
রতন নামের ১২/১৩ বছরের এক মেয়ে হাসতে হাসতে ঘরে প্রবেশ করে। তারপর বলে, দাদাবাবু আমাকে ডেকেছিলে?
রতন, কালই আমি যাচ্ছি।
কোথায় যাচ্ছো দাদাবাবু।
বাড়ি যাচ্ছি।
আবার কবে আসবে?
আর আসবো না।
রবীন্দ্রনাথের জন্মের আগে কিছু মহৎ মানুষের জন্ম হয়েছিল অবিভক্ত ভারতে।
রামমোহন, বিদ্যাসাগর। তারা দু'জনেই সমাজ বদলে দেওয়ার জন্য কাজ করে গেছেন। রবীন্দ্রনাথ সেই ধারাটা অব্যাহত রেখেছেন। সাহিত্য দিয়ে সমাজ সংস্কার করা খুব সহজ কাজ নয়। গুরুজী ১৮৯১ সালে 'পোস্টমাস্টার' গল্পটি লিখেন। একজন লেখক তার রচনা দিয়ে পাঠককে শুধু আনন্দ দেন না, মাঝে মাঝে কষ্টও দেন। পোস্টমাস্টার গল্পের রতনের জন্য আমার কষ্ট হয়। আর পোস্টমাস্টারের জন্য রাগ হয়। মনে মনে পোস্টমাস্টারদের গালি দেই। অনেক ধার্মিকদেরও আমি গালি দেই। গালি দিয়ে এক কুৎসিত সুখ পাই। সে যাকগে, রবীন্দ্রনাথ মানুষটা সহজ সরল এবং মানবিক ছিলেন। বেচারার জন্য আমার মায়া হয়। আমি বলব উনি একজন দু:খী মানুষ। দুঃখী মানুষেরা তাদের দুঃখকষ্ট চারিদিকে ছড়িয়ে দেয়।
পোস্টমাস্টার গল্পে দেখা যায়, উলাপুর গ্রামে পোস্টমাস্টারের কর্মজীবন শুরু হয়।
কলকাতা ছেড়ে পোষ্টমাস্টার এই প্রথম গ্রামে আসে। সময় বর্ষাকাল। সারাদিন থেমে থেমে বৃষ্টি। রবীন্দ্রনাথের প্রিয় ঋতু বর্ষা। এজন্য গল্পের সময়টা বর্ষাকাল। রাস্তাঘাট প্যাককাঁদায় মাখামাখি। পোষ্টমাস্টার সাহেব বেশ অসহায় বোধ করে। শহরের মানুষ বলে, গ্রামের মানুষের সাথে অবলীলায় মিশতে পারে না। একাকীত্ব পেয়ে বসে তাকে। ফলে সে কবিতা লিখতে চেস্টা করে। আসলে সে একাকীত্ব থেকে বাচিতে কবিতায় আশ্রয় নেয়। আমার কথা হলো, তুই চাকরি নেবার আগে কেন ভাবলি না, তোকে গ্রামে যেতে হবে। আর গ্রামীন জীবন কেমন তুই জানিস না? বাস্তব জীবনে আমি অনেক দেখেছি, শহরের বাইরে পোস্টিং হলে যেতে চায় না। গল্পে পোষ্টমাস্টারের তেজ আছে। সে বদলি হয়ে শহরে যাওয়ার জন্য চিঠি লিখে। বড় স্যার চিঠি নাকচ করে দেয়। পোষ্টমাস্টার হাসিমুখে চাকরি ছেড়ে দেয়। নিডি মানুষেরা লাথথি দিলে চাকরি ছাড়ে না।
পোস্টমাস্টার গল্পে রতন নামে একটা দু:খী মেয়ে আছে।
মেয়েটির বাবা-মা কেউ নেই। রতন খাবারের আশায় মানুষের টুকটাক কাজ করে দেয়। রতন পোস্টমাস্টারের সেবা যত্ন করে, তার জন্য রান্না করে। পোস্টমাস্টার রতনকে লেখাপড়া শেখায়। রতন মনে মনে ভাবে এই পোস্টমাস্টার আমার বাবা অথবা বড় ভাই হলে ভালো হতো। এদিকে গ্রামে পোস্টমাস্টারের একদম ভালো লাগে না। সে কলকাতায় ফিরে যেতে চায়। আসলে শহরের অল্প কিছু মানুষ গ্রামীণ জীবনের সাথে মানিয়ে নিতে পারে না। শহরের মানুষ গুলো কুটিল এবং জটিল হয়ে থাকে। প্রতিটা শহর কুটিল জটিল মানুষদের ভার বইতে বইতে ক্লান্ত। শহরের মানুষদের বিভূতিভূষণের লেখা গুলো পড়া উচিৎ। যাইহোক, গল্পের শেষ দৃশ্যে দেখা যায়- পোষ্টমাস্টার সাহেব নৌকায় উঠে চলে যান। তখন একবার তার রতন মেয়েটির কথা মনে পড়ে। তার মানে এই না যে পোষ্টমাস্টার রতনের প্রেমে পড়ে গছে। এটা কিন্তু প্রেম নয়। এটা অপরাধবোধ।
পোস্টমাস্টার স্বার্থপর মানুষ।
শহরের মানুষ গুলো সব সময় স্বার্থপর হয়। সে অসুস্থ হয়েছিলো, বাচ্চা মেয়ে রতন তার সেবা করেছে। পোস্টমাস্টার সাহেব সুস্থ হয়ে এবং মনে মনে চাকরির মায়রে বাপ বলে, চাকরি ছেড়ে- কলকাতা চলে গেলো। পোস্টমাস্টারের উচিৎ ছিলো এই এতিম অনাথ মেয়েটাকে সাথে করে নিয়ে যাওয়া। মেয়েটাকে একটা উন্নত জীবন দেওয়া। বোকা মেয়ে রতন বিশ্বাস করে পোস্টমাস্টার একদিন ফিরে আসবে। এজন্য সে প্রায়ই ডাকঘরে ঘুরে বেড়ায়। পোস্টমাস্টারের জায়গায় আমি থাকলে বাপ-মা মরা মেয়েটাকে শহরে নিয়ে আসতাম। তাকে লেখাপড়া শেখাতাম। একদম নিজের মেয়ের মতো করে বড় করতাম। মেয়েটার প্রতিটা মুহুর্তে মনে হবে- লাইফ ইজ বিউটিফুল। অনেকে এই গল্প পড়ে মনে করছেন, রতন পোষ্টমাস্টারের প্রেমে পরে গেছে। ইহা ভুল। বাচ্চা মেয়ে প্রেমের কি বুঝে। এই মেয়ে তো আর এই যুগের না। সে পাকনা মেয়ে নয়। সে সহজ সরল মেয়ে।
সর্বশেষ এডিট : ২১ শে ফেব্রুয়ারি, ২০২৫ সকাল ১০:৩৪

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।



