সালমান আল ফারসী (রাঃ) - (শেষ পর্ব)
সালমান (রাঃ) এর মুক্তিকল্পে রাসূল (সঃ) তার ইহুদী মনিবকে নির্ধারিত মূল্য পরিশোধের ব্যবস্থা করেন এবং শর্ত মোতাবেক নির্দিষ্ট পরিমাণ খেজুর গাছের চারা রোপণ করেন। ইসলাম গ্রহণের পর সালমান (রাঃ)-এর পরিচয় জানতে চাওয়া হলে বলতেন আমি সালমান, আদমের বংশধর, ইসলামের সন্তান।
ক্রমবর্ধমান ইসলামী রাষ্ট্রের বিবিধ সংগ্রাম ও অভিযানে সালমান (রাঃ) গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন। খন্দকের যুদ্ধে তিনি এক অভূতপূর্ব রণকৌশল উদ্ভাবন করেন। মুসলিম বাহিনীকে পরিখা খনন করার পরামর্শ দেন। আবু সুফিয়ান পরিখা দেখে স্তম্ভিত হয়ে যান।
সালমান (রাঃ) তার মহত্ত্বের জন্য ছিলেন সুবিদিত। তিনি ছিলেন অপার জ্ঞানের আধার এবং অনাড়ম্বর কৃচ্ছ জীবন যাপনকারী। তাঁর পরিধেয় ছিল কেবল মাত্র একটি, তা বিছিয়েই তিনি ঘুমাতেন। তিনি জীবনে কোন বাড়ি তৈরি করেননি। এক ব্যক্তি তাঁর কাছে ইজাযত চাইল, তাঁকে একটি ঘর বানিয়ে দেয়ার। তিনি নিষেধ করলেন। বারবার পীড়াপীড়িতে শেষে এই শর্তে সম্মত হন যে প্রস্তাবিত ঘর এত সংকীর্ণ হবে যে দাঁড়ালে মাথায় চাল বেঁধে যাবে এবং শুয়ে পড়লে দেয়ালে পা ঠেকে যাবে।
মাদাইনের গভর্নর হিসেবে দায়িত্ব পালনকালে তিনি পাঁচ হাজার দিরহাম করে ভাতা পেতেন যা তিনি সাদাকাহ হিসেবে বিলিয়ে দিতেন। তিনি নিজ হাতের উপার্জনে জীবিকা নির্বাহ করতেন। কতিপয় ব্যক্তি মাদাইনে এসে তাঁকে কাজ করতে দেখে জিজ্ঞেস করলেন : "আপনি তো এখানকার আমীর এবং আপনার জন্য ভাতা বরাদ্দ আছে সুতরাং এখন এই বেগার খাটুনি খাটছেন?"
তিনি বললেন : আমি নিজ হাতের উপার্জনে খেতে স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করি। সালমান (রাঃ) অবশ্য তাঁর কৃচ্ছ সাধনায় মাত্রাতিরিক্ত কঠোর ছিলেন না। একদা তিনি আবু দারদা, যার সঙ্গে তাঁর ভ্রাতৃসম্পর্ক স্থাপিত হয়েছিল, তাঁর বাড়িতে গেলেন। তিনি তাঁর স্ত্রীকে দুর্দশাগ্রস্ত দেখে তার হেতু জানতে চাইলে তিনি স্বামীর দুনিয়া বিরাগের অনুযোগ করলেন। আবু দারদা ঘরে ফিরে মেহমানকে সাদরে বরণ করে, তাঁর সামনে খাবার পেশ করলেন। সালমান তাঁকেও খাওয়ায় শরীক হতে বললেন। উত্তরে তিনি বললেন তিনি নফল রোজা রেখেছেন। সালমান (রাঃ) শপথ করে বললেন তিনি না খাওয়া পর্যন্ত তিনিও লোকমা তুলবেন না। সালমান (রাঃ) ঐ রাতও সেখানেই অতিবাহিত করেন। রাতে আবু দারদা (রাঃ) সালাতের জন্য উঠতে চাইলে তিনি তাঁকে বিরত রাখেন এবং বলেন : হে আবু দারদা তোমার উপর তোমার রবের অধিকার আছে, তোমার পরিবার এবং তোমার শরীরেরও অধিকার আছে, সুতরাং প্রত্যেকের অধিকার আদায় কর।
প্রতূ্যষে তাঁরা একত্রে নামায আদায় করেন। পরবর্তীতে আবু দারদা (রাঃ) রাসূল (সঃ) এর সাথে সাাৎ করে উপরোক্ত ঘটনা বর্ণনা করেন। রাসূল (সঃ) তা সমর্থন করেন।
বিদগ্ধ আলেম হিসেবে তিনি ছিলেন সুপরিচিত। আলী (রাঃ) তাঁকে লোকমান হাকীমের সাথে তুলনা করেন। কাব আল আহবার (রাঃ) তার সম্বন্ধে বলেন : সালমান (রাঃ) জ্ঞানের অতল সমুদ্র যা কখনো শুষ্ক বারিশূন্য হয় না। মাজুসী ধর্ম ছাড়াও ইসলাম ও খ্রিষ্টধর্মের মূলগ্রন্থের জ্ঞান ছিল তাঁর নখদর্পণে। রাসূলের (সঃ) জীবদ্দশায় তিনি পারস্য ভাষায় কুরআনের অনুবাদ করেন। পৃথিবীর ইতিহাসে তিনি-ই প্রথম কুরআনের অনুবাদকারী।
সালমান (রাঃ) যে বনেদী ঘরে বেড়ে ওঠেন, তাতে সহসাই প্রভাবশালী প্রতাপান্বিত পারস্য সাম্রাজ্যের গুরুত্বপূর্ণ পদমর্যাদায় অধিষ্ঠিত হতে পারতেন। সত্যস্পৃহা, এবং এর প্রতি দুর্নিবার অনুরাগ, রাসূলের (সঃ) নবুওয়তের পূর্বেই তাঁকে আড়ম্বরপূর্ণ জীবন পরিত্যাগে এমনকি দাসত্বের নিগ্রহ অম্লান বদনে মেনে নিতে উদ্বুদ্ধ করে। সর্বাধিক বিশ্বস্ত মতানুযায়ী হিজরতের পঁয়ত্রিশ বছর পর উসমান (রাঃ) এর খিলাফতকালে তাঁর ওফাত হয়।
(সমাপ্ত)
সর্বশেষ এডিট : ৩১ শে ডিসেম্বর, ১৯৬৯ সন্ধ্যা ৭:০০

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।



