
কাঁচের দেয়াল ঘেরা মিউনিখ শহরটা দূরে অধোবদনে দাঁড়িয়ে। নিশ্ছিদ্র ফোঁকর গলে লোকগুলো চম্পট দিচ্ছে, ব্যাপারটা তার ঠিক ভাল লাগছে না। তাই বোধহয় আস্ত এক খন্ড কালো মেঘ পাঠিয়ে দিয়েছে। যেটা কিনা পিছু নিয়েছে বেশ কিছুক্ষন হল। কিন্তু হাইওয়েতে উঠে আমাদের আর পায় কে। প্যাডেল চেপে প্রায় ধনুক ছেড়া তীরের গতিতে ধূলো উড়িয়ে, গাড়ি হাঁকিয়ে পালিয়ে যাচ্ছি।
শুক্রবারটা ছুটি নিয়ে দু’দিনের শনি-রবিকে টেনেটুনে তিন দিনের মামলা বানিয়ে ছুটে চলছি ষ্টুটগার্ট বরাবর। মিউনিখের কালো মেঘকে কচু দেখাতে তাই বাঁধছে না কোথাও। তাছাড়া উঁচু-নিচু পাহাড়ি শহর স্টুটগার্টের আবেদনটা বেশ গাঢ়। সেখানে এক বন্ধু দম্পতি খিচুড়ি আর গরুর মাংস চুলায় চাপিয়ে অপেক্ষা করছে আমাদের জন্যে। ধোঁয়া ওঠা খাবারের ঘ্রান আমাদের ‘আয় খুকু, আয়‘ সুরে ডাকছে। সে ডাক উপেক্ষা করে সাধ্যি কার। তাই চার ঘন্টা ঠেঙ্গিয়ে মিউনিখ-টু-ষ্টুটগার্ট যাত্রাটা অত মন্দ লাগছে না। যাত্রা শেষে প্রাপ্তির পুরোটা পেটে চালান করে দেবো।
খাদ্য চিন্তায় মগ্ন হয়ে গাড়ির সিটে গা এলিয়ে দিয়েছি। খিচুড়ির সাথে বোনাস হিসেবে বেগুন ভাজা থাকবে, কি থাকবে না-এই তরল চিন্তার বায়বীয় বুদ্বুদ থেকে বের হতে পারছি না। সাথে যদি টকটকে লাল টমেটোর ভেতর থেকে সবুজ কাঁচামরিচ আর হালকা গোলাপি পেঁয়াজকুঁচিরা উঁকিঝুঁকি মারে, তাহলে তো আর কথাই নেই। সরিষার তেলের ঝাঁজ নাকে এসে সপাটে আঘাত হেনে গেল যেন। হাতে স্টিয়ারিং থাকলে এতক্ষনে বে-লাইনে গাড়ি চালিয়ে দিতাম নির্ঘাৎ।
বাঙ্গালির হেঁসেল থেকে লোভাতুর মনটা বাঁকিয়ে চুরিয়ে বের করে একেবার জার্মান অটোবানে এনে ছুড়ে ফেললাম। যাহাই জার্মান ‘অটোবান’, তাহাই ইংরেজি হাইওয়ে আর সেটাই বাংলায় মহাসড়ক। তবে অটোবানে একটা আলাদা রোমাঞ্চ আছে। আর সেটা হল গতির পরোয়া না করা। অটোবানের অনেক পথেই গতিসীমার মাত্রা নেই। হাঁকাও গাড়ি যত খুশি হেইয়ো। আর ডানে-বামে ঘটছেও তাই। পাগলাটে খুনে গাড়িগুলো শাঁই শাঁই প্রায় উড়ে যাচ্ছে যেন। ঘন্টা দু’শো কিলোমিটার বেগে আমরাও চলছি। কিন্তু তৃপ্তি মেলার আগেই পাশ ঘেষে লাল ফেরারিটা ধূমকেতুর মত মিলিয়ে গিয়ে বুঝিয়ে দিল গতির খেলার তার কাছে আমাদের সেকেন্ডহ্যান্ড কালো ভক্সওয়াগন এক বুড়ো কচ্ছপ বিশেষ।
বুড়ো কাছিমের পিঠেই না হয় পাড়ি দিলাম পথ। পেছনের সিটে ছয় বছরের ছেলেটা ঘুমে ঢুলুঢুলু। স্বছ লালার একটা স্রোত একবার গড়িয়ে নামছে তো আবার সুড়ুৎ করে ঠোঁটের ফাঁকে উল্টোরথ ধরছে। ছেলের বাবার সেই আয়েশের জো নেই। তাকে তীক্ষ্ণ চোখে, শক্ত হাতে গাড়ির হাল ধরে বসে থাকতে হচ্ছে। একমাত্র আমারই কাজ নেই। নিজেকে বিরাট কাছিমের পেটের অলস ডিম বলে মনে হচ্ছে। অবশ্য আলসেমিতে আগ্রহ ষোলআনা। সাথে করে ব্যবস্থাপাতিও কম আনি নি। সিটের নিচ থেকে কোল্ড কফির ক্যান বের করলাম ব্যাগ হাতড়ে। ঠান্ডা চুমুকে চারপাশটা দেখছি তাড়িয়ে তাড়িয়ে। শীতল আবেশের আয়েশী আবেগে চোখ বুজে আসছে প্রায়।
জানালার বাইরে ভুট্টা ক্ষেতের সারি। তার যেন বাধ্য সেনাদলের মত মাথা নুইয়ে আছে। গাড়ির কুচকাওয়াজ সরে গেলে আবার আরামে দাঁড়াবে সটান। আকাশটাও আজ দেখার মতন। এখানে ওখানে মেঘদল। কিছুটা হতবিহ্বল। বৃষ্টি হয়ে নামবে, নাকি নীরবে সরে গিয়ে এক আকাশ রোদকে জায়গা করে দিবে-এই নিয়ে যেন বিরাট দ্বিধায় আছে। সেই সুযোগে দুষ্টু সূর্যটা মিষ্টি হাসছে ফাঁক পেলেই। দূরের শুভ্র উইন্ডমিলগুলো আস্তে আস্তে ঘুরে চলছে আপন মনে। তাদেরকে স্পিনিং দরবেশ বলে ভুল হতে চায়। উইন্ডমিল নয়, সাদা আলখেল্লা জড়িয়ে তুর্কি সুফীর দল চক্রাকারে উদ্বাহু ঘুরছে যেন। আকাশের মেঘ-রোদের লুকোচুরি, অটোবানের গাড়িঘোড়ার উন্মাদনা, কোনো কিছুই স্পর্শ করছে না তাদের। দশ দিগন্তের মাঝে দাঁড়িয়ে ঘূর্ণি ধ্যানে মগ্ন নির্বিকার, নির্নিমেষ।
মোক্ষলাভের নেশাটা পেয়ে বসেছিল। যদি না অতর্কিতে গাড়ির গতি কমে এসে ঝাঁকুনি না লাগাতো। হালকা-পাতলা একটা দুর্ঘটনা ঘটেছে মনে হচ্ছে। গাড়ির সারিগুলো হ্যাজার্ড বাতি জানিয়ে আগাম জানা দিচ্ছে, ‘সামনে সাবধান’। অটোবানের দুর্ঘটনা অবশ্য হালকা-পাতলা হয় না। মোটাসোটা কিসিমেরই হয়। তীব্র গতির দু’টো ধাতব যন্ত্র একে অন্যকে ছুয়ে গেলেও ‘ফাস্ট এ্যান্ড ফিউরিয়াস’ কায়দায় উল্টে গিয়ে পাক খেয়ে গোত্তা খেয়ে কোন দূরে পড়বে কে জানে। এর যাত্রীরা বেশির ভাগ ক্ষেত্রে অটোবান থেকে একবারে স্বর্গযানে উঠে পড়েন আর কি। অটোবানের অভিধানে মাঝামাঝি বলে কিছু নেই। ‘হেল অর হাইওয়ে’।
কপাল ভাল। দোমড়ানো গাড়ি, ভাঙ্গাচোরা যাত্রী আর প্যাঁ পোঁ অ্যাম্বুলেন্স দেখতে হল না। বিকল হয়ে দাঁড়িয়ে থাকা একটা নিরীহ চেহারার পোর্শে কনভার্টিবলকে তুলতে বিশালাকার রেসকিউ ট্রাক এসেছে। টেনে তোলার তোড়জোড় চলছে। আর তাতেই শ’খানেক গাড়ির স্রোত থমকে গিয়েছে হঠাৎ। (চলবে)



সর্বশেষ এডিট : ০৬ ই অক্টোবর, ২০২১ ভোর ৫:২৯

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।



