somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

ছাহাবীদের চরিত্র 3(খ)

০১ লা এপ্রিল, ২০০৭ সকাল ৭:৪৪
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :


সালমান আল ফারসী (রাঃ)


সন্ধ্যা ঘনিয়ে আসায় আমি বাড়ি ফিরে এলাম। সারাদিনের বৃত্তান্ত বাবা জানতে চাইলেন। খ্রিষ্টধর্মের সাথে পরিচয় এবং মুগ্ধতার ব্যাপারে তাকে অবহিত করলাম। তিনি শংকিত হয়ে বললেন :

"সে ধর্মে কোন কল্যাণ নেই, তোমার এবং তোমার পিতৃপুরুষের ধর্ম তা থেকেও উত্তম।" বললাম : "প্রভুর শপথ, কখনো তা নয়। তাদের ধর্ম আমাদের ধর্ম হতে শ্রেয়।"

আমার কথা শুনে বাবা ভীত হয়ে পড়লেন। পাছে ধর্মান্তরিত হই, তাই আমার পায়ে বেড়ি লাগিয়ে ঘরে বন্দী করে রাখলেন।

আমি সুযোগের প্রতীায় ছিলাম। কিছু দিনের ভেতরেই সে সুযোগ এসে গেল। গোপনে খ্রিষ্টানদের কাছে এই বলে খবর পাঠালাম যে, সিরিয়া অভিমুখী কোন কাফেলা তাদের কাছে এলে তারা যেন আমাকে খবর দেয়। কিছুদিেেনর মধ্যে সিরিয়া অভিমুখী কাফেলা তাদের কাছে এল। তারা আমাকে খবর দিল। আমি আমার বন্দীদশা থেকে পালিয়ে গোপনে তাদের সাথে বেরিয়ে পড়লাম। তারা আমাকে সিরিয়ায় পেঁৗছে দিল। সিরিয়ায় পৌঁছে আমি জিজ্ঞেস করলাম : এ ধর্মের সর্বোত্তম ও সবচেয়ে জ্ঞানী ব্যক্তি কে?

তারা বলল : বিশপ, গির্জার পুরোহিত।

আমি তার কাছে গিয়ে বললাম : আমি খ্রিষ্টধর্মের প্রতি আকৃষ্ট হয়েছি, আমার ইচ্ছা, আপনার সাহচর্যে থেকে আপনার খিদমত করা, আপনার নিকট থেকে শিা লাভ করা এবং আপনার সাথে প্রার্থনা করা। তিনি তাতে সম্মত হলেন। আমি গির্জায় প্রবেশ করলাম ও তার খিদমত শুরু করে দিলাম। কিছুদিন যেতে না যেতেই বুঝলাম, লোকটি অসৎ। কারণ সে তার অনুবর্তীদের দান করার নির্দেশ দেয়, সওয়াব লাভের প্রতি উৎসাহ দান করে অথচ দানকৃত অর্থ নিজেই আত্মসাৎ করে পুঞ্জীভূত করে রাখে। এভাবে সে বিশাল স্বর্ণের স্তূপ গড়ে তোলে। পুরোহিতের মৃতু্যর পর খ্রিষ্টানরা তাকে সমাহিত করতে এলে, তাদেরকে পুরোহিতের দূষিত কলুষ চরিত্রের কথা জানালাম। তাদের অনুরোধক্রমে গুপ্তধন - এর স্থান নির্দেশ করলাম। সেখানে কলসভর্তি স্বর্ণ-রৌপ্যের অঢেল সম্ভার দেখে তারা অগি্নশর্মা হল এবং সমাহিত করার পরিবর্তে তাকে শূলে চড়িয়ে প্রস্তর নিপে করল।

এরপর নতুন যে পুরোহিত পূর্বতনকে স্থলাভিষিক্ত করেন, আমি তার সেবায় আত্মনিয়োগ করলাম। এই নতুন পুরোহিত ছিলেন আখিরাতের আশায় ব্যাকুল; দিবা-রাত্রি তিনি ইবাদতে মশগুল থাকতেন। আমি তাঁর খুব অনুরক্ত হয়ে পড়ি এবং দীর্ঘ একটা সময় তাঁর সানি্নধ্যে অতিবাহিত করি। তাঁর মৃতু্যর কিছু সময় পূর্বপর্যন্ত আমি তাঁর সাথে অবস্থান করলাম। যখন তাঁর মৃতু্য নিকটবতর্ী হল, আমি তাঁকে বললাম: "হে গুরু! আমি আপনার সাথে থেকেছি এবং আপনাকে আমি আগে যা কিছু ভালবাসতাম তার চেয়েও বেশী ভালবেসেছি। এখন আল্লাহর হুকুমে আপনার সময় শেষ হয়ে এসেছে, এখন আপনি আমাকে কার কাছে যেতে বলেন এবং আমাকে কি করতে বলেন?" পাদ্রী বললেন, "আল্লাহ কসম, মানুষ সম্পূর্ণ তির মধ্যে রয়েছে, তারা যার উপর ছিল তাকে পরিবর্তন ও বদল করেছে। আমি যা এখনও ধরে রেখেছি, আল-মুসিলের একজন লোক ছাড়া আর কেউ তা ধরে রেখেছে বলে আমি জানি না। সুতরাং তুমি তার কাছে যাও।" যখন মানুষটি মারা গেলেন, আমি আল-মুসিলে গেলাম ও সুপারিশকৃত মানুষটির সাথে দেখা করলাম। আমি তাঁকে বললাম যে আমার পূর্বতন গুরু তাঁর কথা আমাকে বলেছেন যাতে আমি তাঁর সাথে থাকি; এবং আরো বলেছেন যে তাঁরা একই পথের অনুসারী। আল-মুসিলের লোকটি আমাকে তার সাথে থাকতে বললেন, আমি থাকলাম এবং দেখলাম যে তার বন্ধুর ধারণ করা বিশ্বাসের লোকদের মধ্যে তিনি উত্তম। শীগগিরই তিনি মারা গেলেন। মৃতু্যকালীন সময়ে আমি তাকে জিজ্ঞাসা করলাম তিনি আমাকে এই ধর্মের অনুসারী কার কাছে যেতে সুপারিশ করেন। লোকটি বললেন, "আল্লাহর কসম! আমি আর কাউকে জানি না যে আমাদের এই ধর্মের উপর রয়েছে নুসাইবিন এর একজন লোক ছাড়া, তুমি তার কাছে যাও।" তার মৃতু্যর পর আমি নুসাইবিন এর সেই লোকের কাছে গেলাম ও তার কাছে কিছুদিন বাস করলাম। একই ঘটনার পুনরাবৃত্তি ঘটলো। তাঁর মৃতু্য ঘনিয়ে এলো এবং মৃতু্যর পূর্বে আমি তার উপদেশ চাইলাম কার কাছে এবং কোথায় আমি যেতে পারি। লোকটি বললেন যে আমি আম্মুরিয়াতে একই ধর্মের একজন লোকের কাছে যেতে পারি, যা আমি করলাম, এবং কিছু গরু এবং ভেড়ার মালিক হলাম। আম্মুরিয়ার লোকটির মৃতু্য নিকটবতর্ী হলে আমি আমার অনুরোধের পুনরাবৃত্তি করলাম। উত্তরটি ভিন্ন হলো। লোকটি বললেন: "হে বৎস! আমি আমাদের ধর্মের উপর রয়েছে এমন আর কাউকে জানি না। যাই হোক, একজন নবীর আবির্ভাবের সময় নিকটবতর্ী। এই নবী ইব্রাহীম এর ধর্মেই হবেন। তিনি আরব দেশ থেকে আসবেন এবং দুটি কালো পাথরের মধ্যবতর্ী ভূখণ্ডে হিজরত করবেন। এই উপত্যকার মধ্যখানে খেজুর বৃ ছড়িয়ে থাকবে। তাঁর বিশেষ কয়েকটি চিহ্ন থাকবে। তিনি উপহার হিসাবে প্রদত্ত খাবার খাবেন, কিন্তু দান গ্রহণ করবেন না। তাঁর দুই কাঁধের মাঝখানে নবুওয়াতের মোহর অঙ্কিত থাকবে। যদি তোমার প েসেখানে যাওয়া সম্ভব হয়, তবে তাই কর।" তার মৃতু্যর পর আমি কিছুদিন আম্মুরিয়াতে অবস্থান করলাম, ততদিন পর্যন্ত যখন কালব গোত্রের একদল ব্যবসায়ী আমার পাশ দিয়ে যাচ্ছিল। আমি তাদের বললাম, "আমাকে আরবে নিয়ে চল এবং আমার গরু ও ভেড়াগুলো নিয়ে নাও।" তারা রাজী হলো।

যখন আমরা ওয়াদিউল কুরা (মদীনার কাছে) পৌঁছলাম, তারা আমাকে একজন ইহুদীর কাছে দাস হিসাবে বিক্রি করে দিল এবং খেজুর গাছগুলি দেখে আমার আশা হল হয়তো এটাই আমার বন্ধুর বর্ণিত জায়গা হতে পারে। একদিন আমার মনিবের চাচাত ভাই তার সাথে দেখা করতে এলো এবং আমাকে কিনে নিল। সে আমাকে মদীনায় নিয়ে গেল। আল্লাহর শপথ! দেখা মাত্রই আমি চিনলাম যে এটাই আমার বন্ধুর বলা সেই জায়গা। তারপর আল্লাহ তাঁর রাসূল পাঠালেন। তিনি মক্কায় যতদিন থাকার থাকলেন। আমি তাঁর সম্পর্কে কিছুই শুনিনি কারণ আমি সারাণ গোলামীর কাজে ব্যস্ত থাকতাম। তিনি মদীনায় হিজরত করলেন। আমি খেজুর গাছের উপরে আমার মনিবের কাজে ব্যস্ত ছিলাম। তার একজন চাচাত ভাই এসে সামনে দাঁড়াল এবং বললো: "বনী কাইলার ধ্বংস হোক, তারা কুবাতে একজন লোকের চারিদিকে সমবেত হয়েছে যে আজ মক্কা থেকে পৌঁছেছে এই দাবী করে যে সে নবী।" শোনামাত্র আমি এমন কাঁপতে লাগলাম যে প্রায় আমার মনিবের ঘাড়ের উপর পড়ে যাচ্ছিলাম। আমি নেমে এসে জিজ্ঞাসা করলাম: "কি বললে, কি বললে?" আমার মনিব রেগে গিয়ে আমাকে প্রচণ্ড জোরে ঘুঁষি মারলো এবং বললো: "এতে তোমার কি হলো? তোমার কাজ কর গিয়ে।" আমি বললাম, "কিছু না, আমি শুধু সে কি বলছে তা জানতে চাইছিলাম।" সেই সন্ধ্যায় আমি কুবায় রাসূলুল্লাহকে দেখতে গেলাম। আমি সাথে করে আমার জমিয়ে রাখা কিছু খাবার নিয়ে গিয়েছিলাম। আমি গিয়ে বললাম, "আমি শুনেছি আপনি সৎলোক এবং আপনার সঙ্গীরা অভাবগ্রস্ত, এবং আমি আপনাকে দান হিসাবে কিছু দিতে চাই। আমি দেখলাম যে অন্য কারো চেয়ে এটা আপনারই বেশী প্রয়োজন।" আমি তাঁকে তা দিলাম, তিনি তাঁর সাথীদের বললেন, "খাও!" এবং তিনি তাঁর হাত সরিয়ে রাখলেন তা থেকে। আমি মনে মনে বললাম, "একটা চিহ্ন মিলেছে।" পরবতর্ীতে আমি যখন আবার মদীনাতে নবীর কাছে গেলাম আমি বললাম: "আমি দেখেছি আপনি দান গ্রহণ করেন না, এখানে আমি আপনার জন্য উপহার হিসাবে কিছু এনেছি।" নবী সেখান থেকে নিজে খেলেন ও সাহাবাদেরও খেতে বললেন, তাঁরাও খেলেন। আমি মনে মনে বললাম, "দুটি চিহ্ন মিলল।" তৃতীয় সাাতে আমি নবীর কোন সাহাবার জানাযায় গেলাম। আমি তাঁকে সালাম দিলাম, তারপর পেছনের দিকে চলে গেলাম যাতে নবুওয়াতের মোহর দেখতে পাই আমার বন্ধুর বর্ণনামত। যখন তিনি আমাকে দেখলেন তিনি বুঝতে পারলেন আমি কি দেখতে চাইছি। তিনি তাঁর চাদরটি পিঠ থেকে সরিয়ে দিলেন এবং আমি মোহরটি দেখলাম। আমি সেটি চিনতে পারলাম। আমি নীচু হয়ে সেখানে চুমা দিলাম ও কাঁদতে শুরু করলাম। রাসূল (সঃ) আমাকে ঘুরে সামনে এসে আমার কাহিনী শুনতে চাইলেন, এবং আমি তাঁকে আমার কাহিনী বললাম।"
সর্বশেষ এডিট : ৩১ শে ডিসেম্বর, ১৯৬৯ সন্ধ্যা ৭:০০
৩টি মন্তব্য ০টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

অন্তর্দিগন্ত

লিখেছেন মুনতাসির রাসেল, ১৪ ই জুন, ২০২৬ সকাল ১১:০৯



যে নদী সাগরকে ছোঁয়নি, সে-ই গায় সবচেয়ে নির্মল সঙ্গীত।
যে বৃক্ষের শাখা ফলের ভারে নত হয়নি, সে-ই আকাশকে বেশি বোঝে, বাতাসকে বেশি শোনে।

পৃথিবীর প্রাচীনতম ভ্রমগুলোর একটি এই,
মানুষ ভেবেছে প্রাপ্তিই পরিত্রাণ।

তাই... ...বাকিটুকু পড়ুন

Laptop Stand কেন দরকার?

লিখেছেন নাহল তরকারি, ১৪ ই জুন, ২০২৬ বিকাল ৪:৩৯

Laptop Stand কেন দরকার? | Digital Fast IT থেকে স্মার্ট সমাধান



দীর্ঘ সময় ল্যাপটপ ব্যবহার করলে অনেকেরই একটি সাধারণ সমস্যা দেখা দেয়—ল্যাপটপের নিচের অংশ অতিরিক্ত গরম হয়ে যায়। অতিরিক্ত... ...বাকিটুকু পড়ুন

দুবাই কি দুর্নীতিবাজদের গন্তব্য হয়ে উঠেছে?

লিখেছেন সত্যপথিক শাইয়্যান, ১৪ ই জুন, ২০২৬ সন্ধ্যা ৬:৩০

কয়েক বছর আগে, কানাডার বেগম পাড়ার কথা ব্যারিস্টার সুমন ভাই বেশ ফলাও করে প্রকাশ করেছিলেন। বাংলাদেশী দূর্নীতিবাজদের আখড়া হয়ে উঠেছিলো কানাডার ঐ অঞ্চল। আজ পুসিলশের সাবেক প্রধান বেনজির দুবাইয়ে ধরা... ...বাকিটুকু পড়ুন

আদ্ব দ্বীন হাসপাতাল ও বাংলাদেশ ফেসবুক বিচারক

লিখেছেন ঠাকুরমাহমুদ, ১৫ ই জুন, ২০২৬ রাত ১:৫৪



সম্প্রতি আদ্ব দ্বীন হাসপাতালের ঘটনা কেন্দ্র করে বাংলাদেশ ফেসবুক বিচারকগণ রায় দিয়েছেন “আদ্ব দ্বীন হাসপাতাল লাইসেন্স বাতিল করা যাবে না”।




...বাকিটুকু পড়ুন

ইমিগ্রেশনেই ধরা খেল বিএনপির কূটনীতি

লিখেছেন সৈয়দ কুতুব, ১৫ ই জুন, ২০২৬ রাত ২:৪০


ধরুন আপনার পাশের বাড়ির সাথে সম্পর্ক ভালো না। দীর্ঘদিনের পুরনো ঝামেলা, কথা বলাবলি বন্ধ, একে অপরকে দেখলে মুখ ঘুরিয়ে নেওয়ার অভ্যাস হয়ে গেছে। এই অবস্থায় পাশের বাড়িতে একটা বৈঠক... ...বাকিটুকু পড়ুন

×