
ঘরোয়া ক্রিকেটে মাত্র ৬০০ টাকা ম্যাচ ফি পায় বাংলাদেশের মেয়েরা !! আশা করি সেটা এখন থেকে ‘পেতো’ হবে ‘পায়’ নয়।
১৯৯৭ সালে কুয়ালামপুরে যখন বাংলাদেশ দল কেনিয়ার সাথে খেলছিল তখন আমি প্রাইমারীতে পড়ি। থাকতাম মফস্বলে। আমাদের বাসার পাশে এনজিও ‘আশা অফিস’ ছিল। সময়টা দুপুর পেরিয়ে মাত্র বিকেলের শুরু, আম্মু আমাকে কি একটা কাজে যেন অফিসে পাঠাল (কোন একটা কাগজ দিতে, কিসের কাগজ মনে নেই)। দেখলাম অফিসের একজন হান্নান আঙ্কেল দরোজায় দাঁড়িয়ে এক হাতে পানির জগ, আরেক হাতে দাঁতন দিয়ে দাঁত মাজছেন আর তার ফাঁকে সমানে দোয়া দুরুদ পড়ছেন। ভেতরে জোরে রেডিও বাজছে। আঙ্কেল এভাবে দোয়া পড়ছেন কেন আমি একটু অবাক হলাম। ভেতরে গিয়ে সবার কথায় একটু বুঝতে পারলাম বাংলাদেশের কোন একটা খেলায় জয়ের জন্য সবাই দোয়া করছে। আমি কাগজটা ভেতরে দিয়ে দ্রুত বাসায় চলে এলাম। এসে আম্মুকে বললাম, ‘আম্মু বাংলাদশের কোন একটা খেলায় জয়ের জন্য সবাই খুব দোয়া দুরুদ পড়ছেন দেখে এলাম’। আম্মুর চোখে কৌতূহল এবং খুশীর ঝিলিক দেখেছিলাম, কিন্তু কি উত্তর দিয়েছিলেন তা মনে নেই। সন্ধ্যার সময় আমাদের বাসার বারান্দায় দাঁড়িয়ে আমি ভাবছিলাম, আঙ্কেল যে দোয়া করছিলেন খেলার তার কি হল কে জানে। আমি এই ভেবে আরও অবাক হয়েছিলাম যে, হান্নান আঙ্কেলও খেলা পছন্দ করেন এবং সেটা নিয়ে উৎফুল্ল হন! কারণ তিনি ছিলেন অফিসের মধ্যে তুলনামূলক বয়োজ্যেষ্ঠ এবং কিছুটা গম্ভীর। আমার ওই বয়সের ধারণায়- খেলাধুলা পছন্দ করে কম বয়সীরা এবং চঞ্চল প্রকৃতির মানুষেরা। ভুল যেমন তখন ভেঙ্গেছে; আজ এত বছর পর দ্বিতীয় দফায় ভুল ভাঙ্গল বাংলাদেশের নারীদের এশিয়া কাপ জয়ের পর আমার নিজের ব্যাঙ্গের মত কয়েকবার লাফানোর কারণে। আমি ভাবতেই পারিনি এতটা খুশী, এতটা আনন্দিত হব যে অজান্তেই এভাবে কয়েকবার লাফাবো। তারপরেও আরও বেশি উৎফুল্লতা দেখানো থেকে নিজেকে নিয়ন্ত্রণ করতে আমাকে বেগ পেতে হয়েছে। ভেতর থেকে ভীষণ জোরে কি যেন বেরিয়ে আসতে চাইছিল।
ইন্ডিয়ার ব্যাটিং এর তখন পাঁচ কি ছয় ওভার গিয়েছে আমি খেলা দেখতে বসেছি। জানতাম না যে খেলা চলছে, টিভির রিমোট ঘোরাতেই চোখে পড়ে আর বাংলাদেশ জার্সি দেখে থেমে যাই। দেখলাম মহিলা এশিয়া কাপ ফাইনাল। এর একটু আগেই কোন চ্যানেলে যেন খেলার খবরে বাংলাদেশের সামনে ইতিহাস জয়ের হাতছানি এমন সংবাদ দেখেছিলাম। এবার বুঝলাম এই খেলার কথাই বলা হয়েছে।প্রতিপক্ষ ছয়বারের চ্যাম্পিয়ন মাইটি ভারত। এত অল্পতেই এতগুলো উইকেট পড়ে যেতে দেখে খুব উদ্দীপনা নিয়েই দেখতে লাগলাম। সাধারণত যা হয় মেয়েদের খেলায়, চারপাশের গ্যালারীতে খুব বেশি দর্শক এমন নেই এবং অনেক বেশি হইচইও নেই। একপাশেই দর্শকরা জড়ো হয়ে বসেছেন এবং উৎসাহ দিয়ে যাচ্ছেন। আমি আম্মুকে বললাম, আচ্ছা আম্মু ছেলেদের ক্রিকেট খেলা দেখলে যতটা ভালো লাগে; মেয়েদের ক্রিকেট খেলা, ফুটবল খেলা দেখলে চোখে ততটা আরাম লাগেনা কেন ? মেয়েদের টেনিস আর ব্যাডমিন্টন দেখতে ভাল্লাগে। আম্মু কোন উত্তর দিলো না। ভাবছি আমি নিজে ব্যাডমিন্টন খেলতে খুব পছন্দ করি বলেই কি-না কে জানে। কিছুক্ষণ পরে বুঝলাম, আসলে মেয়েদের ক্রিকেট আমি খুব কম দেখেছি, এত কম দেখেছি যে যার কারণে অনভ্যস্ত চোখে খেলার বদলে তাদের শারীরিক গঠনের দিকেই চোখ চলে যায় এবং অবচেতনেই অ-আরামদায়ক অনুভূতি হয়। হারমানপ্রীত ভারতের ক্যাপ্টেন জানতাম না, দেখছি মেয়েটা বেশ ভালো খেলেছে এবং দেখতেও সুশ্রী। ভালো লাগছে ওর ব্যাটিং দেখতে।


বাংলাদেশের ক্যাপ্টেন সালমা-কে দেখে কেমন যেন একটু বয়স বেশি বা বুড়ি হয়ে গেছে এমন লাগছে। জুলিয়ান গোস্বামী-কে দেখে বললাম, ‘আম্মু ছেলেরাও তো অরে দেইখা ভয় পাইবো’। খুব দ্রুত উইকেট পড়ছে আর বাংলাদেশ দল আনন্দে লাফিয়ে উঠছে। আমারও খুব আনন্দ হতে লাগলো এবং এরপর খেলায় মজে গেলাম। মনে মনে বাংলাদেশ দলের ফিল্ডিং এর খুব প্রশংসা করছি, সাথে সালমার ক্যাপ্টেন্সি বুদ্ধিমত্তারও। এবার হঠাতই ভাবলাম, ধুর মেয়েদের মত হওয়া লাগবে এমন কোন কথাই নাই, সব ফালতু। ওরা যে নিজের আনন্দে মনের মত খেলতে পারছে, নিজের সবচেয়ে ভালো লাগার কাজ করতে পারছে, আনন্দের কাজ করতে পারছে এটাই সবচেয়ে বড় পাওয়া। এটাই জীবন। আর কিছুর পরোয়া না করলেও চলবে, ওদের জীবন থেমে থাকবে না। ছেলেদের ক্রিকেট খেলায় উইকেট পড়লে সাথে সাথে তুমুল ড্রামের সাউন্ড তথা আনন্দ বাজনা বাজে, চিয়ার গার্লসরা নাচে, কমেন্ট্রি বক্সে শোরগোল ওঠে। বাংলাদেশের খেলা হলে তো বাসার আশেপাশেই লোকজন চেঁচিয়ে ওঠে। এখানে এসব কিছু নেই। কমেন্ট্রি বক্সে যদিও একটু উত্তেজিত গলা শোনা যায়, গ্যালারির স্বল্প দর্শকরা হইচই করে ওঠে, বাকি আর কিছু নেই। আমাদের বাসায় একেবারে ক্রিকেট জ্বরে আক্রান্ত আমার ছোট বোন, এমনকি তারও কোন মাথাব্যাথা নেই, ঘুমুচ্ছে। আমি একাই দেখছি আর মায়ের সাথে বকবক করে যাচ্ছি। আমাকে দেখার সুযোগ দিয়ে মা-ও তাঁর নির্ধারিত সিরিয়াল দেখা বন্ধ রেখেছেন। বাংলেদেশের সাপোর্টারদের মধ্যে কিছু দাড়িওয়ালা, টুপি-পাঞ্জাবী পরা হুজুরও দেখলাম, যারা খুব আনন্দ করছেন এবং বাংলাদেশের পতাকাও ওড়াচ্ছেন। আমার ভালো লাগলো এই কারণে যে ওরা বাংলাদেশের মেয়েদের খেলাকে সমর্থন দিচ্ছেন। আবছা একটা প্রশ্নও মনে জাগল যে, ওদের কারো আমাদের মেয়েদের খেলার পোশাক নিয়ে আপত্তি নেই কেন। সৌদি আরবের মেয়েদের অস্বস্তিকর খেলার পোশাক চকিতে চোখে ভেসে উঠেছিল। যাইহোক, বাংলাদেশ দলের ব্যাটিং শুরু হবার পর আমি আরেকদফা খেলায় মনোযোগ থেকে কিছুটা বিচ্যুত হয়ে গিয়েছিলাম। কারণটা হল অপেনার আয়েশা-কে দেখে। সে চোখে বেশ মোটা করে কাজল দিয়ে খেলতে নেমেছে। আকর্ষণীয় লাগছে। তাঁর শারীরিক গঠনও আকর্ষণীয়। আমার কেন জানি মনে হল সে বেশি ভালো খেলবে না, তাঁর খেলা থেকে মনোযোগ বেশি চলে গেছে মেয়েলীপনার দিকে। হয়তো প্রেম-ভালবাসায় আটকে গেছে, অনেক সময় এখন সেখানেই দেয় ( নিজের হাবিজাবি ভাবনা নিজেরই ফালতু লাগে মাঝে মাঝে, দাঁত কেলিয়ে নির্লজ্জের মত হাসি)। কিন্তু একটু পরেই ভুল ভাঙ্গল আয়েশার খেলার ম্যাচুরিটি দেখে। যথেষ্ট শারীরিক সামর্থ্য এবং মানসিক ধীরস্থিরতার পরিচয় দিয়ে খেলেছে সে।

এদিকে বরং ইন্ডিয়ার শিখা পান্ডের ইনজুরিটা নিয়ে আমার সন্দেহ জেগেছে এটা আদৌ তেমন ইনজুরি কিনা। তাকে বাংলাদেশি ব্যাটসম্যানরা পেটাচ্ছিল, তাই মনে হয়েছে সে আর পিটুনি খেতে না চেয়ে ভেগে গেছে ( আমার ভুল হলে ক্ষমা চেয়ে নিচ্ছি)। খেলা শেষ হওয়ার একটু আগে থেকে আম্মু আমাকে গোসলের জন্য তাড়া দিচ্ছিল; শপিং এ যেতে হবে, আমি নানারকম কথা বলে সময় নিচ্ছিলাম, ‘আম্মু আর দশ মিনিট মাত্র, আমি দরকার হলে এই বাথরুমে যাব; ওই বাথরুমে যাব না’। দুই বল বাকি থাকতে একটা উইকেট পড়ে গেলে আম্মুর দিকে তাকিয়ে ঠাণ্ডাভাবে বললাম,’আর মাত্র দুই বল বাকি’। আমার ভেতরের চরম উত্তেজনার সাথে উইকেট পড়ে গিয়ে আমাকে ভীষণভাবে স্তব্ধ করে দিয়েছে। ২০১২ ছেলেদের এশিয়া কাপ ফাইনালের স্মৃতি চোখে ভেসে উঠেছে। সাথে সাথে মনকে প্রবোধ দিয়েছি, নাহ; মেয়েরা পারবে, তারা ছেলেদের মত অত নার্ভাস নয়। ভাবতে ভাবতে রুমানার উইকেটও পড়লো। সালমা নামলো আর আমি বললাম, এখন সমস্ত কিছু তোমার হাতে সালমা, উইকেট নেয়ার যে আনন্দ তুমি করেছিলে এখনও যেন সেই মানসিক শক্তি এবং দৃঢ়তার পরিচয় থাকে। ক্রিজ ছেড়ে যাওয়ার সময় রুমানাও বোধহয় এমন কিছুই সালমার কাঁধে হাত রেখে বলেছিল।চশমাপরা রুমানাকে আমার বেশ ভালো লেগেছে।

হ্যাঁ, সালমারা পেরেছে (শেষ বলে ব্যাট করেছে জাহানার)। তুমুল আনন্দে আমি কয়েকবার, কয়েকবার লাফিয়ে উঠলাম। আমার চোখে পানি চলে এসেছিল। আমাদের ফেসবুক ছেলেদের ক্রিকেট খেলা চলার সময় ক্রিকেটীয় স্ট্যাটাসে সয়লাব হয়ে যায়। তাই তখন আমি আনন্দিত হলেও এই সংক্রান্ত স্ট্যাটাস দেই না। কিন্তু এবার এত দারুণ এবং ঐতিহাসিক এক বিজয় প্রায় নিষ্প্রাণই হয়ে রইল ফেসবুকে। থাকুক, তাতে সত্য মুছে যাবে না এবং অর্জন এতটুকু ম্লান হবে না।
বাংলাদেশের ছেলেরা এর আগে একবারই মাত্র কোন আন্তর্জাতিক টুর্নামেন্ট জিতেছে। ১৯৯৭, আইসিসি ট্রফি। কিন্তু সেই খেলায় অনেক ভিনদেশিরা বিশেষ করে ভারতীয়রা বলে, ডার্ক-লুইস পদ্ধতিতে রান কমানো হয়েছিলো যা জেতারা পক্ষে খুব সহায়ক হয় এবং কেনিয়া মোটেই খুব শক্তিশালী দেশ ছিল না। কিন্তু এবার কিছু বলার কোন সুযোগই তাদের নেই, কারোরই নেই। পরিপূর্ণ যোগ্যতা বলে এবং শক্তির পরিচয় দিয়েই আমাদের মেয়েরা আমাদের জন্য এই অসাধারণ সম্মান নিয়ে এসেছে। ছয়শ টাকা ম্যাচ ফির মত এতটা অবহেলিত থেকেও ওরা শিখরে উঠেছে। তাই এখন সময় ওদের প্রাপ্য সবকিছু ওদের বুঝে নেয়ার, দেশের মানুষের নিখাদ ভালোবাসা এবং সম্মান পাওয়ার।অনেক অনেক অভিনন্দন বাঘিনীরা।
সর্বশেষ এডিট : ১১ ই জুন, ২০১৮ বিকাল ৪:২৭

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।




