কিছু বুঝে উঠার আগেই আমাকে ঢেকে দেওয়া হল। কী অসীম নিস্তব্ধতা। এতক্ষন ধরে আশেপাশের মানুষগুলোর কথোপকথন কানে এসে পৌছাচ্ছিল, তা যেন আস্তে আস্তে মিলিয়ে গেল। দূর হতে একটা বা দুটি কথা শুনা যাচ্ছে। আত্নবিশ্বাসের সাথে চোখ মেললাম। কি অন্ধকার। এমন ভয়ঙ্কর অন্ধকার কি জীবনে কখনও দেখেছি? না মনে করতে পারছি না। নানী বাড়িতে যখন ঘন বাশঁঝাড়ের ভিতর দিয়ে রাতের বেলা দৌড় দিয়েছি তখনও এত ঘন কাল দেখিনি। কিন্তু তখনকার দিনের যে ভয় পেতাম তার কিছুই আজ পাচ্ছি না , কেন? নিজের অনুভুতি গুলি কি নষ্ট হয়ে গেছে? আমি কি স্বপ্ন দেখছি? তা কি করে হয়, আমি তো চোখ মেলে আছি। যদিও হাত পায়ের কোন অনুভূতি টের পাচ্ছি না। ইচ্ছে করলেও নাড়াতে পারছিনা। তবে কি মারা গেছি? কিন্তু মরে যাবার কোন ঘটনা তো মনে পড়ছে না। রাস্তা পার হবার সময় যে দ্রুত ট্রাক আসছিল আমি অল্পের জন্য তো বেচে গিয়েছিলাম; কি তাতে মারা গেছি? না , তা কি করে হয়? এরপর তো চয়নের সাথে দেখা হয়েছে, মুস্তাফিজ ভাইয়ের সাথে কথা হল। না কিছুতেই মনে করতে পারছি না। যাই হোক। পুরানো অনেক স্মৃতি যেগুলো মস্তিষ্কের অবচেতন স্তরে লুকায়িত ছিল তা যেন আস্তে আস্তে চেতয়াদায়ক স্তরে পদোন্নতি পাচ্ছে। মনে পড়ছে সাতক্ষীরার কলারোয়া তে থাকার সময় পরীক্ষায় অঙ্ক ভূল করে আসায় মায়ের কাছে প্রচন্ড মার খেয়েছিলাম। বেলালের (বর্তমান MIST এর lecturer) সাইকেল চুরি করে পুকুরের মাঝে ডুবিয়ে রেখেছিলাম। হঠাত স্মৃতির পাতায় চলে এল যশোর। মনে পড়ছে টিনএজ বয়সের সেই সব দিনগুলোর কথা। প্রাইভেট শেষ করে মেয়েদের রিকশার পিছে পিছে সমাবেত সাইকেল চালনা। জিকো, তারেক, ইমরান, বাবু, হাদি ভাল থাকিস বন্ধুরা। কলেজ লাইফে(মেডিকেলে পড়ার কারনে আমার আবার ভার্সিটিতে পড়ার অভিজ্ঞতা নেই) রাজনীতি করতে গিয়ে সেই মারামারির ঘটনা। দুইতলা, তিনতলা, চারতলা আবার চারতলা থেকে তিন, দুই। লাঠি নিয়ে দৌড়াদৌড়ি, কখনও আক্রমনাত্মক, কখনও রক্ষনাত্নক। ...।। কি সব দিনগুলি। কলেজের ফাংশনে ফার্স্ট প্রাইজ পাওয়া।নবীন বরণের সেই ডিম খাওয়া। কত কিছুই আজ মনে পড়ছে। ক্লাসে পিছনের বেঞ্চে ঘুমিয়ে থাকা। কিংবা পরীক্ষা না দিয়ে সুন্দরবন ঘুরতে চলে যাওয়া। বা সাদিয়া ম্যাডামের সেই মন ভূলানো, হৃদয় কাড়া রাক্ষুসে হাসি আর ঝাড়ি। উহু আজ সবই মনে পড়ছে। হঠাত করে শরীরে ঠান্ডা অনুভব করছি। হাত পা কি সত্যিই ঠান্ডা হয়ে যাচ্ছে?
মাথার কাছে কিছু একটার শব্দ হচ্ছে। এটা কি মুনকার-নাকীরের আগমন ধ্বনি?
নাকি কোন দুঃস্বপ্নের background music?
আসলেই কি মরে গেছি? তবে কি একটু পর আমার শরীরে পচন ধরবে? বইয়ে পড়েছি নাভির ডানপাশটা নাকি প্রথমে পচে সবুজ আকার ধারন করে। এরপর আস্তে আস্তে সারা শরীর সবুজ হয়ে যাবে। প্রথমে পেট, পেটের পর জননাংগ, বুক, ঘাড়, মুখ , হাত, পা। আচ্ছা ফর্সা শরীর সবুজ হয়ে যাবে কিন্তু আমার গায়ের রংতো কাল। আমার ক্ষেত্রে কি রং হবে? খুব দেখতে ইচ্ছে করছে। একটা আয়না থাকলে ভাল হত।
এরপর একসময় সারা শরীর ফ্যাকাসে সাদা হয়ে যাবে। শিরার মধ্যে রক্ত থাকার জন্য পুরা শরীরকে তখন মার্বেল পাথরের মোজাইক করা মেঝের মত মনে হবে। আঙ্গুল গুলো বেকে যাবে। নখ গুলো খসে পড়বে। আমার ক্ষেত্রে কি তাই হতে চলেছে? নখে কোন অনুভূতি নেই। বুঝতে পারছি না।
আচ্ছা পেটে গ্যাস জমা হবার কথা ছিল। পেটটা কি আস্তে আস্তে ফুলে যাবে? চোখটা কোটর হতে বেরিয়ে আসবে। গায়ের চামড়ার নীচে ফোস্কা পড়বে যেন আগুনে ঝলসে গেছে? শরীরে পোকা মাকড়ের বসতি হবে? তাদের লার্ভা-ডিম বাসা বাধবে এই শরীরে। শরীরের তাপমাত্রা বেড়ে যাবে। ভাবতেই গা গুলিয়ে যাচ্ছে। আমার ও কি সেই পরিণতি হতে যাচ্ছে? শরীর ফুলে যাবে। প্রথমে মুখ, এরপর যৌনাংগ, শেষে পেট। এরপর অবশিষ্ট শরীর।
গোপন অংগ গুলো মাত্রাতিরিক্ত ফুলে যাবে। জিহবা শুধু ফুলে যাবে না, এটা বের হয়ে যাবে মুখগহবর থেকে। না আমার জিহবা এখনও বের হয়নি।
জমে থাকা প্রসাব আর পায়খানা বের হয়ে যাবে। পেটের নাড়ীভুড়ি আর জরায়ু বের হয়ে যাবে।এই পরিস্থিতিতেও একটু প্রশান্তি লাগল যে আমার জরায়ু নেই।
একটা জিনিস অন্তত কম বের হবে। মাথার চুলগুলো খসে পড়বে। একটু হাসি পেল। যাদের চুল পড়ার অভ্যাস আছে তাদের কাছে এটা নতুন কোন ভয়ের উদ্রেক করবে না। এরপর মাথার হাড় গুলো আলাদা আলাদা হয়ে যাবে। দাতের মাড়ি খুলে পড়বে। চামড়া ঢিলা হয়ে শরীর থেকে আলাদা হয়ে যাবে।
না মাথা আর দাত ঠিক মতই আছে। উহু তাহলে কি বেঁচে আছি?
আবার কানে লোকজনের কথাও ধীরে ধীরে শোনা যাচ্ছে।
ডাঃ সাহেব! উঠুন। আপনার MRI complete.
আস্তে আস্তে উঠে বসলাম । কিছুক্ষণের জন্য হলে ও মৃত্যুর পরের অবস্থা আচ করতে পেরেছিলাম বোধ হয় ।বাইরে বের হয়ে এক গ্লাস পানি খেলাম ।বুকের ভিতরের হৃদস্পন্দন টা বেড়ে গেছিল । বাইরে থেকেই হয়ত শোনা যাচ্ছ
ঢিক ঢিক ঢিক ঢিক....................................।।
আপনা থেকেই মুখ থেকে বেরিয়ে এল
“আল্লাহ আমাকে তুমি আমার যাবতীয় গুনাহ সমুহের জন্য ক্ষমা কর ।”
সর্বশেষ এডিট : ০২ রা নভেম্বর, ২০১২ সন্ধ্যা ৭:১৫

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।



