somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

চিঁ চিঁ...

১০ ই জুন, ২০১৮ সকাল ৭:০১
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :


বলছি ২০১৫ সালের জানুয়ারির এক সন্ধ্যার কথা। চ্যানেল আইয়ের স্টুডিওতে বসে আছি। মায়ের একটা প্রোগ্রামের রেকর্ডিং। পৌঁছালাম ঠিক সাতটায়। এরপর বাজে আটটা বিশ। অনুষ্ঠান আর শুরু হওয়ার নাম নাই। বিয়ে বাড়ির মতো। কার্ডে লেখা থাকে সন্ধ্যা সাতটা। মানুষ হেলেদুলে আসেন নয়টার দিকে। আর খেতে দেওয়া হয় দশটার পরে।

সেদিন আমার খুব খিদে পেয়েছে। ওই মুহূর্তে যেকোনো কিছু খেতে দেওয়া হলে খুব আগ্রহ নিয়ে খেতাম। একবার মনে হলো, তাদের কোনো ক্যাফেটেরিয়া আছে কিনা জিজ্ঞেস করি। আবার ভাবলাম, লাভ নেই। মা ঝামেলা করবেন। বলবেন, ‘এ্যাই চোওওপ! কোথাও যাওয়া যাবে না।’ বয়সের কোঠা তিরিশের আশপাশে হলেও মার কাছে আমি এখনো তিন! তাই দেশে ফিরে আসার পর থেকে স্বাধীনতার খুব অভাব বোধ করছি। এক সময় আমাকে ফুলার রোড থেকে নিউমার্কেটে যেতে দেওয়া হতো না। কিন্তু সেই আমাকেই ২০১০ সালের এক শীতের রাতে জার্মানির মতো একটা দূর দেশে একা একা পিএইচডি করতে ছেড়ে দেওয়া হলো। বজ্র আঁটুনি ফসকা গেরো। সেই গেরো গলে আমি বেরিয়ে গেলাম।

দেশের অবস্থা আপাতত লে হালুয়া। অবরোধ আর হরতাল। চলছে। চলবেও। সেই সঙ্গে গাড়ি পোড়ানোর মোচ্ছব। জগাখিচুড়ি আর কাকে বলে! রাস্তায় বেরোনো মানে মারাত্মক ভয়ংকর একটা ব্যাপার তখন। ভীষণ আনন্দ আর উৎসাহের সঙ্গে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকতার চাকরিতে ঢুকেছিলাম। তখন পেট্রল বোমায় পুড়ে গ্রিল চিকেন কিংবা মাটন কাবাব হওয়ার আতঙ্কে সেই আনন্দে গুড়ে বালি। দুই মাসে ক্লাস নিতে পারলাম মাত্র চারটা। মানে প্রতি পনেরো দিনে গড়ে একটা ক্লাস। এর কোনো মানেই হয় না। চরম হতাশ লাগছে। এদিকে এসএসসি পরীক্ষার মাঝে পড়ে গেল হরতাল। প্রথমে মনে হলো, আহা ওদের কত দুঃখ! পরে চিন্তা করে দেখলাম, সবাইকে তো ফলাফলের সময়ে ঢালাওভাবে গোল্ডেন ফাইভ দেওয়া হবে। কে ভালো আর কে খারাপ করল তার কোনো মূল্যায়নই হবে না। আসলেই—‘উদ্ভট উটের পিঠে চলছে স্বদেশ।’

রেকর্ডিং শুরু হয়েছে অবশেষে। বিষয় পশুপাখির মাতৃভাষা। কবি, পরিবেশবিদ, প্রাণিবিদ মিলে মিশে এক প্রাণবন্ত আলোচনা। তবে একই সঙ্গে চলছে জেনেটিক্যালি মোডিফাইড শস্যের মুণ্ডুপাত। ওরে বাবা, আমার মাস্টার্স অবধি পড়াশোনা যে জেনেটিক ইঞ্জিনিয়ারিংয়ের ওপর, এটা এখানে যতক্ষণ আছি, কায়দা করে চেপে যেতে হবে।

বাইরে একটু দূরেই বিমানবন্দর রোডে বাস পুড়িয়ে দিয়েছে খানিকক্ষণ আগে। সারা দেশ পুড়ছে। এর মাঝে পশুপাখির ইতং-বিতং। চিন্তা হচ্ছে কেমন করে আস্ত আর জ্যান্ত মানুষ হিসেবে বাসায় ফিরে যাব। উত্তরাকে দিল্লি দূর মনে হচ্ছে। মাঝপথে পুড়ে ভোম হয়ে গেলে তো কারও দায় থাকবে না। কেন যে মা রাজি হলেন এতটা পথ আসতে, ধুর! পেটের ভেতর পাঁচ মাসের তাফসু মিয়াও বাইঙ মাছের মতো ঘাই মেরে তার বিরক্তি জানিয়ে যাচ্ছে। আমাদের এই বিপজ্জনক অভিযানের কথা জার্মানিতে থাকা তাফসু মিয়ার বাবার কান পর্যন্ত পৌঁছাতে দেওয়া যাবে না। জানতে দিলে সমূহ বিপদ।

রাত বাজে প্রায় বারোটা। আসার পথেও তারা গাড়ি দিয়ে দিল। চালকের চোখে মুখে স্পষ্ট আতঙ্কের ছাপ। চালক ফাস্ট অ্যান্ড ফিউরিয়াস স্টাইলে গাড়ি টান দিলেন। এর কয়েক সেকেন্ডের মাঝেই বিকট শব্দ আর লোকজনের হল্লা। চালক বললেন, ‘আপনারা পেছনে তাকাইয়েন না। বাসের গায়ে পেট্রলবোমা মারসে।’ আমি আর মা জমে গেলাম ভয়ে। অবস্থা পুরাই ইয়া নফসি ইয়া নফসি। মুখস্থ থাকা, ভুলে যাওয়া সব সুরা আওড়ালাম মনে মনে। পুরোটা পথ আমার আর মায়ের গলা দিয়ে স্বর বেরোল না, শুধু চিঁ চিঁ...পশুপাখির মাতৃভাষা...!

ড. রিম সাবরিনা জাহান সরকার: মিউনিখ, জার্মানি।
সর্বশেষ এডিট : ১০ ই জুন, ২০১৮ সকাল ৭:০১
১৩টি মন্তব্য ১২টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

বিজন দাদা, হারালে কোথায় ?

লিখেছেন ডঃ এম এ আলী, ২৮ শে সেপ্টেম্বর, ২০২৬ সকাল ৯:১০


নিত্য নতুন পোস্টের ভিড়ে
সেই চেনা মুখটি আজ আর দেখি না
কোথায় হারালে বিজন দাদা
ব্লগের উঠোনে তোমার সেই ছায়াটি আর মেলে না।

কোনো লেখা যখন সদ্য প্রসবের ব্যথায়
শব্দেরা যখন খুঁজত একটু... ...বাকিটুকু পড়ুন

সক্রেটিস ঈশ্বরের বাণী প্রচার করতেন

লিখেছেন সত্যপথিক শাইয়্যান, ২৮ শে সেপ্টেম্বর, ২০২৬ সকাল ৯:১৫



সক্রেটিস মানুষের সাথে কথা বলতে ভালোবাসতেন। তিনি যখনই সময়ে পেতেন, মানুষের সমাগম যেখানেই হতো, সেখানেই তিনি বক্তব্য দিতেন। সেই বক্তব্যগুলো ছিলো, সক্রেটিসের ভাষায়, 'দৈব বাণী' বাঁ 'ঈশ্বরের বাণী'। এজন্যে... ...বাকিটুকু পড়ুন

লাল বদর, কালা বদর এবং ছাপরি.....

লিখেছেন জুল ভার্ন, ২৮ শে সেপ্টেম্বর, ২০২৬ সকাল ১০:১১

লাল বদর, কালা বদর এবং ছাপরি.....

লাল বদরঃ ২০২৪ সালের জুলাই-আগস্টের গণঅভ্যুত্থানের প্রেক্ষাপটে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তৈরি হওয়া একটি নতুন ও রাজনৈতিক কটূক্তিবাচক শব্দ বা স্লোগান। কোটা সংস্কার আন্দোলন ও সরকার পতনের... ...বাকিটুকু পড়ুন

পাকিস্তান পারল, বাংলাদেশ পারল না কেন: আরও একটি প্রশ্ন

লিখেছেন মুনতাসির, ২৮ শে সেপ্টেম্বর, ২০২৬ সকাল ১১:৫০

প্রথম আলোতে মুনির হাসানের ‘পাকিস্তান পারল, বাংলাদেশ পারল না কেন’ লেখাটি পড়লাম। পাকিস্তানে Google-এর নিজস্ব অফিস চালু হওয়াকে সামনে রেখে তিনি একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন তুলেছেন: তথ্যপ্রযুক্তি খাতে একসময় খুব বেশি... ...বাকিটুকু পড়ুন

সর্ব্বহারা

লিখেছেন রাজীব নুর, ২৮ শে সেপ্টেম্বর, ২০২৬ দুপুর ১২:৫০



দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময়।
১৯৪৩ সালে জাপান ভারতে আচমকা বেশ কিছু বোমা হামলা করে। সম্ভবত হিটলারকে খুশি করতেই জাপান এই কাজ করে। একের পর এক বোমা ফেলে মাদ্রাজে (বতর্মান... ...বাকিটুকু পড়ুন

×