
মানবাধিকার সংস্থা আইন ও সালিশ কেন্দ্র (আসক) প্রকাশিত বার্ষিক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, রাজনৈতিক পরিবর্তন ও সংস্কারের প্রতিশ্রুতি সত্ত্বেও ২০২৫ সালে বাংলাদেশে সামগ্রিক মানবাধিকার পরিস্থিতির উদ্বেগজনক অবনতি ঘটেছে। প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়, কর্তৃত্ববাদী সরকারের পতন, অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের গঠন এবং গণতান্ত্রিক উত্তরণের আশ্বাসের কারণে ২০২৫ সাল রাজনৈতিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ হলেও নাগরিকদের অধিকার ও স্বাধীনতার ক্ষেত্রে দৃশ্যমান কোনো ইতিবাচক পরিবর্তন দেখা যায়নি।
গণপিটুনি ও বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড বৃদ্ধি
প্রতিবেদনে চিহ্নিত সবচেয়ে উদ্বেগজনক প্রবণতাগুলোর একটি হলো গণপিটুনির ভয়াবহ বৃদ্ধি। আসকের তথ্যমতে, ২০২৫ সালের জানুয়ারি থেকে ডিসেম্বর পর্যন্ত অন্তত ১৯৭ জন গণপিটুনিতে নিহত হয়েছেন, যেখানে ২০২৪ সালে এ সংখ্যা ছিল ১২৮। নিহতদের মধ্যে ধর্মীয় সংখ্যালঘু, নারী ও প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর সদস্যরা রয়েছেন, যাদের অনেককেই গুজব বা সন্দেহের ভিত্তিতে কোনো বিচারিক প্রক্রিয়া ছাড়াই হত্যা করা হয়েছে। প্রতিবেদনে ‘ক্রসফায়ার’ বা ‘বন্দুকযুদ্ধ’ নামে বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ডের ধারাবাহিকতাও তুলে ধরা হয়েছে। ২০২৫ সালে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর হেফাজত বা অভিযানে অন্তত ৩৮ জন নিহত হন, যা নিরাপত্তা বাহিনীর মধ্যে দায়মুক্তির একটি স্থায়ী সংস্কৃতির ইঙ্গিত দেয় বলে আসক মন্তব্য করেছে।
হেফাজতে মৃত্যু ও কারাগারের পরিস্থিতি নিয়ে গুরুতর উদ্বেগ
হেফাজতে মৃত্যুর ঘটনাও বড় ধরনের উদ্বেগ হিসেবে উঠে এসেছে। আসকের নথিভুক্ত তথ্যমতে, ২০২৫ সালে দেশের বিভিন্ন কারাগারে অন্তত ১০৭ জনের মৃত্যু হয়েছে, যা আগের বছরের তুলনায় উল্লেখযোগ্যভাবে বেশি। প্রতিবেদনে বলা হয়, অনেক বন্দি সময়মতো চিকিৎসাসেবা না পাওয়ায় মারা গেছেন, যা রাষ্ট্রের দায়বদ্ধতা এবং সংবিধান ও আন্তর্জাতিক মানবাধিকার মানদণ্ড মেনে চলার বিষয়ে গুরুতর প্রশ্ন তোলে।
মতপ্রকাশের স্বাধীনতা হুমকির মুখে
প্রতিবেদনে ২০২৫ সালকে মতপ্রকাশের স্বাধীনতা ও গণমাধ্যমের স্বাধীনতার জন্য একটি অন্ধকার সময় হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। ১৮ ডিসেম্বর দ্য ডেইলি স্টার ও প্রথম আলোর কার্যালয়ে সংঘটিত সমন্বিত হামলাকে বাংলাদেশের ইতিহাসে সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনতার ওপর সবচেয়ে গুরুতর আঘাতগুলোর একটি হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। এ ঘটনায় সাংবাদিকরা ভয়ভীতি, শারীরিক নিরাপত্তাহীনতা এবং প্রকাশনা কার্যক্রম বন্ধ হয়ে যাওয়ার মুখে পড়েন। আসকের মতে, এসব ঘটনা গণমাধ্যমে ভয় ও আতঙ্কের পরিবেশ তৈরি করেছে। প্রতিবেদনে আরও বলা হয়, সংবিধানে বাকস্বাধীনতার নিশ্চয়তা থাকা সত্ত্বেও সমালোচক, সাংবাদিক ও বিরোধী মতের কণ্ঠ রোধে দমনমূলক আইনগুলোর অপব্যবহার অব্যাহত রয়েছে, ফলে ভিন্নমতের পরিসর ক্রমেই সংকুচিত হচ্ছে।
নারী, সংখ্যালঘু ও রাজনৈতিক অধিকার
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২০২৫ সালজুড়ে নারী নির্যাতন—যার মধ্যে ধর্ষণ, দলবদ্ধ ধর্ষণ, অনলাইন হয়রানি এবং তথাকথিত ‘মোরাল পুলিশিং’—ব্যাপকভাবে অব্যাহত ছিল। একই সঙ্গে ধর্মীয় সংখ্যালঘু ও সাংস্কৃতিক প্রতিষ্ঠানগুলোর বিরুদ্ধে বৈরিতা বৃদ্ধির কথাও নথিভুক্ত করা হয়েছে, যা সমাজের কিছু অংশে অসহিষ্ণুতা ও উগ্রতার বিস্তারের প্রতিফলন। রাজনৈতিক ক্ষেত্রেও আসক উদ্বেগ প্রকাশ করে জানায়, রাজনৈতিক অংশগ্রহণ কার্যত সীমিত করে এমন কিছু সিদ্ধান্ত সংবিধানপ্রদত্ত সুরক্ষার পরিপন্থী এবং বহুদলীয় গণতন্ত্রকে দুর্বল করে।
সুস্পষ্ট রোডম্যাপ ছাড়া সংস্কারের প্রতিশ্রুতি
অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের পক্ষ থেকে সংস্কার কমিশন গঠন ও আন্তর্জাতিক কনভেনশন অনুমোদনের মতো কিছু পদক্ষেপ স্বীকার করলেও আসক বলেছে, এসব উদ্যোগ বাস্তবায়নের জন্য কোনো সুস্পষ্ট রোডম্যাপ দেখা যাচ্ছে না। সংস্থাটির মতে, জবাবদিহিতা, প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কার এবং আইনের শাসনের প্রতি শ্রদ্ধা নিশ্চিত না হলে কাঠামোগত মানবাধিকার লঙ্ঘন অব্যাহত থাকার আশঙ্কা রয়েছে।
জবাবদিহিতার আহ্বান
প্রতিবেদনের শেষে আসক সরকারকে মানবাধিকার লঙ্ঘনের ঘটনায় নিরপেক্ষ তদন্ত নিশ্চিত করা, অপরাধীদের পরিচয় নির্বিশেষে জবাবদিহির আওতায় আনা, মতপ্রকাশের স্বাধীনতা সুরক্ষিত করা এবং গণতান্ত্রিক উত্তরণ প্রক্রিয়ার কেন্দ্রে মানবিক মর্যাদাকে স্থান দেওয়ার আহ্বান জানিয়েছে।
সর্বশেষ এডিট : ০১ লা জানুয়ারি, ২০২৬ সকাল ৯:২৭

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।



