
(সাত)
রফিক সাহেবের একটু খারাপ লাগছে নিবিড়ের জন্য। আজকে ওর অর্ধবেলা ছুটির কথা তিনি ভোলেননি। তবে জুলহাসের এমন ইমারজেন্সি হবে কে জানতো। বৎসরের ক্লোজিং টাইমে চাইলেই কাজ বন্ধ রাখা যায় না। তিনি উঠে দাঁড়ালেন। সাধারণত ডেস্কে কল করে তিনি কাউকে ডেকে পাঠান। এখন নিজেই হেঁটে এসে নিবিড়ের ডেস্কের সামনে দাঁড়ালেন। স্যারকে দেখে নিবিড় একটু ভ্যাবাচ্যাক খেয়ে দাঁড়িয়ে গেলো। রফিক সাহেব হাতের ইশারায় বসতে বললেন। নিবিড় বসে পড়লো। ‘আমি আপনাকে গতকাল বলেছিলাম আজকে দুটোয় ছুটি দেবো, কিন্তু মানুষের হাতে তো সবকিছু থাকে না। আপনি আর দুঘণ্টা কাজ করে চারটার দিকে চলে যাবেন নিবিড় সাহেব, আমাকে বলারও দরকার নেই’। এই বলে রফিক সাহেব সূক্ষ্ম একটা হাসি দিয়ে চলে গেলেন। নিবিড় ভালো করেই জানে, জুলহাস ভাইয়ের কাজটা ধরলে সে কোনমতেই চারটার মধ্যে শেষ করতে পারবে না। ওর ফোনটা বেজে উঠলো। ‘হ্যালো, আমি আসছি সোনা। আর একটু অপেক্ষা করো, একটু পরেই চলে আসব’। এসব বলে ওপাশ থেকে কোন কথা না শুনেই নিবিড় ফোন কেটে দেয়। আসলে স্নেহার কথা শোনার সাহস এখন ওর নেই। তাছাড়া কাজগুলো ঝড়ের গতিতে শেষ করতে হবে।
(আট)
পলাশ আর সোহেল লেকের পাড়ের নরম মাটি দিয়ে গতকাল যে বেদিটা বানিয়েছিল সেটা আজ শুকিয়েছে। ওরা লাভ আকৃতির বেদি বানিয়েছে। লেকের পাশেই ‘পানসি’ রেস্তোরায় ওরা অনেকবার গায়ে হলুদ, বিয়ে ও জন্মদিনের অনুষ্ঠান দেখেছে। সেসব অনুষ্ঠানে দেখেছে এরকম আকৃতির ডালার মধ্যে কত কিছু সাজানো থাকে। সোহেল আর পলাশও তাই এটিকে সাজানোর বুদ্ধি করেছে। লাভ বেদির মধ্যে বেশ কিছু ছোট গোল গর্ত করে রেখেছিল ওরা গতকাল। মাঝখানটা নিরেট রেখে। কুড়িয়ে পাওয়া সোনালী এবং লাল রং এর ঝকমকে কাগজ দিয়ে বেদিটা সাজানোর চেষ্টা করছে দুজন মিলে। বিয়ের মৌসুম বলে এখন প্রায়দিনই রেস্তোরার পাশে এমন কাগজ পাওয়া যায়। পলাশ উঠে গিয়ে কিছু ঘাসফুল নিয়ে এলো। গোলাপি এবং নীল রঙের ঘাসফুল। বেদির মধ্যে আলাদা আলাদা গর্তে এগুলো রাখল। এবার সোহেল উঠে গিয়ে ঝোপ থেকে হলুদ রঙের কিছু ফুল, কয়েকটা রঙ্গনের থোক এবং রঙ্গিন কিছু পাথর কুড়িয়ে নিয়ে এলো। এই সবকিছু দিয়ে ওরা বেদির চারপাশের গর্তগুলো সুন্দর করে সাজালো। বেদিটার মাঝখানটায় লাল সিল্কি কাগজ এবং চারপাশের গর্তগুলো সোনালী কাগজ দিয়ে মোড়ানো। আর কিছুক্ষণ পরেই জুঁই চলে আসবে, কেক তাড়াতাড়ি কিনতে হবে। পলাশের কাছ থেকে ওর জমানো টাকা নিয়ে পলাশকে বেদির কাছে বসিয়ে রেখে সোহেল গেলো কেক কিনতে। দুজনের মিলিয়ে ষাট টাকা হয়েছে। চল্লিশ টাকা দিয়ে কেক কিনবে আর বিশ টাকা দিয়ে জুঁইকে চটপটি খাওয়াবে। আর কিছু টাকা থাকলে জুঁইকে চুলের ব্যান্ড কিনে দিত।
(নয়)
শীতকালের দুপুরটা খুব দ্রুত শেষ হয়ে যায়। নিবিড়ের কথা ভাবতে ভাবতে হঠাৎই যেন বিকেল নেমে গেলো। পার্কে লোকজনের ভিড় বাড়তে শুরু করেছে। স্নেহার আশেপাশেও ক্রমাগত মানুষজন আসা যাওয়া করছে। বিরক্তি কমাতে স্নেহা বাদামওয়ালাকে ডাক দিল। বাদামওয়ালাটা ছোকরা বয়সী। কোঁকরা চুল, দেখতে বেশ মায়াকাড়া। স্নেহা দশ টাকার বাদাম দিতে বলে জিজ্ঞেস করলো, ‘তোমার নাম কি’? ছেলেটি বাদাম পরিমাপ করতে করতে জবাব দিল, ‘রুপাই’। স্নেহার সাথে সাথে জসিমুদ্দীনের রুপাই এর কথা মনে পড়ে গেলো। জিজ্ঞেস করলো, ‘তোমার এই নাম কে রেখেছে ? নামটা ভারী সুন্দর’। রুপাই এবার চোখ তুলে স্নেহার দিকে তাকাল; মুচকি হেসে বলল, ‘হামার বড় দাদা, হামাকের বাড়ি পাবনা’। স্নেহা একটু হাসল; আর কিছু বললো না। ধীরে ধীরে ওর বিরক্তিটা রাগে পরিণত হচ্ছে। বাদাম খেয়ে খেয়ে আরও আধা ঘণ্টা কেটে গেলো। স্নেহা মোবাইলটা নিয়ে নিবিড়কে আবার ফোন দিল। ওপাশ থেকে কেউ রিসিভ করলো না। দাঁতে দাঁত চেপে পাঁচ মিনিট অপেক্ষা করলো সে কল ব্যাক পাবার। শেষবারের মত আরেকবার ফোন দিল স্নেহা। ওপাশে একটা একটা রিং বাজার শব্দ হচ্ছে আর স্নেহার রাগ দ্বিগুণ থেকে দ্বিগুণ হচ্ছে। বাম হাতের মুঠি শক্ত করে ডান হাতে ধরা ফোনটা নামিয়ে ব্যাগে রাখলো স্নেহা। তারপর উঠে দাঁড়িয়ে সবগুলো গোলাপ যা সাজিয়ে রেখেছিল বেঞ্চে সেগুলো তুলে নিলো হাতে। অসাবধানতায় হাতে কাঁটা বিধল। কিন্তু রাগে-কষ্টে এদিকে ধ্যান নেই ওর।
(দশ)
ফুলগুলো নিয়ে স্নেহা খুব দ্রুত গটগট করে হেঁটে ব্রিজ পার হল। ব্রিজের মধ্যে কিছু ছেলে দাঁড়িয়ে ছিল বলে ওদের সামনে ফুলগুলো ফেলেনি। এপারে এসে ফুলগুলো পানিতে ফেলে দিতে উদ্যত হতেই হঠাৎ পেছনে শুনতে পেলো, ‘হ্যাপি বাড্ডে টু উ’ এবং শিশুদের হাসির কলকলানি শব্দ। পেছন ফিরে ঘুরে তাকিয়ে স্নেহা দেখতে পেলো, দুটি ছোট ছেলে তাদের মাঝখানে আরও ছোট একটি মেয়েকে বসিয়ে হাসছে আর হাততালি দিচ্ছে। তাদের সামনে কি একটা উঁচু মত জিনিসের উপর একটা কেক রাখা। স্নেহা কৌতূহলী হয়ে এগিয়ে গেলো। গিয়ে প্রথমেই সাজানো বেদিটা দেখে স্নেহার চোখ বিস্ময়ে বড় বড় হয়ে গেলো। সে জিজ্ঞেস করলো তোমরা কি করো ? হাসি থামিয়ে ওরা স্নেহার দিকে তাকালো, কিন্তু কিছু বললো না। স্নেহা আবার একটু নরম সুরে জিজ্ঞেস করলো ‘তোমরা কি করো বাবুরা’? এবার জুঁইকে দেখিয়ে পলাশ বলল, ‘আইজকা ওর জর্মদিন। ও আমাগো বান্ধবী। আমরা জর্মদিন পালন করি’। স্নেহা জুঁইয়ের দিকে তাকিয়ে মিষ্টি করে হেসে বলল, ‘ওমা তাই! হ্যাপি বার্থডে জুঁই, তুমি খুব ভাগ্যবতী ওদের মত দুজন বন্ধু পেয়েছ’। স্নেহার মন ভালো হতে শুরু করেছে। জুঁই ভাগ্যবতী শব্দের মানে কি জানে না, সে শুধু হাসল। স্নেহা বেদিটা দেখিয়ে আরও জিজ্ঞেস করলো, ‘এটা কে বানিয়েছে, কে সাজিয়েছে?’ এবার সোহেল উত্তর দিলো, ‘আমরা দুইজন মিইলা বানাইছি, আমরাই সাজাইছি’। স্নেহা মুগ্ধ চোখে তাকিয়ে রইলো। পলাশ হঠাৎ বলে ফেললো, ‘জুঁইয়ের খুব পেস্টি কেক খাওয়ার ইচ্ছা, কিন্তু..’ বলেই সে চুপ হয়ে গেলো, বাকিটা বললে তো জুঁই বুঝে ফেলবে। স্নেহা কয়েক মুহূর্ত ভাবল; এরপর চট করে ওদের সাথে ঘাসের উপর বসে পড়লো। হাতের গোলাপগুলো সোহেলের হাতে দিয়ে বললো, ‘এই ফুলগুলো তোমরা দুজন মিলে লেকে বেড়াতে আসা মানুষজনের কাছে বিক্রি করো। তাহলে যে টাকা পাবে সেটা দিয়ে একটা পেস্ট্রি কেক কিনতে পারবে’। পলাশ আর সোহেল দুজনের চোখেই ঝিলিক খেলে গেলো। কিন্তু মনে একটু সংকোচও। পরস্পরের মুখ চাওয়াচাওয়ি করলো ওরা। স্নেহা বুঝতে পেরে বললো, ‘ কোন চিন্তা নাই, সত্যিই বলছি, আমারও একটা ভাগ্নি আছে ওর সমান, জুঁইয়ের জন্মদিনে আজকে আমি ওকে এটা গিফট দিলাম। আমার ভাগ্নিকে তোমাদের ছবি দেখালে ও খুব খুশী হবে ’। এবার লাফিয়ে উঠে দাঁড়ালো দুজন। ফুলগুলো ভাগাভাগি করে নিয়ে ওরা দৌড়ে দুজন দুইদিকে চলে গেলো। স্নেহা শব্দহীন হাসতে হাসতে এসব দেখল।
ওরা চলে গেলে জুঁইয়ের দিকে ভালো করে তাকাল স্নেহা। কি মিষ্টি নিষ্পাপ একখানা মুখ !অপরিচ্ছন্ন তবু মনে হচ্ছে ফুল ফুটে আছে। এরপর স্নেহা লক্ষ করলো জুঁই যেই জামাটি পড়ে আছে সেটার কোমরের দিকে অনেকখানি সেলাই খোলা এবং পিঠে বোতামের কাছে ছেঁড়া। জুঁইয়ের মাথার চুলও এলোমেলো হয়ে আছে। স্নেহা চিরুনি বের করার জন্য ব্যাগ খুললো। এমনিতে চিরুনির ব্যাপারে সে খুব সেন্সেটিভ; কিন্তু আজ ভাবলো এটা জুঁইকে দিয়েই দেবে। চিরুনি বের করতে গিয়ে কার্ডটায় চোখ পড়লো। এতক্ষণ এটার কথা ভুলে গিয়েছিল সে। নিবিড়ের জন্য জন্মদিনের একটা মিউজিক্যাল কার্ডও কিনেছিল সে। কার্ডটা এবার বের করে জুঁইয়ের হাতে দিলো। বললো, ‘নাও এটা তোমার আরেকটা গিফট’। জুঁই হাসিমুখে কার্ডটা নাড়াচাড়া করতে লাগলো। কার্ড খোলার সাথে সাথেই মিউজিক বেজে উঠলো আর জুঁইয়ের চোখ বড় বড় হয়ে গেলো! সে ভীষণ খুশী হয়েছে এমন কার্ড পেয়ে। চিরুনি দিয়ে খুব সুন্দর করে জুঁইয়ের মাথাটা আঁচরে বেণী করে দিলো স্নেহা। গাডার বেঁধে দিলো। গুনগুণ করে গানও গাইছে সে। একফাকে জুঁইয়ের কাছে সোহেল আর পলাশের নাম জেনে নিলো। বাদামওয়ালা রুপাই ঘুরতে ঘুরতে এদিকে এসে স্নেহাকে জুঁইয়ের পাশে বসে থাকতে দেখে দাঁড়িয়ে গেলো । স্নেহা তাকে দেখে একগাল হেসে ইশারায় ডাকল। কাছে আসতেই ব্যাগ থেকে টাকা বের করে দিয়ে বললো, ‘রুপাই একটু কষ্ট করে আমাকে একটা সুঁই সুতা এনে দাও না। একটু পরে তোমার দাওয়াত জুঁইয়ের জন্মদিনে’। রুপাই ওদের সবাইকেই চেনে। সে হাসিমুখে টাকা নিয়ে চলে গেলো।
(এগারো)
এদিকে সোহেল আর পলাশ ওদের সাধ্যমত চেষ্টা করছে ফুলগুলো দ্রুত বিক্রি করতে। ছাউনির নিচে বসে গীটার বাজানো একদল ছেলের দিকে এগিয়ে গেলো সোহেল। ‘ভাইয়া একটা ফুল নেন না’ বলে একজনের দিকে একটা গোলাপ বাড়িয়ে দিলো সে। গানের মাঝখানে এটা শুনে খুব বিরক্ত হল সে, ‘আমার সাথে কোন আপা আছে যারে ফুল দিমু, যা এখান থেকে’। সোহেল চিন্তা না করেই বলে ফেলল, ‘ভাইয়া আমার বান্ধবীর আইজকা জন্মদিন, এই ফুলগুলা বিক্রি কইরা ওরে পেস্টি কেক খাওয়ামু’। ছেলেটি এই কথা শুনে এক মুহূর্ত সোহেলের দিকে তাকিয়ে থাকলো। তারপর হেসে পকেট থেকে দশ টাকা বের করে দিয়ে বললো, ‘ফুল লাগবো না যা, এমনি দিলাম’ । সোহেলও হাসতে হাসতে টাকাটা নিয়ে অন্যদিকে গেলো। এইভাবে জুঁইয়ের কথা বলে পাঁচ টাকা, দশ টাকা দিয়ে পলাশ ও সোহেলের সব ফুল বিক্রি হয়ে গেলো দুটি বাদে। দুজনেই দুটি করে ফুল রেখে দিয়েছে বান্ধবীকে দেবে বলে। এবার ব্রিজের কাছে দুজন একত্র হয়ে টাকাগুলো গুণতে শুরু করলো। মোট একশ পঁচাশি টাকা হয়েছে। দুজনের খুশী আর ধরে না। এক পাউন্ডের একটা পেস্ট্রি কেক আর মোমবাতি কিনে ওরা জুঁইয়ের কাছে ফিরে এলো।
(শেষ)
স্নেহা জুঁইয়ের জামাটা সেলাই করে দিয়ছে। ওর মুখ, হাতপা ধুয়ে দিয়ে ওকে একটু পরিচ্ছন্ন করেছে এবং একটু সাজিয়েছেও। পলাশ, সোহেল ফিরে এলে পরিপাটি জুঁইকে দেখে আরেকদফা ওদের চোখে আনন্দ খেলা করলো। স্নেহার মন এখন পুরোপুরি ভালো। রুপাইও বসে আছে তাদের সাথে। সবাই মিলে হাততালি দিয়ে, হ্যাপি বার্থডে বলে হট্টগোল করে জুঁইয়ের কেক কাটল। এমন অদ্ভুত ও অসম জন্মদিন পালন করতে দেখে লেকে বেড়াতে আসা অনেকেই কৌতূহল নিয়ে তাদেরকে দেখলো। ইতিমধ্যে সন্ধ্যা ছুঁই ছুঁই। কেক কেটে খাওয়ার পর সবাইকে নিয়ে নিজের মোবাইলে সেলফি তুললো স্নেহা। ওদের ওই অসাধারণ সাজানো বেদিটার ছবি তুললো আলাদা করে। স্নেহার মনের সব রাগ, কষ্ট চলে গিয়ে বরং অতিরিক্ত আনন্দ যোগ হয়েছে। একটা স্নিগ্ধ শান্তি শান্তিভাব মনে নিয়ে সে সবার কাছ থেকে বিদায় নিয়ে চলে এলো। প্রেমিকের জন্মদিন পালন করতে পারেনি, কিন্তু এক স্নেহবঞ্চিত শিশুকে তার জন্মদিনের ইচ্ছে পূরণে পেস্ট্রি কেক খাইয়ে যে আনন্দ আজ সে পেয়েছে তার কাছে সামান্য ব্যক্তিকষ্ট একেবারেই ম্লান হয়ে গেছে। নিবিড়ের সাথে দিনটা কাটালেও আনন্দ পেতো, কিন্তু এমন পরিতৃপ্তি বোধ বোধহয় হতো না। রাস্তায় উঠে বাস স্ট্যান্ডের দিকে যেতে যেতে স্নেহা ভাবতে থাকলো; জীবনে কতভাবেই না মানুষ আনন্দ পেতে পারে। আনন্দের বহু রূপ, রস, গন্ধ আছে।
কাহিনীসূত্রঃ- গল্পটির কনসেপ্ট আমার ছোট বোনের।
প্রথম পর্ব
সর্বশেষ এডিট : ০৮ ই জুলাই, ২০১৮ রাত ৯:০৯

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।




