somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

জীবন যখন শুকায়ে যায়

২৭ শে ফেব্রুয়ারি, ২০২৬ রাত ৯:২৩
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :


জীবন যখন শুকায়ে যায় করুণাধারায় এসো
পপুলার ডায়াগনস্টিক সেন্টারে গিয়ে জানা গেল লিম্বস কলাপসের টেস্টটার খরচ পড়বে পাঁচ হাজার ৫০০ টাকা। তমাল কাকাত ভাইয়ের সাথে পরামর্শ করে গেল পান্ত ডায়াগনস্টিক সেন্টারে। তারাও মোটামুটি একই রকম খরচ জানাল। যেকোনো একটাতে টেস্ট করাতেই হবে। কেননা সরকারি পরমাণু ইনস্টিটিউটে করাতে গেলে সামনের মাসের ২ তারিখ পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হবে। বাবার অবস্থা বেশ সিরিয়াস। এত দিন অপেক্ষা করার সময় নেই।

ময়মনসিংহ মেডিকেলের ইমার্জেন্সির সামনে ট্রলিতে বাবাকে রেখে এসেছে তমাল। মা আর বড় বোন সেখানে অপেক্ষা করছে। সেখান থেকে মেডিকেলের পুরোনো ভবনের দ্বিতীয়তলার ৬ নম্বর ওয়ার্ডে বাবাকে নিয়ে যেতে হবে।

তমাল কাকাত ভাইকে বলল, তুই ট্র‌লির পেছনে ধাক্কা দে। আমি সামনে আছি।

সরকারি মেডিকেলে ট্রলির বিরাট সমস্যা। গতকাল যখন পরমাণু ইনস্টিটিউটে টেস্ট করাতে নিল, সময় বলল সামনের মাসের ২ তারিখ। অন্যান্য পরীক্ষার জন্য বাবাকে ইমার্জেন্সির সামনে আনবে, অথচ ট্রলি বা হুইল চেয়ার কোনোটাই পাওয়া যাচ্ছিল না। পাক্কা দুই ঘণ্টা অপেক্ষার পর ট্রলি পাওয়া গেল। অথচ বাড়ি থেকে ময়মনসিংহে এনে ওয়ার্ড পর্যন্ত পৌঁছাতেও এত সময় লাগেনি।

অবস্থা এমন ঠেকেছে যে, টাকা দিয়েও ট্রলি মিলছে না। কে কোথায় লুকিয়ে রাখে কে জানে! অনেক সময় এক ওয়ার্ডের ট্র‌লি অন্য ওয়ার্ডে গিয়ে ক্ষেপ মারে। ব্যবসা খারাপ না। প্রতি ক্ষেপে ১০০ টাকা। দিনে ১০টা খেপ মারলে মাসে ৩০ হাজার আসে। সঙ্গে বেতন-ভাতাদি তো আছেই। এই টাকা সারা মাস চাকরি করেও পায় না তমাল।

ওয়ার্ডে তো জায়গা হয়নি, হয়েছে বারান্দায়। ৫-৬ বছর আগে যখন বাবাকে ময়মনসিংহে আনা হয়েছিল, তখনও বারান্দাতেই জায়গা হয়েছিল। আসলে এত এত মানুষের জায়গা নেই ওয়ার্ডে। পরে যখন অবস্থা সিরিয়াস, তার ওপর প্রচণ্ড শীত, জীবন যায় যায় তখন ডাক্তারের পরামর্শে ওয়ার্ডে জায়গা হয়। সে সময়ের কথা মনে করতে চায় না তমাল। যমে-মানুষে টানাটানি। কীভাবে যে সময় গেছে। শেষ পর্যন্ত অবশ্য বাবা সুস্থ হন। বাড়ি ফিরে যান। সবাই ভেবেছিল আর বাঁচবেন না।

গত এক বছর ধরে চলাচল করতে পারেন না। পক্ষকাল ধরে ডান পায়ের বৃদ্ধাঙ্গুলিতে একটা ক্ষত। কেউ খেয়াল করেনি। হঠাৎ ছোট বোনের নজরে পড়লে সে হৈচৈ ফেলে দেয়। কিন্তু কে কী করবে? ডাক্তার দেখাতে হলে তো কিছু পয়সা-কড়ি দরকার। তমাল অনেকদিন ধরেই ডাক্তার দেখানোর কথা বলছিল। পরে তার জোরাজোরিতেই বাবাকে ময়মনসিংহ মেডিকেলে নিয়ে আসা। ডাক্তার রোগীকে ভর্তি করাতে বলেন। প্রাথমিকভাবে সেখানেই চিকিৎসা চলছে। গতকাল কোনো পরীক্ষা করানো যায়নি। কয়েকটা পরীক্ষা দিয়েছে সকালে খালি পেটে, পরে আরেকটা খাওয়ার পর। পরীক্ষাগুলোর পর তমাল পায়ের পরীক্ষাটার ব্যাপারে খোঁজ নিতে বাইরের ক্লিনিকে গিয়েছিল।

এর আগে যখন বারান্দায় দাঁড়িয়েছিল, দেখল এক গৃহবধূতে ইমার্জেন্সিতে ঢোকানো হচ্ছে। ৬ তলা ভবন থেকে লাফ দিয়েছে। পরবর্তীতে জানা গেল মারা গেছে। এরও ঘণ্টাখানেক আগে ১৫ বছরের এক কিশোরীর মৃত্যু হয়েছে। কান্নায় ভারাক্রান্ত চারপাশ।

দুই
পৌনে একটার দিকে ঢাকার বাসে উঠল তমাল। ৩টায় তার অফিস। আগের দিন রাতে অফিসে মেসেজ করলে অবশ্য ছুটি নেওয়া যেত, কিন্তু পায়ের টেস্টটা যেহেতু পরে করানো হবে, ছুটি এখন না নিলেও চলে। তার মামা এসে দেখভাল করবেন। পরে ডাক্তার জানিয়েছেন, বাইরে টেস্ট করালেও হবে। কিন্তু এখন তো তমালের ঢাকায় ফিরতেই হবে। মা-বোনকে বলে গেল, মামা এসে যেন টেস্টটা করান। আর সব রিপোর্ট ডাক্তারকে দেখিয়ে শেষে কী বলে জানান।

গাজীপুর আসতে আসতে পৌনে ৩টে বাজল। অফিসে যেতে মনে হয় দেরি হয়ে যাবে। মেসেজ করে জানাল, ৩০ মিনিট দেরি হবে। মনে মনে ভয় পাচ্ছে, যদি আরও অনেক দেরি হয়! কত কথা শুনতে হবে! এমন সিরিয়াস পরিস্থিতিতেও সে ছুটির কথা বলতে পারছে না। বললেও হয়তো লাভ নেই। চাটুকাররা মিষ্টি করে কথা বললেই সব হয়ে যায়। তমাল কিছু বলতে পারে না। তাই জীবনভর ঠকে যাচ্ছে।

দেড় ঘণ্টা বিলম্ব। তবে সমস্যা তেমন হলো না। কেউ কিছু জিগ্যেস করেনি। দায়িত্বপ্রাপ্তজন আজ ডে-অফে আছেন। আরেকজন যিনি আছেন, তিনি এ মাসের পর আর থাকছেন না, তাই কিছু ঘাঁটালেন না।

কাজে মন দিল তমাল। কিন্তু মন কি কাজে বসে? মা-বোন কী করছে কে জানে। তারা শহরের ভাবগতি বোঝেন না। তার ওপর বাবা একা চলতে পারেন না, তাকে নড়াতে দুই-তিনজন লাগে। এর মধ্যে মা নিজেও অসুস্থ, বাবাকে টানতে টানতে নিজের খেয়াল রাখতে পারছেন না। অসুস্থ হয়ে পড়েছেন। কেমনে যে কী করছেন?

তমাল ফোন দিয়ে জানতে চাইল, মামা এসেছেন কিনা। বড় বোন জানাল, এসেছেন। বাড়ি থেকে খবার-দাবারও নিয়ে এসেছেন।

গতকাল রাতে কেবল রুটি খেয়েছে তারা। আজ ভাত খাওয়া দরকার ছিল। গা ধোয়ার সুযোগ নেই। বাড়ি থেকে কাপড় আনা হয়নি। বাবা বারবার কাপড় নষ্ট করেন, তাকে পরিষ্কার করতে গিয়ে মা-বোনও নাজেহাল।

অফিস শেষে রাত ১০টার দিকে বোন ফোন দিল। জানাল, পায়ের পরীক্ষা হয়েছে। ডাক্তার জানিয়েছে, পায়ে নাকি কী একটা লক হয়েছে। ময়মনসিংহে রাখবে না। ঢাকায় বারডেমে আনতে হবে।

পায়ে আবার কী লক কিছুই বুঝতে পারছে না। সারাজীবন শুনেছে হার্টে লক। এটা আবার কী? ডাক্তারি বিষয়াদি সে বোঝে না। যতটুকু বুঝল তা হলো, পা অবশ। আঙ্গুলের ইনফেকশন ঠিক হচ্ছে না। কাটাছেঁড়া করার ঝুঁকি ডাক্তাররা নিচ্ছেন না। তারা ঢাকায় রেফার করেছেন।

সিএনজি ভাড়া করে গন্তব্য আপাতত বাড়ি। ঢাকা আনতে হলে তো খরচাপাতি দরকার। ময়মনসিংহে এর মধ্যে ১৩-১৪ হাজার টাকা শেষ। ডাক্তার জানিয়েছিলেন, তাড়াতাড়ি ঢাকায় নিতে হবে। মামা বলেছেন, একটু প্রস্তুতি নিতে হবে। ডাক্তার আপাতত কিছু ওষুধ লিখে দিলেন। 

তিন
ঘুম ভাঙল বেলা ১১টায়। তমাল স্ত্রীকে বলল, ঘরে তো বাজার নেই। বাজার থেকে আসি।
এমনিতে টাকা নেই। এ অবস্থায় বাজার করার দরকার নেই। যা আছে চালিয়ে দেব।

তমাল মৃদু হেসে বলল, শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের ‘চন্দ্রনাথ’ উপন্যাসটা পড়োনি? একটা উদ্ধৃতি আছে, ‘যাহার প্রাসাদতুল্য অট্টালিকা নদীগর্ভে ভাঙ্গিয়া পড়িতেছে, সে আর খানকতক ইট বাঁচাইবার জন্য নদীর সহিত কলহ করিতে চাহে না।’

রেললাইনের কাছেই বাজার। মাছ আর কিছু সওদা করার জন্য বের হলো তমাল। স্ত্রীও সাথে চলল। বাচ্চাকে নিয়ে যাবে নাকি বাসায় ভাইয়ের কাছে রেখে যাবে, এ কথা বলছিল স্ত্রী।

তমাল বলল, নিয়ে যাই। বেবি ক্যারিয়ারটা দাও।

বাজার থেকে আসতে আসতে ভাগ্নির ফোন। জানাল, তমালদের বাসায় এসেছে। মামা-মামির সাথে কিছুক্ষণ কথা বলল সে। মামাত ভাইয়ের সাথেও কথা বলল। ৬ মাসের বাচ্চা তো আর কথা বলতে পারে না, চোখে চোখে, ইশারা-ইঙ্গিতে যতটুকু কথা বলা আর কী।

শেষে ভাগ্নি বলল, মামা, তোমার বিকাশে কিছু টাকা পাঠাব। নম্বর দিও।

ভাগ্নির কাছ থেকে টাকা নেবে? ইতস্তত করছিল তমাল। তার মা আর ছোট বোন বলেছিল কিস্তি তুলবে। তমাল ভেবেছিল, অন্য জায়গায় ব্যবস্থা হবে। আগের একটা কিস্তি টানতে টানতে জীবন ঝালাপালা। যদিও সেটা প্রায় শেষের দিকে।

যখন টাকার ব্যবস্থা হলো না, মাকে বলল কিস্তি তুলতে। তিনি জানালেন, কমপক্ষে সপ্তাহখানেক লাগবে টাকা তুলতে। পায়ে পাক ধরে গেছে। যত তাড়াতাড়ি সম্ভব ঢাকায় আনতে হবে। যদিও কেউ আশাবাদী না সুস্থ হওয়ার ব্যাপারে, কিন্তু ছোট বোন আর তমাল আশাবাদী। হাজার হোক বাপ তো। কে বাবাহারা হতে চায়?

তমাল ভাগ্নিকে বলল, আমার যে নম্বরটায় ফোন দিয়েছ, ওটাতেই বিকাশ-নগদ আছে।

মা বললেন, মামাকে সঙ্গে নিয়ে রোব-সোমবারের মধ্যে বাবাকে নিয়ে ঢাকায় আসবেন।  
সর্বশেষ এডিট : ২৭ শে ফেব্রুয়ারি, ২০২৬ রাত ১০:০০
৫টি মন্তব্য ৫টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

ঢাবিতে মেয়েরা নিরাপদ, শুধু একটু সতর্ক থাকলেই হয়

লিখেছেন সৈয়দ কুতুব, ২৬ শে ফেব্রুয়ারি, ২০২৬ রাত ৮:৩৬


এই দেশে কিছু মানুষ আছেন যাঁরা সত্যিকারের দেশপ্রেমিক। তাঁরা ঘুমান না, বিশ্রাম নেন না, নিজেদের সুখ-আরাম বিসর্জন দিয়ে সমাজের সেবায় নিজেদের উৎসর্গ করে যান। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের মতো একটি প্রাচীন... ...বাকিটুকু পড়ুন

আমার কথা : একুশে বইমেলায় আপনাদের আন্তরিক আমন্ত্রণ।

লিখেছেন সুম১৪৩২, ২৬ শে ফেব্রুয়ারি, ২০২৬ রাত ১০:০৩



অনেক জল্পনা–কল্পনার পর অবশেষে শুরু হলো একুশে বইমেলা ২০২৬।
বইপ্রেমীদের এই মহোৎসবে এবার আমার জন্য একটি বিশেষ মুহূর্ত—
এই প্রথম আমার দুটি বই একসাথে মেলায় এসেছে।



বই দুটি প্রকাশিত হয়েছে প্রতিভা... ...বাকিটুকু পড়ুন

জাতিসংঘে বাংলাদেশ : নির্বাচনের প্রেক্ষাপট !

লিখেছেন স্বপ্নের শঙ্খচিল, ২৭ শে ফেব্রুয়ারি, ২০২৬ বিকাল ৫:০০

sb]জাতিসংঘে বাংলাদেশ : নির্বাচনের প্রেক্ষাপট !



জাতীয় নির্বাচনের পর আমারা এখন জাতিসংঘে সকলের দৃষ্টি আর্কষন করতে যাচ্ছি,
তবে আমরা জাতীয় নির্বাচনে সফলতা না পেলে এই সুযোগ সৃষ্টি হতোনা ।
আগামী জুন... ...বাকিটুকু পড়ুন

প্রোফেসর ইউনুস সম্পর্কে আমি যা বলেছিলাম তাই সঠিক ছিল।

লিখেছেন নূর আলম হিরণ, ২৭ শে ফেব্রুয়ারি, ২০২৬ বিকাল ৫:১০


ব্রিগেডিয়ার সাখাওয়াত হোসেন চ্যানেল ওয়ানে একটি সাক্ষাৎকার দিয়েছেন।
অন্তবর্তীকালীন সরকারের প্রফেসর ইউনুস সম্পর্কে উনি যা বলেছেন আমিও ঠিক তাই বলেছিলাম তখন। হয়তো উনি এখনো রাখঢাক রেখে বলছেন, আমি সরাসরি বলেছিলাম।... ...বাকিটুকু পড়ুন

জীবন যখন শুকায়ে যায়

লিখেছেন রূপক বিধৌত সাধু, ২৭ শে ফেব্রুয়ারি, ২০২৬ রাত ৯:২৩


জীবন যখন শুকায়ে যায় করুণাধারায় এসো
পপুলার ডায়াগনস্টিক সেন্টারে গিয়ে জানা গেল লিম্বস কলাপসের টেস্টটার খরচ পড়বে পাঁচ হাজার ৫০০ টাকা। তমাল কাকাত ভাইয়ের সাথে পরামর্শ করে গেল পান্ত ডায়াগনস্টিক সেন্টারে।... ...বাকিটুকু পড়ুন

×