজান একটা দীর্ঘ কবিতা লিখেছে। সেই কবিতা ৭০ লাইন। আমি মিজানকে বললাম, সুন্দর কবিতা লিখেছো। কিন্তু এই কবিতা ছাপাতে ২/৩ পাতা লেগে যাবে। তুমি কবিতাটি আর একটু ছোট করে দাও। মিজান বলল, আমার কবিতা ছাপানোর দরকার নেই। আমার কবিতা আমাকে ফেরত দিয়ে দাও। মিজানের কবিতার প্রথম দুই লাইন এরকম ছিলো- ''মলিন করো না সুন্দর মুখখানি, আমার ভীষণ অস্থির লাগে!/ বিশ্বাস আর অবিশ্বাস দূরে সরিয়ে, আসো দুজন বাঁচি আনন্দ নিয়ে''। যাই হোক, মিজানের সাথে আমার গভীর বন্ধুত্ব হয়ে গেলো। সামনে কলেজ বন্ধ। লম্বা ছুটি। পুজো এবং ঈদ এর একসাথে ছুটি। মিজান বলল, তুই আমার সাথে আমাদের গ্রামে চল। ঈদের আগে চলে যাবি।

আমি মিজানের সাথে গেলাম ফরিদপুর।
ফেরী পার হওয়ার পর পড়লাম বিরাট বিপদে। হঠাত আকাশ কালো হতে শুরু করলো। অথচ কিছুক্ষন আগেও রোদ ছিলো। আমাদের কপাল খারাপ! হঠাত শুরু হলো ঝড়। বিরাট ঝড়! আমাদের চোখের সামনে পটপট দু' তিনটা গাছ ভেঙ্গে পড়লো। একটা গরু মাঠে ঘাস খাচ্ছিলো, সে উড়ে গিয়ে পড়লো পুকুরের ঘাটলার সামনে। আমি আর মিজান দুজন দুজনকে ধরে রেখেছি শক্ত করে। কি করবো কিছুই বুঝতে পারছি না। ঝড় কমছেই না। ভয়াবহ অবস্থা! আমার আর মিজানের ব্যাগ ঝড়ে দূরে কোথাও উড়ে গেলো। টানা বিশ মিনিট ঝড় হলো। চারপাশ লন্ডভন্ড অবস্থা! ঝড়ের পর শুরু হলো বৃষ্টি! এরকম বৃষ্টি জীবনে দেখি নাই। ঝড় বৃষ্টি পার হয়ে একসময় মিজানের বাড়িতে এসে পৌঁছলাম। মিজানের বাবা মা দৌড়ে এলেন। আমাকে আর মিজানকে বুকে জড়িয়ে ধরলেন। এরকম ঝড়ের মধ্যে যে আমরা বেঁচে আছি, এটাই বিস্ময়কর! আশেপাশের বাড়ির মানুষজন আমাদের দিকে অবাক চোখে তাকিয়ে আছেন!

রাতে আমি আর মিজান গভীর ঘুম দিলাম।
মিজান আমার আগেই ঘুম থেকে উঠে গেছে। সকালে দেখি এক মেয়ে আমার জন্য চা নিয়ে এসেছে। মেয়েটা সহজ সরল সুন্দর। এলোমেলো করে শাড়ি পরা। মেয়েটা বলল, চা নিন। এই মেয়ের নাম সাদিয়া। ভেবেছিলাম মিজানের গ্রামের বাড়িতে দু দিন থাকবো। অথচ থেকে গেলাম টানা দশ দিন। সাদিয়া না থাকলে দুই দিনের বেশি থাকতাম না। সাদিয়া মিজানের কেমন যেন আত্মীয় হয়। সাদিয়ারা ঢাকায় থাকে। বেড়াতে এসেছে। মিজান সাদিয়াকে কখনও দেখেনি। মিথ্যা বলব না, মেয়েটাকে আমার খুব ভালো লেগে যায়। আমার ধারনা সাদিয়াও আমাকে পছন্দ করে। কিন্তু ঝামেলা পাকালো বন্ধু মিজান। মিজান একদিন একটা কাগজ আমার হাতে দিলো। দেখলাম কাগজে কবিতা লেখা। মিজান সাদিয়াকে নিয়ে কবিতা লিখেছে। গভীর ভালোবসার কবিতা। ভীষন দুঃখ লাগলো। কষ্ট হলো। বন্ধুর কথা ভেবে সাদিয়ার সাথে সম্পর্ক হালকা করে ফেললাম। মিজান খুবই ভালো একটা ছেলে। আমি মিজানকে কষ্ট দিতে পারবো না। ঢাকা ফিরে এলাম এবং সাদিয়ার সাথে আর কোনো যোগাযোগ রাখলাম না।

বিশ বছর পর সাদিয়ার সাথে দেখা।
সাদিয়া আমার সাথে কোনো কথা বলে নি। তাই আমিও নিজ থেকে সাদিয়ার সাথে কোনো কথা বলিনি। বিয়ের অনুষ্ঠান থেকে আমি বাসায় ফিরবো। নতুন স্বামী স্ত্রীর কাছ থেকে বিদায় নিলাম। তখন সাদিয়া আমাকে একটা কাগজে তার মোবাইল নম্বর লিখে আমায় দিলো। দুইদিন পর আমি সাদিয়াকে ফোন দেই। জানতে পারি- মিজানের সাথে তার বিয়ে হয়নি। মিজান সড়ক দূর্ঘনায় মারা যায়। সাদিয়ার স্বামী বিদেশ থাকে। বিদেশে সে আরেকটা বিয়ে করেছে। বিদেশ থেকেই সাদিয়াকে সে তালাক দিয়েছে। সাদিয়া এখন তার মামা মামীর সাথে থাকে মোহাম্মদপুর। সে একটা মেয়েকে দত্তক নিয়েছে। মেয়েটার এখন দশ বছর বয়স। সাদিয়া একটা কলেজে পড়ায়। এই হলো সাদিয়ার বর্তমান অবস্থা। মিজান সাদিয়াকে নিয়ে লেখা দুই শ' কবিতা থেকে একশ'' কবিতা বাছাই করে একটা কবিতার বই প্রকাশ করে। বইটা সে আমাকে উতসর্গ করে। বইটার নাম 'প্রজাপতি'।
সর্বশেষ এডিট : ১০ ই জুন, ২০২২ রাত ১২:৩৩
১৩টি মন্তব্য ১৩টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

জাতীয় জন্মসনদে ভুলের ভূত আর সাভারের জালিয়াতি চক্র: সাধারণ মানুষের ভোগান্তি কি কোনোদিন থামবে না?

লিখেছেন শাম্মী নূর-এ-আলম রাজু, ০৬ ই অক্টোবর, ২০২৬ দুপুর ১২:০০



আজ ৬ অক্টোবর, জাতীয় জন্ম ও মৃত্যুনিবন্ধন দিবস। এবারের প্রতিপাদ্য ঠিক করা হয়েছে—‘নির্ভুল নিবন্ধন, নিশ্চিত হবে সুশাসন’। অথচ বাস্তবতা যেন এই স্লোগানের একদম উল্টো! সরকারি নথিতে যখন সাধারণ... ...বাকিটুকু পড়ুন

দেশভাগ, উদ্বাস্তু এবং রোহিঙ্গা

লিখেছেন রাজীব নুর, ০৬ ই অক্টোবর, ২০২৬ দুপুর ১২:৪২



দেশভাগের অনেক পরে আমার জন্ম।
আমি দেশভাগের ইতিহাস জানি। দেশভাগের পরে যা হয়েছে, অতি মন্দ সব ঘটনা ঘটেছে। লাখ লাখ মানুষ প্রাণ হারিয়েছে এবং হাজার হাজার নারী নির্যাতনের... ...বাকিটুকু পড়ুন

টারজান থেকে আইনস্টাইন

লিখেছেন রাজীব নুর, ০৬ ই অক্টোবর, ২০২৬ বিকাল ৫:১৭



১৯৪৭ সালের ডিসেম্বর মাস। হাড় কাঁপানো ঠান্ডা।
প্রচন্ড শীতে এক বালক রাস্তা দিয়ে একাএকা হাঁটছে। বালক জানে না- তার বাবা কে, মা কে? ক্ষুধা পেলে একটা খাবার দোকানের... ...বাকিটুকু পড়ুন

এদেশে এখন শেখ হাসিনা প্রয়োজন- নাকি আমরা তাঁর সময়ের কিছু বাস্তবতাকে নতুন করে অনুভব করছি?

লিখেছেন এস.এম. আজাদ রহমান, ০৬ ই অক্টোবর, ২০২৬ সন্ধ্যা ৭:৫৭


এদেশে এখন শেখ হাসিনা প্রয়োজন- নাকি আমরা তাঁর সময়ের কিছু বাস্তবতাকে নতুন করে অনুভব করছি?

একটা সময় ছিল- শেখ হাসিনার নাম উচ্চারণ করলেই কারও চোখে ক্ষোভ, কারও মনে শ্রদ্ধা,... ...বাকিটুকু পড়ুন

কৃত্তিম বুদ্ধিমত্তার দৃষ্টিতে - 'ব্লগার ওমর খাই-আম' বনাম 'ব্লগার সত্যপথিক শাইয়্যান'

লিখেছেন সত্যপথিক শাইয়্যান, ০৭ ই অক্টোবর, ২০২৬ রাত ১২:৩২



চ্যাটজিপিটিকে আমার এবং ওমর খাই-আমের ব্লগপেইজের লিংক দিয়ে বলেছিলাম মূল্যায়ন করতে। সে আমাদের রেটিং দিয়েছে এরকম -
সত্যপথিক শাইয়্যানঃ 8.0/10, আর ব্লগার ওমর খাই-আমঃ 7.8/10!!!

বিস্তারিত মূল্যায়ন শেষে সে... ...বাকিটুকু পড়ুন

×