
এক গ্রামে আব্বাস ও মনসুর নামে দুই জন গরুচোর ছিল। তাহারা ছিল অন্তরঙ্গ বন্ধু। গরু চুরি তাহাদের শুধু পেশাই ছিল না, নেশাও ছিল বটে।
তখন ছিল পৌষ মাস। শীত একেবারে জাঁকিয়া বসিয়াছে। সন্ধ্যা হইতেই কুয়াশা পড়িতে আরম্ভ করে। ভারি ভারি শীতবস্ত্র পরিধান করিলেও শীত কাটিতে চাহে না। একরাত্রে শীতবস্ত্র পরিধানপূর্বক গরু চুরি করিতে বাহির হইল আব্বাস ও মনসুর। আব্বাসের হস্তে ছোট্ট একখানি টর্চ আর মনসুরের হস্তে শক্ত একটি লাঠি। কিছুদূর আসিয়া মনসুর জানিতে চাহিলো, “আইজ কোন বাড়িত যামু আমরা?”
আব্বাস কিছুক্ষণ চিন্তা করিল, অতঃপর ধীরে ধীরে বলিল, “আইজ যামু আমজাদের বাড়ি। হের সুন্দর একটা ষাঁড় আছে।”
তখন মধ্যরাত্রি! কুয়াশায় ঢাকা ছিল চারিদিক। কুয়াশাগুলি তুষারের মতন ঝরিয়া পড়িতেছিল। মনসুর বলিল, “আমার খুব শীত লাগতাছে।” “গায়ে তো কাপড় আছে, তারপরও এত শীত তোর, চুরি করতে আইলি কেন?” রাগান্বিত হইয়া নিজের গায়ের চাদরখানি মনসুরকে দিয়া দিল আব্বাস।
সম্মুখেই আমজাদের বাড়ি। তিনি বেশ প্রতাপশালী লোক, তাহার প্রচুর জায়গা-জমি, টাকা-পয়সা আছে। ছেলেমেয়েরা শহরে থাকিয়া পড়ালেখা করে। অন্য কোনোদিন এই বাড়ির আশপাশে কোনো আগন্তুক আসিলে কয়েকটি কুকুর ঘেউ ঘেউ করিয়া ওঠে। কিন্তু আজ একটি কুকুরও দেখা যাইতেছে না কেন? কোথায় গেল সব কুকুরের পাল? একদিক দিয়া ভালোই হইল, নিশ্চিন্তে কার্যসম্পাদন করা যাইবে।
একটি কুকুর বারান্দায় পরম আরামে ঘুমাইতেছিল। তাহার সহিত তিন-চারিটি বাচ্চা। দুয়েকদিন হইয়াছে হয়তো বাচ্চা প্রসব করিয়াছে। বাচ্চাদিগকে লইয়াই মা কুকুর অতিব্যস্ত, কে আসিল, আর কে গেল- সেইদিকে তাহার ভ্রূক্ষেপ নাই।
গোহালঘরের দিকে অগ্রসর হইল আব্বাস ও মনসুর। দুই জনেই প্রচণ্ডভাবে বিস্মিত, তবে খুশিই হইল। গোহালঘরে কোনো তালা লাগানো ছিল না। গৃহকর্তা বোধহয় তালা লাগাইতে ভুলিয়া গিয়াছিলেন। ভালোই হইল, তালা ভাঙ্গার ঝামেলায় আর যাইতে হইল না।
প্রহরীর মতো লাঠি হস্তে বাহিরে দাঁড়াইয়া রহিল মনসুর। দুয়ার খুলিয়া ধীরে ধীরে গোহাল ঘরে প্রবেশ করিল আব্বাস। টর্চ মারিয়া মোটাসোটা সাদা ষাঁড়টিকে দেখিতে পাইল সে । খুঁটিতে বাঁধা ষাঁড়টি খড় চিবাইতেছিল। আব্বাস মনে মনে ভাবিল, “এইডা বেইচা ভালা দাম পাওয়া যাইব।” চুপি চুপি ষাঁড়টি লইয়া দরোজাটি চাপাইয়া পথে নামিয়া আসিল আব্বাস ও মনসুর।
প্রত্যূষ হইয়া আসিল। গৃহকর্তা গরু বাহির করিতে গেলেন। তিনি চমকিত হইয়া উঠিলেন, যখন দেখিলেন গোয়ালঘরের দুয়ার খোলা। তাহার মনে পড়িল, গত রাত্রিরে গোয়াল ঘরে তালা দেওয়া হয় নাই। হঠাৎ তাহার নজর পড়িল বাড়ির বারান্দায়, যেইখানে পোষ্য কুকুরটি সদ্য প্রসবিত বাচ্চাদিগকে লইয়া আরামে ঘুমাইয়া আছে। উদাস মনে তিনি গোহাল ঘরে ঢুকিলেন। ষাঁড়টি যেইখানে বাঁধা ছিল, সেইখানে ছিল না। তিনি নীরবে কিছুক্ষণ দাঁড়াইয়া থাকিলেন। খুব কান্না পাইল। কারণ, পালিত পশুর জন্য মানুষের খুব মায়া থাকে। পালিত পশু নিজ সন্তানসম।
গৃহকর্ত্রী দৌড়াইয়া বাইরে আসিলেন। তাহার সন্তানেরাও আসিল। মাতা যখন উচ্চস্বরে বিলাপ করিতেছিল, তাহারা সান্ত্বনা দিবে। গৃহকর্তা চুপচাপ বসিয়া শোক করিতেছেন। পাড়াপড়শিরাও আসিল সান্ত্বনা দেওয়ার জন্য। বড়ো পুত্রটি গরুর খোঁজ-খবর আনার জন্য চারিদিকে লোক পাঠাইল।
গ্রাম থেকে অনেক দূরের এক হাটে গরুটি বিক্রি করা হইল। হাটের লোকজনের সাথে আগে থেকেই জানাশোনা ছিল, এইখানে আগেও তাহারা চুরিকৃত গরু বিক্রি করিয়াছে। আশি হাজার টাকা পাওয়া গেল। ভাগাভাগি করিয়া যে যাহার বাড়ি চলিয়া গেল।
আব্বাস যখন তাহার বাড়িতে পৌঁছিল, তখন প্রায় সন্ধ্যা। তাহার স্ত্রী মরিয়ম রাত্রির খাবার রাঁধিতেছিলেন। আব্বাস ধপাস করিয়া বারান্দায় মাটিতে বসিয়া পড়িল। মরিয়ম নিকটে আসিয়া জিজ্ঞাসা করিলেন, “কী হইছে আপনের?” আব্বাস চুপচাপ বসিয়া রহিল। মরিয়ম পুনশ্চ জিজ্ঞাসা করিলেন, “ধরা-টরা খাইছেন নাকি?”
আব্বাস বিরক্ত হইয়া বলিল, “আরে ওইসব কিচ্ছু না!”
মরিয়ম জিজ্ঞাসা করিল, “সারা দিন কই আছিলেন?”
আব্বাস স্বাভাবিকভাবেই বলিল, “রাইতের মাল খালাস কইরা বেচতে গিয়াই দেরি অইল।
মরিয়ম জিজ্ঞাসা করিলেন, “কত বেচলাইন?
আব্বাস বলিল, “আশি হাজার। এই লও চল্লিশ হাজার টেহা, ঠিকমতন তুইল্যা রাইখ্য। দিনকাল ভালা না।” কোঁচ হইতে টাকার বান্ডিলটি খুলিয়া স্ত্রীর হস্তে তুলিয়া দিল আব্বাস।
রাত্রিরে খাওয়াদাওয়ার পর বিছানায় শুইয়া আরাম করিতেছিল আব্বাস। আজ আর বাহিরে যাইবে না সে। মনসুর আসিয়াছিল, তাহাকে না করিয়া দিয়াছে। শরীরটি বড্ড যন্ত্রণায় ফেলিয়াছে। মরিয়ম পোশাক-পরিচ্ছদ গোছাইতেছিলেন। হঠাৎ বলিয়া উঠিলেন, “আইচ্ছা, আপনে এই গরু চুরির কামডা ছাইড়া দিবার পারেন না?”
পান চিবাইতে চিবাইতে আব্বাস জিজ্ঞাসা করিল, “হঠাৎ এই প্রশ্ন!”
মরিয়ম বলিলেন, “ঘরে একটা যুবতী মাইয়া আছে, ওরে বিয়া দিতে অইব না? চোরের মাইয়ারে কোন বাপের পুতে বিয়া করব? আর ছেলেডারও তো একটা ভবিষ্যৎ আছে, না? লোকজন যদি আমাগো সম্পর্কে জাইনা যায়, তাইলে কি আমগোরে আস্ত রাখব?’’ তাহার কণ্ঠ নামিয়া গেল।
আব্বাসের কণ্ঠস্বর এইবার ভারি হইল, সে বলিল, “তুমি তো সবই জানো। আমাগো অবস্থা কী খারাপ আছিল! দিন আনতাম দিন খাইতাম। নুন আনতে পান্তা ফুরাইত। অনেক সময় ঘরে খাওন থাকত না! মাইনষের বাড়ি থাইকা কর্জ করতে অইত, কত খুঁটা-ধাক্কা! কেউ আবার কুত্তার মত ধুর ধুর কইরা তাড়াইয়া দিত। মানুষ হিসাবে সামান্য মূল্যও পাইতাম না।” আবেগাপ্লুত হইয়া পড়িল আব্বাস। এইবার একটু দম নিল, অতঃপর বলিতে লাগিল, “এখন দেখো আমাগো কত গুণগ্রাহী, কত বন্ধু-বান্ধব। এখন যদি ধার চাই, সানন্দে দেয়; অথচ দুঃসময়ে কেউ পাশে আছিল না!” আব্বাস অশ্রুসিক্ত হইয়া পড়িল।
মরিয়ম তাহার মাথায় হাত বুলাইয়া দিলেন; অতঃপর বলিলেন, “এখন মানুষ জানে না আপনে কী করেন। যখন জানব, আপনারে বাঁচবার দিব না। আপনে মরলে আমি পোলা-মাইয়া লইয়া কই যামু? আপনের পায়ে ধরি দয়া কইরা চুরিডা ছাইড়া দেইন। আমগোর এত টেহা-পয়সার দরকার নাই। দরকার পড়লে না খাইয়া থাকমু, তারপরও ইজ্জতের লগে বাঁচবার চাই।” মরিয়ম কাঁদিতে কাঁদিতে বাহিরে চলিয়া গেলেন।
পুকুরপাড়ে বসিয়া সকালের রুদ্র পোহাইতেছিল আব্বাস। সে উপলব্ধি করিয়াছে, চুরি করা অতি জঘন্য কাজ। সে মনস্থির করিয়াছে, জীবনে আর কখনোই চুরি করিবে না। তাহার স্ত্রী পুষ্করিণীর ঘাটে বসিয়া তালা-বাসন মাজিতেছিলেন। মনের কথা কি এখনই স্ত্রীকে জানাইয়া দিবে? না থাক, রাত্রিরে জানাইলেই হইবে।
হঠাৎ মনসুরকে দেখা গেল। সে সাজগোজ করিয়া কোথায় যেন যাইতেছিল। আব্বাস তাহাকে ডাকিয়া জিজ্ঞাসা করিল, “কই যাস রে, মনসুর?”
মনসুর বলিল, “একটু শ্বশুর বাড়ি যাইতাছি, দোস্ত! যাইবা নাকি আমার লগে? পাড়ায় নাকি নাটক অইব।”
আব্বাস উদাসভাবে বলিল, “না রে, মনডা ভালা না। তোর বউ গেল না?”
মনসুর হাসিয়া বলিল, “হের বাপ আইছিল। বাপের লগে দুই দিন আগেই চইলা গেছে। আইচ্ছা, যাইগা। দোয়া রাইখো।”
থালা-বাসন মাজা শেষ করিয়া উঠিয়া দাঁড়াইলেন মরিয়ম। যাওয়ার সময় স্বামী আব্বাসকে তাড়া দিয়া গেলেন যেন সেলুন হইতে চুল-দাড়ি পরিষ্কার করিয়া আসে।
“এই পায়খানা পরিষ্কার করাবেন, পায়খানা পরিষ্কার করাবেন।” জনৈক মেথরের চিল্লাচিল্লি শোনা গেল। আব্বাস সবে চুল-দাড়ি কামাইতে সেলুনের দিকে যাইতেছিল। পথে মেথরের সহিত দেখা। আব্বাস তাহাকে জিজ্ঞাসা করিলেন, “নাম কী তোমার?”
মেথর বলিল, “বিমল”।
আব্বাস আবার জিজ্ঞাসা করিল, “বিয়ে-শাদী করেছ?”
বিমল বলিল, “হ।”
আব্বাস জিজ্ঞাসা করিল, “পোলাপান আছে?”
বিমল বলিল, “হ, দুই মাইয়া আর এক পোলা।”
আব্বাস জিজ্ঞাসা করিল, “এই কাজ করতে কেমুন লাগে?”
বিমল বলিল, “ভালাই লাগে। আমি এহন যাই।”
আব্বাস বুঝিল, চুরি অপেক্ষা মেথরগিরি করা ঢের ভালো।
চায়ের দোকান হইতে চা খাইয়া সেলুনে ঢুকিল আব্বাস। একজনের দাড়ি কামানো প্রায় শেষ। তাহার পরেই আব্বাসের সিরিয়াল। আপাতত টেলিভিশন দেখিতেছিল সে।
আব্বাসের চুল কাটা শেষ হইল। এখন দাড়ি কামানোর পালা। সবেমাত্র চিবুকের একপাশের দাড়ি কামানো হইয়াছে, হঠাৎ বাহিরে প্রচণ্ড শোরগোল শুরু হইল। কী হইয়াছে দেখিতে নরসুন্দর বাহিরে গেল, আর ফিরিল না। অবস্থা বেগতিক দেখিয়া পালাইয়াছে সে।
একজন দৌড়াইয়া আসিয়া বলিল, “আব্বাস ভাই, জলদি পালান।” ছেলেটি মনসুরের চাচাত ভাই। আব্বাস পালাইলো না। নির্বিকারভাবে দাঁড়াইয়া রহিল।
তিন-চারিজন লোক আসিয়া আব্বাসকে ঘাড় ধরিয়া সেলুন হইতে বাহির করিয়া আনিল। কিল-ঘুসি মারিতে মারিতে টানিয়া হেঁচড়াইয়া বাজারের মধ্যিখানে নিয়া গেল। তাহাকে অকথ্য ভাষায় গালি-গালাজ করিতে লাগিল। “তোরে আমরা ভালা মানুষ জানতাম, কিন্তু তুই একটা চোর।” বলিয়াই তাহার ওপর সকলে ঝাঁপাইয়া পড়িল, মধ্যযুগীয় কায়দায় প্রহার আরম্ভ করিল। সে কী নির্যাতন! লোকজন তাহার শরীরের হাড়গোড় ভাঙ্গিয়া ফেলিল, হাত-পা ছিঁড়িয়া ফেলিল। শত শত মানুষের সম্মুখে তাহাকে বিবস্ত্র করা হইল। হাতুড়ি দিয়া মাথা থেতলাইয়া দেওয়া হইল, ফিরিঙ্গি দিয়া রক্ত বাহির হইতেছিল। দুই বাঁশের চিপায় যৌনাঙ্গ রাখিয়া চাপা দেওয়া হইলো যতক্ষণ না পর্যন্ত প্রাণ যায়। মৃত্যু নিশ্চিত হওয়ার পরও লাঠি দ্বারা আঘাত করা হইতে থাকিল। মৃত্যুর পূর্বে একফোঁটা জল চাহিয়াছিল অভাগা। মৃত্যুপথযাত্রীকে একফোঁটা জল দিতে কাহারও প্রাণে সামান্য করুণারও উদ্রেক হয় নাই।
গল্পের লেখক উক্ত ঘটনাটির প্রত্যক্ষদর্শী ছিলেন। ঘটনাটি ঘটিয়াছিল মুসলমানদের অতি পবিত্র রমজান মাসে। হত্যাকাণ্ডটি সংগঠিত হওয়ার পর পুলিশ আসিয়া লাশটি থানায় লইয়া যায়। পুলিশই আবার মুর্দার বাড়িতে পৌঁছাইয়া দেয়। লাশটি দাফন করার মতো কোনো লোক পাওয়া যায় নাই। মাতা-কন্যা-পুত্র মিলিয়া লাশটি মাটি চাপা দিয়াছিল।
১৭ ডিসেম্বর ২০০৮ খ্রিস্টাব্দ
ভালুকা, ময়মনসিংহ।
সর্বশেষ এডিট : ১১ ই জুন, ২০২৪ সকাল ১১:৩৫

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।



