মেয়েটার সাথে ফোনে কথা বলার পর থেকে মনটা মরিয়া হয়ে উঠল আর এক বার কথা বলার জন্য। আমার বান্ধবীর রূমমেট মেয়েটি দূরালাপনীতে কি যে মায়া ছড়াল বুঝতে পারলাম না। অন্য রকম একটা অনুভূতি নিয়ে কাটল আরও কিছু দিন। লজ্জায় তার নাম্বারও চাইতে পারলাম না। উপরওয়ালা সহায় হলেন, এক রাতে অচেনা নাম্বার থেকে মেয়েটির কণ্ঠ আমার কানে মধুবর্ষণ করল। তার নাম নৈঋত। নৈঋত মানে দক্ষিণ পশ্চিম কোণ। দীর্ঘ সময় কথা হল। জানা গেল তার প্রাণ প্রিয় বান্ধবীটি আমার সহপাঠিনী; অর্থাৎ আমরা একই বিশ্ববিদ্যালয়ের একই বিভাগে পড়ছি। দুই দিকের দুই খুঁটি কে অবলম্বন করে এক খানা সাঁকো পাতা গেল। আমরা আপনি থেকে তুমিতে আসলাম।

ভদ্রতার খাতিরে হোক আর বন্ধুত্ব রক্ষার তাগিদেই হোক আমরা যোগাযোগ রক্ষা করে চললাম। সিদ্ধান্ত হল আমরা কোন দিন দেখা করব না, কোন দিন না। এ দিকে একের পর এক সিম আর অপারেটর বদল করে মেয়েটা আমার মোবাইলে তার নামে অনেকগুলো নাম্বর জমা করতে থাকল। কারণ হিসাবে জানানো হল প্রযুক্তির উন্নয়নে নারীর ভোগান্তির কথা। উপরন্তু পিতার পরামর্শে কন্যা এমনটা করে চলেছে। কিন্তু কী এক অজানা কারণে প্রকাশ করে চলল বোঝা গেল না। কল্পনা তুলি দিয়ে হৃদয়ের ক্যানভাসে যখন তার ছবি আঁকতে শুরু করেছি তখন চলে গেছে দেড়টি বছর। অগ্রগতি ঐ ‘আপনি’ থেকে ‘তুমি’ তেই রইল।
দেশে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের ক্রান্তি কাল পাড়ি দিয়ে নির্বাচিত সরকার এল। দিন বদলের সরকার! হয়ত তাই দিন বদলের হাওয়া লাগেছিল আমার ভাঙ্গা নায়ের ছেঁড়া পালেও। শেষ কথাহীন রাজনীতির অকূল পাথারে কখন যে গা ভাসিয়েছি বুঝতেই পারি নাই। একটা সময় দেখলাম অচেনা দরিয়ার অনেক গভীরে চলে এসেছি। অদক্ষ নাবিকের আশু বিপদে ব্যথিত হয়ে সে পাঞ্জেরির ভূমিকায় অবতীর্ণ হল। সুস্থ স্বাভাবিকতার বন্দরে নোঙ্গর করা গেল। ঘনিষ্ঠতার সেই শুরু। মাস থেকে সপ্তাহ, সপ্তাহ থেকে কথা বলার ব্যাপ্তি যখন দিনে এসে ঠেকল তখন জানানো হল আর পারা যাচ্ছে না; অন্তত ছবি দেখাটাকে জায়েয করা হোক। যদিও কথা ছিল আমরা কখন দেখা করবো না; আমি সিলেটে আর সে ঢাকায়। কতটুকুইবা দূরত্ব, দেখা হলে মজা নষ্ট হয়ে যাবে। তার চেয়ে থাক অপেক্ষাতেই থাক, রহস্য হয়েই থাক। তবুও তিন বন্ধুতে ওঠা একখানা ছবি পাঠিয়ে উদ্বেগের মধ্যে রইলাম। সঠিক জনকে আবিষ্কার করে সে জানিয়ে দিল-‘তুমি না বাবু বাবু দেখতে’। তাকে তার করণীয় স্মরণ করিয়ে দিয়ে মাসের পর ধৈর্যশীলতার পরিচয় দিতে থাকলাম।
সম্পর্কের গভীরতা আর গাঢ়ত্ব আমাকে ভীত করে তুলল। ভীতির কারণ- অনাত্মীয় নর-নারীর সম্পর্ক হয় বাড়তে বাড়তে অনুরাগের কোঠায় গিয়ে পৌঁছায়, নয় কমতে কমতে পরিচয়ের পর্যায়ে নামে। অথচ দুটোর কোনোটাই আমার কাম্য নয়। কিছু বুঝে উঠতে না পেরে সাময়িক ছুটির আবেদন করলাম। ছুটি মঞ্জুর হোল। কিন্তু ছুটি শেষে যা শুনতে হোল তা এ রকম-তুমি একটা পাষান্ড, তুমি একটা চাপাবাজ, তুমি অসহ্য, তোমার সাথে কথা বলল না... যাও। কথাগুলো বলতে বলতে নৈঋত কান্নায় ভেঙ্গে পড়ল। যার সাথে সাথে এতটা পথ হেঁটেছি, যে মেয়েটা দেশকে নিয়ে দেশের মানুষকে নিয়ে এতো স্বপ্ন দেখে, হৃদয় যার আকাশের সমান, হাসি যার ঝর্ণর মত; তাকে কাঁদতে দেখে একেবারে অপ্রস্তুত হয়ে গেলাম। নিজেকে অপরাধী মনে হতে লাগল। এস এম এস এর আশ্রয় নিলাম-‘তোমায় আপন করে পাব বলে/ হারাই ক্ষণে ক্ষণে/ ও মোর ...।’
সময় বসে থাকেনি- এগিয়ে গেছি আমরাও। কখনো বাস্তবতায় আবার কখনো কল্পনায় ভর করে; নিজেদের মত করে। কখনো শিশির ভেজা ঘাসের উপর খালি পায়ে আবার কখনো বা সমুদ্র সৈকতে দু’জনাতে হেঁটেছি পাশপাশি, ঝিনুক কুড়িয়ে মালা গেঁথেছি আর বেলা ভূমিতে পায়ের ছাঁপ রেখে, ডানা মেলা গাঙ্গচিলের সাথি হয়ে ঘুড়ে বেরিয়েছি তেপান্তর, বাদ পড়ে নি বরফ ঢাকা প্রান্তরও। রং- বেরং এর ঘুড়ি উড়াই, রঙ্গিন ডানাওয়ালা প্রজাপতির পিছনে ঘুরাঘুরি করি। কখনো বা ঘুম না আসা জ্যোস্নাস্নত উদাসী রাতগুলোতে বেলকুনিতে মুখোমুখি বসে স্বপ্ন সাজাই দুজনে এক সাথে। দক্ষিণা হাওয়া ফুলের সুবাশে মোহিত করে তোলে আমাদের, আলোর প্রদীপ জ্বালিয়ে রাখে জোনাকীরা। নারিকেলের পাতায় পিছলে যাওয়া জ্যোস্না এসে পড়ে ওর মুখে, অদ্ভুত সুন্দর সেই অনুভূতি। যদিও সবই ঘটত কল্পনা, তবুও সে আনন্দ কম নয়। ভয় আর আশা মিশ্রিত কী একটা অনুভূতি। যা পাওয়াই হয়ে ওঠেনি তা হারানোর ভয় কেন হচ্ছিল জানি না।
একবার গল্প, একবার কবিতা, কখনো বা গান, এবার এর সাথে যোগ হয়েছে দেখা করার বায়না। এক দিন স্বরচিত একটা কবিটা শুনিয়ে সাদিয়া বলল ‘কোন দিন কারো প্রেমে পড়লে তাকে এই কবিতা শোনাব।’ আমি বললাম আমাকে কেন শোনালে? চিরচেনা সেই হাসি হাসতে হাসতে সে বলল, শুনেই যখন ফেলেছ, তাহলে শেষ লাইনটার উত্ত্র দাও।’
“তুমি কি থাকবে আমার সাথে?”
কিছু ক্ষণ বিমূঢ়ের মত থেকে বললাম, তোমাকে অনিচ্ছা আমার নেই, আবার না বলার সাধ্যও নয়। যোগ বিয়োগ করে যা অবশিষ্ট থাকল দুজনই বুঝলাম। সিদ্ধান্ত হোল আমরা দেখা করছি।
প্রকৃতি প্রস্তুতি নিচ্ছে আসন্ন শীতের আর আমরা প্রস্তুতি নিচ্ছে পরীক্ষার। জোড় প্রস্তুতি চলছে। সে দিন সে সারা রাত জাগল, আর ঘন্টায় ঘন্টায় ফোন করে আমাকেও জাগিয়ে রাখল। ভোরে বলল, ‘আজ তোমার কাছে একটা গিফট পৌঁছাবে, দুটো প্যাকেট থাকবে, একটা তোমার আর অন্যটা জাফর ইকবাল স্যারকে দিবে। আর হ্যাঁ পরীক্ষা শেষে বিকালে আমরা কথা বলবো। জাফর স্যারের লেখা ওর ভীষণ পছন্দের; স্যারের এ পর্যন্ত প্রকাশিত সব বই ওর পড়া। সত্যি সত্যি সকালে আমার কাছে ওর পাঠানো গিফট আমার কাছে পৌঁছল। স্বাভাবিক ভাবেই আমি অনেক আনন্দিত ছিলাম। তাকে জানানো দরকার। ফোন করতে থাকলাম, কিন্তু তাকে ফোনে পাওয়া গেল না। ভীষণ অস্থির লাগছিল।

আমার বান্ধবীটি নৈঋত সম্পর্কে যা বলল, তাতে আমার নাড়ীর সমস্ত রক্ত শুকিয়ে গেল। প্রচন্ড ভাবে নড়ে উঠল আমার অস্থিত্বের কংকাল। প্রথমে ভয় পেলাম, তার পর তীব্র বেদনা আর কষ্ট। শেষে শোকে পাথর হয়ে রইলাম। আমার সমস্ত স্বপ্ন ভেঙ্গে চুরমার হয়ে গেল। আমার যে স্মৃতি সুখের হতে পারত, সেই পবিত্র স্মৃতিটুকু বেদনার নীল রং এ ঢাকা পড়ল। আমি পাওয়ার আনন্দ থেকে বঞ্ছিত হলেও হারানোর বেদনা সমস্তটুকুই প্রাপ্ত হলাম। আমি কাঁদলাম, এত কান্না আর কখনো কাঁদি নি। পরের দিন পত্রিকায় ওর বড় বড় ছবি এল। প্রথম বারের মত তাকে দেখলাম, সুন্দর আমার কল্পনার চেয়েও সুন্দর। ছবির নিচে পত্রিকাওয়ালারা লিখেছে, “... তাকে তার হোস্টেলের রুম থেকে অগ্নিদগ্ধ মৃত অবস্থায় উদ্ধার করা হয়েছে।

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।


