somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

লেডিস ডে আউট

০৮ ই সেপ্টেম্বর, ২০২০ রাত ১০:৩৪
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :


১.
আজকে লেডিস ডে আউট। তবে সাথে ফেউ জুটে গেছে। ছাও পাও ঘরে রেখে আসা যায় নি। তারা যথারীতি ট্রেন কাঁপিয়ে ফেলেছে। তাও ভাল, কামরার এদিকটায় লোকজন কম। দুই সিট পেছনে শুধু দুই তরুন বসে আছে। তারাও জোর ভল্যুমে গান ছেড়ে চুক্ চুক্ করে বিয়ার টানছে। হল্লাহাটির অভাব নেই। এর মাঝেই আমরা ক’জন বঙ্গ ললনা আধবোজা চোখে আধ-গরম সমুচা চিবোচ্ছি।

গরমের এই সময়টায় কিন্ডারগার্টেন-স্কুল ছুটি থাকে। তার সাথে মিলিয়ে দিন কতক ছুটি নিতে হয়েছে। সময়টা শুয়ে বসে কাটিয়ে দেবো-এই ছিল আলসে ফন্দির ফানুস পিন দিয়ে ফুটিয়ে আমাকে টেনে বের করা হয়েছে ভুলিয়ে ভালিয়ে। এমন ঝটিকা সফরের আয়োজন খুব পাকা হাতের কাজ। মুখোমুখি সিটে গা এলিয়ে বসে মৌরি আপুর মুখে বিজয়ীর হাসি। ‘কি, কেমন লাগছে?’। ঠান্ডা কমলার জুসে চুমুক দিতে দিতে একান ওকান হেসে উত্তরটা দেয়া হয়ে গেল। পথে যেতে যেতে সমুচা-সিঙ্গারা, অদেখা শহরতলির অলিগলিতে এলোমেলো হেঁটে বেড়ানো, লেকের পাড়ে পিকনিক, ব্যাস-আর কিছু বলতে হয় নি। হাতের কাছে জামা-জুতো যা পেয়েছি, হাতে-পায়ে গলিয়ে এক ছুটে এই বব গাড়ি ধরেছি।

বব গাড়িই তো। ট্রেনের গায়ে বড় বড় করে লেখা আছে, BOB। বায়েরিশা ওবারল্যান্ডবান বা Bayerische Oberlandbahn-এর সংক্ষেপ। জার্মান ঢং আর এমন কি, শুনেছি সুইস রঙ নাকি আরেক কাঠি সরেস। তাদের কোন এক ট্রেন সার্ভিসের নাম, ফ্লার্ট। খটমটে বারো হাত নাম ‘Fast Light Inter-city & Regional Train’ ছোট্ট হয়ে গিয়ে দারুন দুষ্ট FLIRT হয়ে গেছে। অমন ট্রেনে চেপে কাজ নেই। তার চেয়ে বব ভাইয়াই ভাল।

শহরের বুড়ো আঙ্গুল দেখিয়ে ট্রেন ছুটে চলছে সারি সারি ভুট্টা ক্ষেতের মাঝ দিয়ে। এমন ঘন ক্ষেতের আড়ালে অনায়াসে এক আধটা ইউএফও লুকিয়ে থাকতে পারে। হঠাৎ কচু পাতা রঙের কোনো হ্যান্ডসাম এলিয়েনের দেখা পেলে মন্দ হত না। আজকে লেডিস ডে বলে কথা। ঝাড়া হাত-পা। হা করে জানালার বাইরে তাকিয়ে আছি দেখে তুনা প্রশ্ন ছুড়লো, ‘আপু বোধহয় খুব একটা বেড়াতে বের হন না?’ এলিয়েন খোঁজা বাদ দিয়ে অল্পবয়সী বাচ্চা মেয়েটার দিকে তাকালাম।

হালকা পাতলা ছিপছিপে তুনাকে দেখে বুয়েট পাশ মেকানিক্যাল ইঞ্জিনিয়ার মনেই হয় না। তার সাথে ইদানীং যোগ হয়েছে একটা জার্মান এম.এস.। আমার জবাবের অপেক্ষা না করেই পিএইচডি পাশ ফ্রাউ ডক্টর মৌরি আপু যোগ করলো, ‘ওর আসলে ‘দেখা হয় নাই চক্ষু মেলিয়া’ অবস্থা। যে দেশে বাস, সেটাই দেখা হয় নি।’ ব্যাপারটা সলজ্জে মাথা নেড়ে স্বীকার করতেই হল। কড়ে গুনলে প্রায় বছর আষ্টেক আছি এই প্রবাসে। কিন্তু জার্মানি বলতে ঐ মিউনিখই বুঝি। কুয়ার ব্যাঙ যাকে বলে। তবে ব্যাঙটা আজকে এই বিদ্যাবতী বিদুষীদের সাথে ঘুরে ঘুরে মানুষ হবার একটা ট্রাই মেরে দেখবে।

২.
গল্পে আড্ডায় সময় কর্পূরের মত উধাও। মাঠ-ঘাট, পাহাড়ি পথ পেরিয়ে পাতার ফাঁকে নীল জল ঝিলিক দিয়ে উঁকি দিল। ট্রেন এসে থামলো টেগের্নসী স্টেশনে। নামের সাথে ‘সী’ থাকা মানেই এখানে একটা লেক আছে। ইংরেজিতে যাহাই লেক, জার্মানে তাহাই ‘সী’। সমতল থেকে প্রায় সাড়ে সাতশো মিটার উঁচুতে বাভারিয়ান আলপ্স ঘেরা টেগের্নসী নাকি জার্মানির টপ টেন লিস্টে থাকা লেক। আজকে তাহলে সৌন্দর্য পরীক্ষা হয়ে যাক। সত্য হলে ‘আরে ওয়াহ্, ওয়াহ্’ বলে খৈয়াম কিংবা গালীবের রোমান্টিক দু’একটা শের-শায়েরী ঝেড়ে দেবো। আর মিথ্যে হলে লেক পাড়ের কোনো গাছের ডাল ভেঙ্গে রেখে যাব। বহুত খতরনাক লোক আমরা।

বাচ্চাওয়ালা ভদ্রমহিলা বলতেই যে সাদাকালো ম্যাট্ম্যাটে ছবিটা ভেসে ওঠে, সেটাকে দু’আঙ্গুলে টশকে দিয়ে বাচ্চা আর ভদ্রমহিলা আমরা ট্রেনের উঁচু সিড়ি টপকে লাফিয়ে নেমে এসে মাঝ দুপুরের কড়া রোদকে বাঁকা হেসে কোমরে হাত রেখে দাঁড়ালাম। আমাদের চৌকস ল্যান্ডিং দেখে আরো দশ সেকেন্ড আগে নেমে পড়া টগবগে তরুনী তুনা কুমারী খাপখোলা সামুরাই সোর্ডের মত ঝনঝনিয়ে হাসছে।

লেক-টেকের আর তোয়াক্কা না করে ঘষামাজা সাইনবোর্ড ঝোলানো দুই নম্বরি চেহারার এক চাইনিজ রেস্তোরাঁ বরাবর পা চালালাম। ক্ষুধাই আসল। বেড়ানো নকল। সৌন্দর্য গিলে কবে কার পেট ভরেছে ঠিক মনে পড়ছে না। তবে স্টির ফ্রাই ভেজিটেবল উইথ স্টিমড রাইস খেলে পেট, মন দু’টোই যে সমান তালে ভরবে, তা কি আর বলে দিতে হয়। সয়া সস ছিটিয়ে সাদা ভাত কালো করে দিতে দিতে আলাপ এগোতে থাকলো। ঠিক হল, ছক বেঁধে কিছু করা যাবে না। যেদিকে দু’চোখ যায় সেদিকে হাঁটবো। ঘুর ঘুর লাটিম লাটিম একটা দিন। আর, পা বাড়ালে পথ নাকি আপনা থেকেই তৈরি হয়ে যায়।

বিল চুকিয়ে শুরু হল আমাদের দিগ্বিদিক হন্টন। এই খেয়ালখুশির এলোমেলো হাঁটাকে অবশ্য পাঁচ মিনিটে লাইনে নিয়ে আসলো মৌরি আপু। সে আজকের রাখাল। বার দুই দাবড়ানি খেয়ে ভেড়ার পাল আমরা রীতিমত রাস্তার নাম ধরে ধরে এগোচ্ছি। কোথায় গেলে কতক্ষনে যে একটু জাবর কাটার অবসর মিলবে, কে জানে। আয়েশী চিন্তাটার সাথে দুপুরের রোদটা মিশে গিয়ে আরামদায়ক আবেশে চোখ বুজিয়ে দিতে চাইছে। (চলবে)
সর্বশেষ এডিট : ১২ ই সেপ্টেম্বর, ২০২০ রাত ১:১৮
১৩টি মন্তব্য ১৩টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

নাইজেরিয়ায় ধর্ষকদের পুরষ্কার স্বরূপ খোজাকরণ, শিশু ধর্ষণকারীদের মৃত্যুদন্ডের বিধান; আপনি কি একে নিছকই নির্মমতা বলবেন? আমাদের দেশের ধর্ষকবৃন্দকে এমন পুরষ্কার দেয়ার পক্ষে আওয়াজ তুলুন!!!!

লিখেছেন নতুন নকিব, ২৮ শে সেপ্টেম্বর, ২০২০ বিকাল ৫:১৫

ছবি: অন্তর্জাল।

নাইজেরিয়ায় ধর্ষকদের পুরষ্কার স্বরূপ খোজাকরণ, শিশু ধর্ষণকারীদের মৃত্যুদন্ডের বিধান; আপনি কি একে নিছকই নির্মমতা বলবেন? আমাদের দেশের ধর্ষকবৃন্দকে এমন পুরষ্কার দেয়ার পক্ষে আওয়াজ তুলুন!!!!

পৃথিবী জুড়েই বারবার ধর্ষণের... ...বাকিটুকু পড়ুন

মানুষ নিজ বাড়ীতে বাস করে, মাসে ৪/৫ হাজার টাকা আয় করতে পারবেন?

লিখেছেন চাঁদগাজী, ২৮ শে সেপ্টেম্বর, ২০২০ সন্ধ্যা ৬:০১



মানুষ যাতে নিজ গ্রামে, নিজ ঘরে, নিজ পরিবারে বাস করে মাসে ৪/৫ হাজার টাকা আয় করে, কিছুটা সুস্হ পরিবেশে জীবন যাপন করতে পারেন, সেটার জন্য কি করা... ...বাকিটুকু পড়ুন

সত্যবাদিতা দেশে দেশে

লিখেছেন মা.হাসান, ২৮ শে সেপ্টেম্বর, ২০২০ রাত ৮:৪৬

নূর মোহাম্মদ নূরু ভাই সাম্প্রতিক সময়ে মানুষের সত্য বিমুখতা নিয়ে একটি পোস্ট দিয়েছিলেন- মিথ্যার কাছে পরাভূত সত্য (একটি শিক্ষণীয় গল্প) । ঐ পোস্টের কমেন্টে কতিপয় দেশি-বিদেশি জ্ঞানীগুণী ব্লগার তাদের... ...বাকিটুকু পড়ুন

চিলেকোঠার প্রেম-৯

লিখেছেন কবিতা পড়ার প্রহর, ২৮ শে সেপ্টেম্বর, ২০২০ রাত ১০:১৩

এর ঠিক পরের দিনই কোনো এক ছুটির দিন ছিলো সেদিন। বাসাতেই ছিলাম আমরা দু'জন। সকাল থেকেই আমার ভীষন গরম গরম খিঁচুড়ি আর সেই ধোঁয়া ওঠা খিঁচুড়ির সাথে এক চামচ... ...বাকিটুকু পড়ুন

একলা ডাহুক

লিখেছেন মনিরা সুলতানা, ২৯ শে সেপ্টেম্বর, ২০২০ সকাল ১১:৩৮



বুকের চাতালে দিনমান কিসের বাদ্যি বাজাও !
কইলজার মইধ্যে ঘাইদেয় সেই বাজন গো বাজনদার।
চোরকাঁটার মতন মাঠঘাট পার হইয়া অন্দরে সিধাও ক্যান কইতে পারো
নিজের বিছনায় ও আমার আরাম নাই।

হইলদা বনে... ...বাকিটুকু পড়ুন

×