somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

বৃষ্টি বিলাস

০৭ ই সেপ্টেম্বর, ২০১৫ দুপুর ২:৫৯
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :

আজও বৃষ্টি হচ্ছে সেই সকাল থেকে, থামার কোন লক্ষণ না থাকা বেশ ভদ্র গোছের বৃষ্টি। গত দু'দিনের সাথে আজকের পার্থক্য হল তখন হচ্ছিল 'ঝুম বৃষ্টি' আর এখন হচ্ছে 'ঝিরি ঝিরি বৃষ্টি'। না জোরে আর না আস্তে। অনেকটা প্রমথ চৌধুরীর "বৃষ্টি" প্রবন্ধের বৃষ্টির মত বৃষ্টি। গত দু'দিনের বন্দিদশার সাথে আরও একটা দিন যোগ হচ্ছে দেখে মনটা একটু নারাজ। তার পরও বৃষ্টি বলে কথা। বাহিরে তেমন কোন কাজ নেই, তবে চোখ রাঙ্গিয়ে আছে দু'দিন পরের জোড়া পরীক্ষা। ঘুরে ফিরে সেই পড়া আর পড়া। প্রতিকূল পরিবেশে যদি কিছু করার নাই থাকে তবে উপভোগ করাই শ্রেয়। তাই করছি।

বিগত কয়েক বছর এর মধ্যে এ বছর প্রকৃতি একটু বেশিই সদয়। ক'দিন পর পর টানা বৃষ্টি হচ্ছে। হচ্ছে তো হচ্ছেই। পৃথিবী পৃষ্ঠের তপ্ত বুকের জ্বালা মিটে গেছে সেই কবে। কিন্তু তার সহৃদ্যতা আর বদান্যতা যে এবার থামানো দরকার সেটা বোধ হয় সে ভুলেই গেছে। যাহোক, আকাশ থেকে বৃষ্টি, পাহাড় থেকে পাহাড়ি ঢল আর নদী মারফত ভিনদেশী ভূ-খন্ড বিধৌত পানির কল্যাণে সারা দেশ যেন বন্যায় ভেসে যাবার জোগার। টিভি সাংবাদিকদের নিষ্ঠা আর পেশাদারিত্বের বদৌলতে বিভিন্ন জনপদের লোকজনের দুঃখ দুর্দশা, ক্ষয় ক্ষতি ও ভোগান্তির কথা এখন আর কারো অজানা নেই। খোদ রাজধানীর রাস্তাগুলো তো এখন বাস-ট্রাকের চাইতে নৌকা চলাচলের জন্য বেশি উপযোগী। বেশ ক'দিন থেকে ফেইসবুকে এমন দৃশ্যের ছবি, ভিডিও পোস্ট হচ্ছে নিয়মিত।



উঁচু ভবনের বাসিন্দা হওয়ায় রোজ সিঁড়ি বেয়ে উপরে উঠতে হয়। নগর জীবনের এ এক বিড়ম্বনা। মিছামিছি শক্তির অপচয়, সে নিয়ে শরীর আর মনের অভিযোগ এখন আমার কাছে পুরনো। প্রাপ্তিও কম নয়। ভীষণ গরমের দিনগুলোতে বাধাহীন বাতাস প্রাণ জুড়ায়। অন্য সবার চেয়ে মাথা উঁচু, তাই আশে পাশের বাসাগুলোর ছাদের উপর দিয়ে দৃষ্টি দেয়া যায় দূর দিগন্তে।

আমার সব চেয়ে কাছের যে ছাদ টা আছে, তাতে অল্পদিন ধরে কবুতর পোষা হচ্ছে। ব্যাপারটার সাথে আমি পরিচিত। তবে সব সময়ই এটা আমর কাছে সময় আর শ্রমের অপচয় বলে মনে হত। এখন আর হয় না। রাজকীয় একটা ব্যাপার আছে এই কবুতর নামের পাখিটার মধ্যে, তবে ওরা বেশ বাধ্য। কী সুন্দর করে ঘুরে ঘুরে ওড়ে মুক্ত আকাশে। লোকে কী সাধে বলে, “পাখির মধ্যে পায়রা, আর আত্ত্বীয়ের মধ্যে ভায়রা।” প্রথমটা বুঝতে শুরু করেছি দ্বিতীয়টা এখনো দূরের ব্যাপার, সময় হলে হয়ত বোঝা যাবে।



সত্যি বলতে কী ঠিক কখন যে কবুতরগুলোর সাথে সখ্যতা গড়ে উঠেছে আমি খেয়ালই করিনি। ওরা আসে আমার বেলকনিতে। বসে। এই কবুতরগুলো আমার নিকটতম প্রতিবেশী। নির্ভরতা ও অনুপম ভাল লাগার উৎস। আমি দেখি আর ফিরে যাই শৈশবে। নানা বাড়ী, এত্ত এত্ত কবুতর। বাক বাকুম শব্দ। ওদের যত্ন আত্তীকে ঘিরে মামার ব্যস্ততা। মামা এখনও ব্যস্ত তবে অন্য কাজে। সব এখন অতীত ; শুধুই স্মৃতি।

আরও একটু দূরের যে ছাদটা সেখানে একটা মেয়ে আসলো, একটা ছেলে ওকে অনুসরণ করল। স্বাভাবিক ভাবেই বৃষ্টিতে ভিজবে। ওরা ভিজছে, কিন্তু কেন যেন ব্যাপারটা জমছে না। পরে বুঝলাম আসলে তারা এক জায়গায় দাঁড়িয়ে ভিজছে। যে সঞ্জীবনী সুধা ধূলি-ধূসর মৃত পৃথিবীকে সবুজের আদর-আবেশে ভরিয়ে তোলে, সেই অমৃত সুধা ওদের ওপর মিথস্ক্রিয়ায় খুব বেশ সময় নেয়নি। শুরু করল মেয়েটাই, অঞ্জলি ভরে পানি ছিটে দিল ছেলেটার মুখে। দুষ্টু ছেলেটা প্রতিত্তোর হিসাবে বৃষ্টির কারণে ছাদে জমে থাকা পানি আয়েশ করে পা দিয়ে ছিটিয়ে ভিজে দিল মেয়েটাকে। সেই শুরু আর ওরা থামেনি। বিশাল ছাদটার এদিক থেকে ওদিক, দৌড়াদৌড়ি, হাত উপরে তুলে কখনোবা পাখির উড়বার ভঙ্গিতে, কখনো বৃত্তাকার, ত্রিভুজাকার সহ নানান জ্যামিতিক ভঙ্গিতে নেচে-গেয়ে চলেছে বৃষ্টি উৎযাপন।

আমারও খুব ভিজতে ইচ্ছে করছে। ভীষণ। অবশ্য, ইচ্ছে পূরণেও কোন বাঁধাও নেই। পাশে নিষেধ করার জন্য মা নেই, বাবার কাছে নালিশ করবার জন্য বোনেরা নেই, আর শাষণ করার জন্য বাবাও নেই। আছি শুধু আমি, আমার আমি আর আমার ইচ্ছে। বৃষ্টি বেড়েছে, সাথে ওদের নৃত্য-দৌরাত্ম্য। আর দর্শক হিসাবে আমার অস্থিরতা। "এমন দিনে তারে বলা যায়, এমন ঘনঘোর বরিষয়।" কাকে কী বলা যায়, সে কথা অন্য দিনের জন্য তোলা থাক

গ্রীলের ফাঁক দিয়ে বৃষ্টি-জলে হাত ভেজাই, জানি এটাও ঠিক হচ্ছে না। আমার যে জ্বর; তাও আবার ১০৩। হাঁপিয়ে ওঠা ওরা ছাদের উপর পেতে রাখা একটা বেঞ্চিতে বসেছে। চোখে চোখ পড়ে, বিবৃত হল মেয়েটা, মুখ ফিরিয়ে নেয়। কেমন একটা ভাব, আমার মজাই লাগে। একটু পরে ওদের সাথে যোগ দিতে ছাদে আসে আরও একটা ছেলে। মেয়েটা দৌড়ে গিয়ে তাকে অভ্যর্থনা জানায়। শুরু হয় আবার জল-কেলি। এবার তিন জনে মিলে। আমি হাসি, আঁখি জলে ভাসি। স্মৃতি হাতড়ে ফিরি শৈশবে।



সব শেষে যিনি এসেছেন তার বয়স বছর তিনেকের মত হবে! ছোট হওয়াতে সে পড়ে গেছে হোঁচট খেয়ে। ছোট ভাইকে কোলে তুলে নিয়ে পরম মমতায় আগলে রেখেছে মেয়েটা। বৃষ্টির মধ্যেই ভাইয়ের মুখে হাসি ফোটাবার শত চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে মেয়েটা। পিচ্চিটাকে হাসিয়ে তবেই ছাড়ল। পিচ্ছি তিনটার বাবা-মা কে ধন্যবাদ দিতে হয়। ওদের কে বৃষ্টিতে ভিজতে দিচ্ছে বলে। আবার আশঙ্কাও হয় বাবা-মা কে না বলে আসেনি তো! সবাই মিলে আবার...
মনে মনে ভাবি, কতই বা বয়স হবে মেয়েটা সাত কী আট, আগে যে ছেলেটার কথা বলেছি সেও পাঁচ এর বেশি নয়। ভাই এর প্রতি বোনদের যে মমতা যে ভালবাসা তার তুলনা কেবল মায়ের ভালবাসার সাথে তুলনা হতে পারে অন্য করো ভালবাসার সাথে নয়। এ কথা যাদের বোন নাই তারা বুঝবে কী করে।



ইচ্ছের কাছে আজ হার মেনেছে অসুস্থতা, জোড়া পরীক্ষার চোখ রাঙ্গানি, সব। আমি ভিজবই। ছাদে উঠেছি। বৃষ্টি যেন কিছুটা বেড়েছে হয়ত কিছুক্ষণ পরে বাড়বে আমার জ্বরও। বাড়লে বাড়ুক। আমি ভিজছি, হাত উঁচিয়ে জোড়ে জোড়ে চিৎকার করছি।
“বাদলা হাওয়ায় মনে পড়ে ছেলে বেলার গান
বৃষ্টি পড়ে টাপুর-টুপুর নদেয় এল বান।”
সর্বশেষ এডিট : ০৭ ই সেপ্টেম্বর, ২০১৫ বিকাল ৩:০৭
০টি মন্তব্য ০টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

সত্যকে স্বীকার করার সাহস কি আমাদের হারিয়ে যাচ্ছে?

লিখেছেন এস.এম. আজাদ রহমান, ১৯ শে সেপ্টেম্বর, ২০২৬ সকাল ১১:৪৩

সত্যকে স্বীকার করার সাহস কি আমাদের হারিয়ে যাচ্ছে?

আমাদের দেশে এখন অদ্ভুত এক রাজনৈতিক সংস্কৃতি তৈরি হয়েছে। আপনি কোনো দলের সমালোচনা করলে- আপনি সেই দলের শত্রু।
আপনি কোনো দলের একটি ভালো... ...বাকিটুকু পড়ুন

পুলিশ বদলাবেন, নাকি পুলিশ সংস্কার করবেন?

লিখেছেন জুল ভার্ন, ১৯ শে সেপ্টেম্বর, ২০২৬ সকাল ১১:৫৮

পুলিশ বদলাবেন, নাকি পুলিশ সংস্কার করবেন?

ফ্যাসিস্ট আমলে পুলিশকে দলীয় ক্যাডার বাহিনীতে পরিণত করা হয়েছিল- এ অভিযোগ শুধু রাজনৈতিক নয়, দীর্ঘদিনের অভিজ্ঞতার অংশ।
জুলাইয়ের পর- সেই পুলিশ কি সত্যিই বদলেছে, নাকি শুধু... ...বাকিটুকু পড়ুন

২৮ বছর পর ঋণের খোঁজে সন্তান বনাম হাজার কোটি টাকার খেলাপি: আমাদের ব্যাংকিং ও শেয়ারবাজারের ট্র্যাজেডি

লিখেছেন শাম্মী নূর-এ-আলম রাজু, ১৯ শে সেপ্টেম্বর, ২০২৬ দুপুর ১:৫৯

সংবাদের পাতার দুটি বিপরীতমুখী ছবি সাম্প্রতিক সময়ে আমাদের চরম এক সামাজিক ও অর্থনৈতিক বৈপরীত্যের মুখোমুখি দাঁড় করিয়ে দেয়।

একদিকে আমরা দেখি, ২৮ বছর আগে বাবার নেওয়া মাত্র ১০ হাজার টাকার দাদন... ...বাকিটুকু পড়ুন

এই ধরণের মানুষগুলোই বি,এন,পি-কে আবারও ডোবাবে!

লিখেছেন সত্যপথিক শাইয়্যান, ১৯ শে সেপ্টেম্বর, ২০২৬ রাত ৮:০১



পড়ালেখার পিছনে টাকা খরচ করা 'টাকা পাচার'?
যারা বিদেশে পড়ালেখা করতে যান, তাঁরা কি দেশের টাকা লুট করে নিয়ে যান, নাকি নিজের বাপের টাকায় পড়ালেখা করেন?

পড়ালেখার... ...বাকিটুকু পড়ুন

বাংলাদেশের ফরেন কারেন্সি আয়ের মাধ্যম কি?

লিখেছেন ঠাকুরমাহমুদ, ১৯ শে সেপ্টেম্বর, ২০২৬ রাত ১১:৩০



প্রায় বিশ কোটি মানুষের এক লক্ষ সাতচল্লিশ হাজার বর্গ কিলোমিটারের দেশ বাংলাদেশ। আর বাংলাদেশের ফরেন কারেন্সি আয়ের মাধ্যম মাত্র: - রেমিট্যান্স আর পণ্য রপ্তানি।

রেমিট্যান্স: সাধারণত কোনো ব্যক্তি যখন... ...বাকিটুকু পড়ুন

×