ওর নাম ছিলো আন্দ্্রে, আন্দ্্রে (পারিবারিক নামটা মনে নেই)। লম্বা ট্যাং ট্যাঙে ঢ্যাঙা ধরণের একটা পোলিশ ছেলে। ভালো করে পরিচিতি বেড়েছিলো 'বিশ্বযুবদিবসে'-র সময়টাতে। আমার ভলান্টিয়ার হিসেবে কাজ করার কথা থাকলেও পরে আর করা হয়নি। কিন্ত আন্দ্্রে করেছিলো।
গলায় লাল রঙের অ্যাক্রিডিটেশন কার্ড ঝুলিয়ে আন্দ্্রে ঘুরে বেরায় কোলন-বনের বিভিন্ন জায়গায়। নিজেকে খুব ভাগ্যবান মনে করে বিলেফিলডের পিলগ্রিম সম্মেলনে পোপের আশেপাশে থাকার অনুমতি পাওয়াতে। তাঁর অ্যাক্রিডিটেশন কার্ডটাতে বিচরণ ক্ষেত্রের পরিধি উল্লেখ করা আছে, সেটা খুব আগ্রহ নিয়ে আমাকে দেখায় সে। আমি দেখি, খুশী হই, উদ্্বেলিত হই আন্দ্্রের আনন্দ দেখে।
নিজেকে সে মেসন বলে দাবী করতো, খুব বড় আর নামী একজন পাদ্্রী হবে, এই স্বপ্ন দেখতো। একদিন আমি আর ফুলি বেগম কোথায়ও যাচ্ছি। সেখানে আন্দ্্রের সাথে দেখা। এগিয়ে এসে হাত বাড়ালো, কথা বল্লো, পরিচিত হলো ফুলির সাথে। আমাকে ফুলির কথা জিজ্ঞেস করতে মেয়ে বন্ধু বলায় খুশী হলো মনে হলো। আমাকে একফাঁকে বল্লো "তোমাদের বিয়ে হলে আমাকে ডেকো। আমি তোমাদের বিয়ে পরিচালনা করবো"। আমি তাঁর কথায় দাঁত কেলিয়ে হাসি।
অনেকের মাঝেই বিশিষ্ট কিছু গুন থাকে। আন্দ্্রের মাঝেও ছিলো। সবার সাথেই হতো কিনা কে জানে, তবে ও আমাকে দেখলেই শুরু করতো তাঁর মেসনহুডের আলাপ। কখনো বিয়ে করতে পারবে না, মদ খেতে পারবে না, এটা-সেটা নানান খুঁটি নাটি নিয়ে কথা বলতো। আমার একটা সময় পর্যন্ত ভালো লাগলেও পরে ঘ্যানঘ্যান টাইপের হয়ে যাওয়ায় কাজ আছে বলে কেটে পড়তাম প্রায়শঃই।
এমনই একদিন তাঁর সাথে আমার দেখা। লম্বা আলখাল্লা পরিহিত মাথায় টুপি। আমি দেখে ভাবলাম, হইছে এবার বুঝি পুরা পাদ্্রীর দীক্ষা দিয়ে ছাড়বে আমাকে। লম্বা এক সালাম দিলো আমাকে দেখেই। এসে আমাকে একটা কার্ড ধরিয়ে দিয়ে বল্লো, "আমাদের ধর্ম হলো সেরা ধর্ম, এটা রাখো। আমাদের সংগঠনের ইন্টারনেটের ঠিকানা আছে, তুমি চাইলে দেখতে পারো"। ততদিনে আমি আন্দ্্রেকে পারলে এড়িয়ে চলি।
কার্ডের ওপর আরবী ক্যালিগ্রাফির আদলে লেখা। ওর এরকম ব্যবহারে কেমন যেনো ধাক্কা খেলাম। বিরক্ত লাগছিলো, ও ধর্মান্তরিত হয়ে ইসলামকে গ্রহন করেছে। আমার হয়তো খুশী হবার কথা, অ্যাপ্রেশিয়েট করার কথা। কিন্ত পারিনি, খুব বিরক্তি তাঁর ওপর। মেন হচ্ছিলো কষে একটা চড় মারি ব্যাটাকে!
কাল আবার দেখা হলো তাঁর সাথে। আসলে প্রায়ই দেখা হয়, কিন্ত কথা আর বলা হয় না তেমন করে। আমি এড়িয়ে চলে আসি। আমাকে দেখে কিছুদিন ধরেই "হরে কৃষণা" বলে হুংকায় দেয়। কাল নিজের ক্ষোভ লুকিয়ে খুব ভদ্্রোচিত ভাবে জিজ্ঞেস করলাম,
"কিছু মনে না করলে তোমাকে খুব ব্যক্তিগত একটা প্রশ্ন জিজ্ঞেস করি"।
- (একটু থমকে গিয়ে) হঁ্যা করো...
"তুমি কি আবার ধর্মান্তরিত হয়েছো?...
- এটা খুবই ব্যক্তিগত!
"সে জন্যই এতো ঘটা করে অনুমতি নিলাম।
- (একটু থেমে থেকে) হঁ্যা, আমি নতুন ধর্ম নিয়েছি...।
ধন্যবাদ দিলাম তাকে কথোপকথন টুকুর জন্য। আন্দ্্রে হরে কৃষণা করলেও আমার কিছু এসে যায় না, কিংবা সারাদিন চার্চ কিম্বা মসজিদে বসে জিকির করলেও আমার কিছু হওয়ার কথা না। কিন্ত আন্দ্্রের চলন-বলন কেমন জানি বিরক্তিকর ঠেকে আমার কাছে।
ও যেদিন আমার হাতে কার্ডটা ধরিয়ে দিয়ে বলেছিলো, আমার নাম ইউসূফ। আমি এখন মুসলিম- সেদিনই আমার চরম বিরক্তি লেগেছিলো তাঁর ওপর। দেখা হলেই লম্বা সালাম দিয়ে নানান বিশেষনে আল্লাহ কে বিশেষায়িত করতো, আমার মেজাজ চড়ে যেতো। প্রথম দিনেই কীকরে যেন বুঝে গিয়েছিলাম সে আবার ধর্মান্তরিত হবে!!
সর্বশেষ এডিট : ৩১ শে ডিসেম্বর, ১৯৬৯ সন্ধ্যা ৭:০০

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।


