আফগানিস্তানে সৈন্য পাঠানোর অনুরোধের পর বাংলাদেশ ॥ সতর্ক অবস্থানে
সরকার মার্কিন চাপ থেকে সরে আসতে পারে
সোহেল রহমান ॥ আফগানিস্তানে সেনা পাঠাতে যুক্তরাষ্ট্র সরকারের অনুরোধের পর কৌশলগতভাবে সতর্ক অবস্থান নিয়েছে বাংলাদেশ। মার্কিন অনুরোধ সরাসরি প্রত্যাখ্যান না করলেও আফগানিস্তানে সৈন্য পাঠানোর ভবিষ্যত পরিণতি নিয়েও চিন্তাভাবনা করছে সরকারের নীতিনির্ধারকরা। এ নিয়ে সরকারের উচ্চপর্যায় থেকে সরাসরি কোন মন্তব্য না আসলেও বিষয়টি গভীরভাবে পর্যবেক্ষণ করা হচ্ছে। সৈন্য পাঠালে দেশের অভ্যন্তরে বিরূপ প্রভাবের কারণ দেখিয়ে সরকার শেষ পর্যন্ত মার্কিন চাপ থেকে সরে আসতে পারে বলে ইঙ্গিত দিয়েছে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সূত্রগুলো।
পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় সূত্র জানিয়েছে, যুক্তরাষ্ট্রবিরোধী আল কায়েদা ও তালেবান অধু্যষিত ওই যুদ্ধবিধ্বসত্ম দেশটি থেকে সেনা প্রত্যাহারের পরিকল্পনা করছে ওয়াশিংটন। বিশেষ করে আগামী বছরের মাঝামাঝিতে আফগানিসত্মান থেকে ন্যাটো নেতৃত্বাধীন বাহিনীর সকল সৈন্য প্রত্যাহারের সময়সীমা নির্ধারণ করেছে যুক্তরাষ্ট্র। এর আগে আফগানিসত্মানের নিজস্ব বাহিনীকে গোটা দেশটির নিরাপত্তা নিশ্চিত করার জন্য সৰম একটি বাহিনী হিসেবে গড়ে তোলার পরিকল্পনা নিয়েছে। এ অবস্থায় যুক্তরাষ্ট্র সরকার আফগানিসত্মানে সেনা পাঠাতে বাংলাদেশকে রাজি করানোর চেষ্টা করছে। ২০০১ সালে যুক্তরাষ্ট্রের টুইন টাওয়ারে আল কায়েদার বোমা হামলার পর সন্ত্রাসবিরোধী যুদ্ধের নামে আফগানিসত্মানে হামলা শুরম্ন করে যুক্তরাষ্ট্র ও তার মিত্র পশ্চিমা দেশগুলো। কথিত সন্ত্রাসবিরোধী এ যুদ্ধ বিশ্বব্যাপী নানা সমালোচনার জন্ম দিলেও থোড়াই কেয়ার করেছে যুক্তরাষ্ট্র ও তার মিত্ররা। প্রথম দিকে সাফল্য আসলেও ন্যাটো বাহিনীর বিরম্নদ্ধে লড়াই অব্যাহত রাখে তালেবান যোদ্ধারা। বিশেষ করে গত কয়েক মাসে পার্বত্য এলাকা এবং দেশটির দ্বিতীয় বড় শহর কান্দাহারসহ কয়েকটি শহরে সশস্ত্র তালেবান যোদ্ধাদের হামলায় যৌথ বাহিনীর বহু সৈন্য হতাহত হয়। এমন পরিস্থিতিতে যুক্তরাষ্ট্র ও তার মিত্ররা যত তাড়াতাড়ি সম্ভব আফগানিসত্মানের নিরাপত্তা দেশটির নিজস্ব বাহিনীর হাতে ছেড়ে দিতে আগ্রহী। পরিস্থিতি যখন এমনই, তখন আফগানিসত্মানে বাংলাদেশী সৈন্য পাঠানো কতটা যৌক্তিক ও সময়োপযোগী হবে তা নিয়ে সংশয়ে রয়েছে সরকার। একদিকে রয়েছে মার্কিন সরকারের কূটনৈতিক চাপ, অন্যদিকে তালেবানদের হুমকি। এর পাশাপাশি অভ্যনত্মরীণ জনমতের বিষয়টি মাথায় রেখে আফগানিসত্মান ইসু্যতে অনেকটা কৌশলী অবস্থান সরকারের। এ মুহূর্তে আফগানিসত্মানে সৈন্য পাঠানোর মতো স্পর্শকাতর বিষয়ে সিদ্ধানত্ম নিলে সরকারের জনপ্রিয়তার ওপর বিরূপ প্রভাবের আশঙ্কা রয়েছে। আর এ সুযোগটি কাজে লাগাতে পারে দেশের উগ্র ধমর্ীয় মৌলবাদী সংগঠনগুলো। ইসু্যটিকে কাজে লাগিয়ে শেষ পর্যনত্ম তারা সরকারবিরোধী আন্দোলনে নামার কৌশলও নিতে পারে। আফগানিসত্মানে সৈন্য পাঠানোর মতো গুরম্নত্বপূর্ণ সিদ্ধানত্ম নেয়ার আগে বিষয়গুলো নিয়ে গভীরভাবে চিনত্মাভাবনা করছে সরকার। এ ব্যাপারে মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারা জানান, যুক্তরাষ্ট্রের এ অনুরোধ বিষয়ে বাংলাদেশ খুব সতর্ক। সেখানে সৈন্য পাঠালে কি কি সমস্যা হতে পারে তা নিয়ে আমরা চিনত্মাভাবনা করছি। এর আগে ২০০৩ সালে ইরাকে ইঙ্গ-মার্কিন হামলার পর যুক্তরাষ্ট সৈন্য পাঠাতে বাংলাদেশ সরকারকে অনুরোধ জানিয়েছিল। ইরাক যুদ্ধে সৈন্য নেয়ার মিশনে তৎকালীন মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী কলিন পাওয়েল ঢাকা সফর করেছিলেন। তবে প্রথম দিকে রাজি থাকলেও দেশের বিরূপ জনমতের কথা চিনত্মা করে তৎকালীন চারদলীয় জোট সরকার ইরাকে সৈন্য পাঠানোর অবস্থান থেকে সরে আসতে বাধ্য হয়। একইভাবে ২০০৬ সালের মাঝামাঝিতে ইসরাইল ও লেবানিজ হিযবুলস্নাহ গেরিলাদের মধ্যে সংঘটিত যুদ্ধের সময়ও জনমতের কথা চিনত্মা করে শেষ পর্যনত্ম বাংলাদেশী সৈন্য পাঠানোর অবস্থান থেকে সরে আসে সরকার।
সূত্র জানায়, অত্যাধুনিক অস্ত্রশস্ত্রে সজ্জিত ন্যাটো বাহিনী গত প্রায় আট বছরে আফগানিসত্মানে তালেবানদের দমন করতে ব্যর্থ হয়েছে। এ অবস্থায় বাংলাদেশী সৈন্যদের নিশ্চিত বিপদের মুখে ঠেলে দেয়া কতটা যৌক্তিক হবে তা নিয়ে যথেষ্ট চিনত্মাভাবনার অবকাশ রয়েছে।
আফগানিসত্মানের পুনর্গঠনে বাংলাদেশের অংশগ্রহণ বিষয়ে যুক্তরাষ্ট্র জোর চেষ্টা করছে বলে জানিয়েছেন যুক্তরাষ্ট্র দূতাবাসের এক কর্মকর্তা। এ ব্যাপারে বৃহস্পতিবার বাংলাদেশে যুক্তরাষ্ট্র দূতাবাসের চার্জ দ্য এ্যাফেয়ার্স নিকোলাস ডিন জানান, বিশ্বশানত্মি ও স্থিতিশীলতার জন্য আফগানিসত্মানে বাংলাদেশের অংশগ্রহণের বিষয়টি নিয়ে আলোচনা জোরদার করেছে যুক্তরাষ্ট্র।
এর আগে গত সপ্তাহে যুক্তরাষ্ট্র যুদ্ধবিধ্বসত্ম আফগানিসত্মানে বহুজাতিক বাহিনীকে সহায়তার জন্য বাংলাদেশ থেকে সেনা সদস্য পাঠানোর আহ্বান জানায়। নিউইয়র্কে পররাষ্ট্রমন্ত্রী দীপু মনির সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের আফগানিসত্মান-পাকিসত্মান বিষয়ক বিশেষ প্রতিনিধি রিচার্ড হলব্রম্নকের বৈঠকে যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষ থেকে এ আহ্বান জানানো হয়। এ সময় হলব্রম্নক বলেন, আফগানিসত্মানের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার জন্য বাংলাদেশের মতো বন্ধুপ্রতিম রাষ্ট্রের সহযোগিতা প্রয়োজন। জবাবে বাংলাদেশের পৰ থেকে তাৎৰণিকভাবে কোন সিদ্ধানত্ম জানানো না হলেও পররাষ্ট্রমন্ত্রী ডা. দীপু মনি বিষয়টি সরকার সক্রিয়ভাবে বিবেচনা করবে বলে আশ্বাস দেন।
তবে এর একদিন পরই আফগানিসত্মানে বাংলাদেশী সৈন্য পাঠানোর ব্যাপারে হুঁশিয়ার করে দেয় তালেবানরা। ওয়েবসাইটে প্রচারিত বার্তায় বলা হয়, আফগানিসত্মানে মাত্র কয়েক শ' সেনা পাঠিয়ে আফগান জনগণ ও ইসলামের বিরম্নদ্ধে তার দেশের মানুষকে জড়িত না করার মতো যথেষ্ট ইসলামী জ্ঞান ও রাজনৈতিক প্রজ্ঞা বাংলাদেশের নেতার রয়েছে বলে আমরা বিশ্বাস করি। বাংলাদেশের নেতৃত্ব এমন একটি ঐতিহাসিক ভুল সিদ্ধানত্ম নেবে না এবং বাংলাদেশের ধর্মপ্রাণ মুসলমানরাও একটি প্রতিবেশী ইসলামী রাষ্ট্রের বিরম্নদ্ধে যুদ্ধে তার দেশের মানুষকে জড়িত না করার মতো যথেষ্ট ইসলামী জ্ঞান ও রাজনৈতিক প্রজ্ঞা বাংলাদেশের নেতার রয়েছে বলে আমরা বিশ্বাস করি। বর্তমানে আফগানিসত্মানে ১ লাখ ৫০ হাজার বিদেশী সেনা মোতায়েন রয়েছে। সশস্ত্র তালেবান বাহিনীর সঙ্গে গত নয় বছরেরও বেশি সময় তাদের যুদ্ধ চলছে। ২০০১ সালের ১১ সেপ্টেম্বর নিউইয়র্কে ওয়ার্ল্ড ট্রেড সেন্টারে আল কায়েদার সন্ত্রাসী হামলায় পর সন্ত্রাসবিরোধী যুদ্ধের নামে আফগানিসত্মানে সামরিক অভিযান শুরম্ন করে মার্কিন নেতৃত্বাধীন যৌথ বাহিনী। ২০১১ সালের জুলাই মাসে আফগানিসত্মান থেকে সৈন্য প্রত্যাহার শুরম্নর পরিকল্পনা করছে যুক্তরাষ্ট্র। তবে তার আগে আফগানদের নিজস্ব নিরাপত্তা বাহিনীকে দেশটির নিরাপত্তার দায়িত্ব নেয়ার মতো সৰম করে তুলতে চায় যুক্তরাষ্ট্র। সেই পরিকল্পনার অংশ হিসেবে আফগান নিরাপত্তা বাহিনীর সদস্যদের প্রশিৰণে বাংলাদেশী সেনাদের সহায়তা চায় যুক্তরাষ্ট্র।

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।


