দিনটির তুলনা হয় না অন্য আর কোনো দিনের সাথে। কারণ ঐদিন আমরা কয়েকজন বন্ধু এক চমৎকার সিদ্ধান্তে উপনীত হয়েছিলাম। সিদ্ধান্ত ছিল এ জার্নি টু কুয়াকাটা।
রমজানের রোজার মধ্যে পর্যালোচনা হচ্ছিল ঈদের পর আমরা কোথাও হারিয়ে যাবো। এ যেন ঈদের পর আর একটি ঈদ। কাঙ্ক্ষিত সেই দিনটির জন্য আমরা সবাই অপেক্ষার প্রহর গুনছি। আসলেই কি যাওয়া হবে, নাকি হবে না এই আশঙ্কায় আমাদের কেউ কেউ ছিল দিশেহারা।
যাক, শত জল্পনা আর কল্পনার অবসান ঘটিয়ে শেষ মুহূর্তে আমরা সঠিক সিদ্ধান্তে উপনীত হতে পেরেছিলাম। যদিও আমাদের কিছু বন্ধু বিশেষ এই সফরে অংশগ্রহণ করতে পারেনি। তবুও আমরা তাদের জন্য অপেক্ষা করছিলাম, যার কারণে ভ্রমণটি পরিপূর্ণ করতে পারা গেল না।
এবার যাওয়ার পালা।
ঘড়ির কাঁটা এগোচ্ছে তার নিজস্ব গতিতে।
যাহোক শেষ পর্যন্ত বিকেল ৪টায় যাত্রা শুরু হলো।
আমাদের এক গ্রুপকে আগেই পাঠিয়ে দেয়া হলো লঞ্চ বুকিং দেয়ার জন্য। চমকে যাওয়ার মতো কথা! লঞ্চ বুকিং! আসলে লঞ্চের ব্যাপারটা এমনই। আগে থেকেই এখানে জায়গা নির্ধারণ করে নিতে হয়। আমাদের প্রায় সবারই এটাই প্রথম লঞ্চ ভ্রমণ। লঞ্চ ভ্রমণ যে এত্ত মজার তা নিজে না করলে বলে বোঝানো যাবে না। এখানে সব ব্যবস্থাই আছে। যেন একটা বাড়ি।
সারা রাত লঞ্চে থেকে অবশেষে পৌঁছালাম বরিশাল সিটিতে। এবার শুরু হলো কখন কোথায় যাবো তার পরিকল্পনা। শেষে সিদ্ধান্ত হলো বরিশাল সিটিতে বেড়ানোর পর আমরা যাব কুয়াকাটায়।
গাড়িতে করে সকাল সাড়ে ১১টায় আমরা যাত্রা শুরু করলাম কুয়াকাটার উদ্দেশে। প্রায় ৬-৭ ঘণ্টার জার্নি শেষে পৌঁছালাম বহু প্রত্যাশিত সেই সাগরকন্যা কুয়াকাটায়।
এত দীর্ঘ পথ যার বিবরণ দেয়া সংক্ষিপ্ত পরিসরে সম্ভব নয় তবে এতটুকু বলা যায় যে পাঁচটা ফেরি পার হতে হয়, যা আমাদের জন্য বেদনার হলেও প্রতীক্ষমাণ সেই সাগরকন্যার তীরে পৌঁছার পর সব ভুলে গেলাম।
মনের মধ্যে এতটুকু ভয় যে আমরা কুয়াকাটায় যাব সূর্যি মামাকে বিদায় দেয়ার জন্য যদি না পারি তবে এটা হবে আমাদের সফরের সবচেয়ে বড় ব্যর্থতা। যাক, আমরা একেবারে শেষ মুহূর্তে গিয়ে পৌঁছলাম, যখন সূর্যি মামা বিদায়ের প্রস্তুতি গ্রহণ করছে।
কুয়াকাটা! পৃথিবীতে যত রকম চমৎকার সৃষ্টি আছে তার মধ্যে অন্যতম একটা। সাগরকন্যা যার অপর নাম। এখানে এলেই না বোঝা যাবে কী অপূর্ব সেই সৃষ্টি!
রাত! আশ্চর্যজনক ভয়ের এক আনন্দঘন পরিবেশ সাগরকন্যার তীরে।
আমরা দেশাত্মবোধক গান, বিভিন্ন সুর-সঙ্গীত আর কৌতুকের মাধ্যমে রাতের একাংশ কাটিয়ে দিলাম। আমাদের সফর সঙ্গীদের সুরেলাকণ্ঠে গান, সাগর নদী আর পাহাড় বনে, পাখিদের গুনগুন গুঞ্জরণে এসব গান সাগরের উন্মাদনাকে আরও বাড়িয়ে দিচ্ছিল বহুগুণে। সেই সাথে আমাদের মনকেও।
খুব অল্প সময়ের ব্যবধানে ওখানকার প্রায় সব মানুষের সাথে আমাদের পরিচয় হলো। মনে হলো তারা যেন আমাদের বহুদিনের পরিচিত। আমাদেরকে সবকিছু ঘুরিয়ে দেখানোটা তারা তাদের দায়িত্ব মনে করল। প্রশ্ন দেখা দিল রাতে থাকব কোথায়? অবশেষে পেলাম আমাদের আপাতত থাকার জায়গা। সবাই মিলে একসাথে থাকার সে কী মজা!
সকালে সবাই আবার ব্যস্ত সূর্যি মামাকে রিসিভ করতে। কিন্তু মামা যে একটু দূরে অবস্থান করছেন। তার নাগাল পেতে আমাদের কেউ ছুটল পায়ে হেঁটে, কেউবা দৌড়িয়ে, কেউ আবার মোটরসাইকেলে ঝাউবনের পাশ দিয়ে। শুরু হলো ছবি তোলার পালা। আমি ঝিনুক কুড়াতে শুরু করলে অনেকেই এসে আমার সাথে যোগ দিল। মামাকে রিসিভ করেই আমরা সবাই নিজেদের লুটিয়ে দিলাম সাগরকন্যার নীল জলে। বিশাল এই সাগরের বুকে সবাই মিলে এক সাথে গোসল করতে যে কী মজা তা বলে বোঝাতে পারব না।
এবার বিদায়ের পালা। প্রকৃতির এই নৈসর্গিক এক জায়গা থেকে খুব অল্প সময়ের ব্যবধানে ফিরে যেতে হবে নিজেকে তা বিশ্বাস করাতে পারছিলাম না। এত সুন্দর, অপরূপ সৃষ্টির মাঝখান থেকে বিদায় নেয়াটা একটু কঠিনই বটে। তারপর সব মায়ার বাঁধন ছিন্ন করে চলে এলাম সাগরকন্যার তীর থেকে।
টানা ৫-৬ ঘণ্টা গাড়িতে করে আমরা চলে এলাম পটুয়াখালীতে। সেখানে আমরা দুপুরে ইলিশসহ আরও অনেক রকম মজার মজার খাবার উপভোগ করলাম।
পটুয়াখালী থেকে সন্ধ্যায় ফিরে এলাম বরিশাল নৌবন্দরে। তারপর আবার সেই লঞ্চে সারারাত অবস্থান করে সকালে এসে পৌঁছলাম আমাদের সবার গন্তব্যস্থল ঢাকায়। ঢাকায় ফিরে এলেও আমাদের মন যেন পড়ে রইল সেই সাগরকন্যার তীরে, মায়াবী নীল জলের ঢেউয়ের ভাঁজে ভাঁজে।
ভ্রমণ-১: গন্তব্য যখন মাধবপুর লেক-এ

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।


